আজের সে দিনটা // রণেশ রায়

 Ranesh Ray
রোজের মত  আজও পদ্মা ভোর পাঁচটায় উঠে সংসারের কাজে লেগে পড়েছে। সংসার বলতে নীলমনি তাদের ছেলে বিশু ওরফে কনক আর সে। নীলমনি সকাল আটটার মধ্যে অফিস বেরিয়ে যায়। তারপর ছেলের স্কুল। ও দশটায় স্কুলে রওনা দেয়। রান্না ছাড়াও সংসারের সব কাজ পদ্মা  নিজেই করে। তিনজন লোক হলেও সংসারের কাজ কম নয়।
আজ কাজ সারতে গিয়ে পদ্মা যেন প্রতিটি পদে বাধা পাচ্ছে। বাধাটা ওর ভেতর থেকেই। সমস্ত পৃথিবীটা যেন মাথায় ভিড় করেছে। ওর কাছে পৃথিবীটা তেমন বড় নয়। ও বছর খানেক আগে থেকে নীলমনির সঙ্গে যে জুটি বেঁধেছে তারপর থেকে এক বছরের  ঝোড়ো সংসারটাই আজ তার পৃথিবী। সেটা তার মাথায়। তবে এই ছোট মাথায় তার আগের সংক্ষিপ্ত একটা জীবন প্রায়ই ফিরে আসে। সে জীবনটা তাকে কখনও সুখস্মৃতিতে ভরিয়ে তোলে আবার সে স্মৃতি তাকে ভারাক্রান্ত করে তোলে।সেটা ছিল তার আগের পৃথিবী।
খাওয়াদাওয়ার পর  নীলমনি যখন একগ্লাস জল খেয়ে বেরোবে  তখন জলটা এগিয়ে দিতে গিয়ে পদ্মার হাত থেকে পরে কাঁচের গ্লাসটা ভেঙ্গে যায়। সে যেন আঁতকে ওঠে। স্বগতোক্তি  করে ওঠে :
—- এ কি  করলাম আমি! বেরোবার আগে এ কি  অলুক্ষণে কাজ আমার। স্বগতোক্তি   হলেও তা নীলমনির শোনার পক্ষে যথেষ্ট কারণ  কোথাও বেরোবার মুহূর্তে ওর সবটাই মনোযোগ থাকে পদ্মার ওপর আর পদ্মাও ওর খুব কাছাকাছি এসে পড়ে।
—– এসব কি বলছ ? এ তো সবার ক্ষেত্রেই যখন তখন হতে পারে। এই বলে নীলমনি নিচু হয়ে কাঁচগুলো সরিয়ে নিয়ে পরিষ্কার  করতে যায়। পদ্মা বলে :
—–যাও তোমার অফিসে দেরী হয়ে যাবে। সাবধানে যাবে। নীলমনি পদ্মার চিবুক্ ধরে আদর করে বলে :
—– মনে কুসংস্কার রেখো না। আজকের দিনটা মনে আছে ?  একটা বিশেষ দিন তোমার। পদ্মা দিনক্ষণ মনে রাখে না। কাজের মধ্যে কটা  দিন কিভাবে গেল, কবে কোন দিন কত তারিখ তার হিসেব সব সময় থাকে না । আর ওর আবার বিশেষ দিন কি !
ও উত্তর দিতে পারে না দেখে নীলমনি বলে: 
—— আজ সেপ্টেম্বরের ২৪ তারিখ। আমি চললাম। ফিরে এসে জানব দিনটা খুঁজে পেয়েছ কিনা। সাবধানে থেক।
নীলমনি বেরিয়ে যায়। পদ্মা সব ভুলে আজের দিনটার বৈশিষ্ট্য  কি তা খুঁজে বেড়ায়। পৃথিবীটা তার মাথায় সূর্যকে প্রদক্ষিন করতে থাকে। তোলপার হয়ে যায়। ওর জন্মদিন কোনদিন পালিত হয়নি। ও জানে না সেটা। বিয়ের দিন ? সেটাই বা নিদৃষ্ট করে বলে কি করে? যেটা ও জানে তাতে তো  নীলমনির কিছু আসে যায় না । সে সেটা জানে না। তবে কি বললো ! ছেলে তো বড়। ১৪ই সেপ্টেম্বর কি বিশেষ দিন ? ছেলের জন্মদিন নয়ত ? ছেলে কি বলতে পারে ? ছেলে পাশের ঘরে পড়ছে। ওকে জিজ্ঞাসা করা যাক। পদ্মা ছেলের কাছে যায় ।
—— বিশু, তোর জন্মদিনটা কবে বলত ?
—— সে আবার কি ? আমার জন্মদিন নিয়ে আবার চিন্তা কেন ? স্কুলে দেওয়া একটা দিন আছে। সেটা তো  বসিয়ে দেওয়া দিন। কোনদিন পালন হয় না। আজ কেন?
—— তোর কাকু বলে গেল আজ একটা বিশেষ দিন। তবে সেটা কি ? বিশুর মন তোলপার হতে থাকে। মায়ের আবার বিশেষ দিন কি থাকতে পারে ? এও এক অদ্ভূত ব্যাপার। আমার মায়েদের মত মেয়েদের আবার বিশেষ দিন ! সে ভাবে কাকু বোধহয় ঠাট্টা করছে। সে মাকে হেসে বলে:
—— তুমি মনে করার চেষ্টা কর। মনে আসবে। 
—– কি জানি কি বলিস তোরা ?
পদ্মা ফিরে আসে তার দৈনিক রুটিনে। ছেলে বিশুর মাথায় এখন পদ্মার পৃথিবী। সে একটা বিশেষ দিন মনে খুঁজে বেড়ায়। গত বছর এরকম একটা দিন  ছিল তার মায়ের বিশেষ সুন্দরতম দিন যেদিন মা মানবী বলে স্বীকৃতি পায় আবার এই দিনেই কারও কারও কাছ থেকে সে চূড়ান্ত অসন্মানিত হয়। নিজের জীবনেও সে আলোর পথ দেখে। তবে সেটা তো সেপ্টেম্বর মাস ছিল না। তবে কি? নানা চিন্তা ভাবনা তাকে আলোড়িত করতে থাকে।
ছেলে স্কুলে গেলে পদ্মা স্নান খাওয়া করে। এরই মধ্যে ঘর পরিষ্কার কাপড় কাঁচার কাজ সারে। খেয়ে নিয়ে আবার বাসন মেজে সে ঘরে আসে। এটাই তার বিশ্রামের সময়। কোন কাজ নেই সারা দুপুর । তবে গায়ে গতরে কাজ না থাকলেও মাথার কাজটা বেড়ে যায়। তার মাথাটা পেছন ফিরে সারা পৃথিবীটা খুঁজে বেড়ায়। আজ বিশেষ দিনটা তাকে পীড়া দিচ্ছে ! 
সুখের না দু:খের ! সে  হাতরে বেড়ায় তার অতীতকে । কখনও তার শৈশব কখনও যৌবন আবার কখনও বর্তমান তাকে ব্যতিব্যস্ত করে তোলে। আজ তার স্মৃতি খুঁজে নিয়েছে নীলমনির সঙ্গে প্রথম সাক্ষাৎকারকে বিশেষ দিন বলে। সেই ফুটপাতে তার জীবনে নীলমনির প্রবেশ।
তার হাত ধরে নতুন জীবন। নীলমনি ভবানীপুরে রাস্তার ধারে ফুটপাতের বাচ্চাদের পড়াত। কাছেই একটা বস্তিতে পদ্মাদের বাস। ছেলের বয়স তখন বছর  ছয় কি সাত। ওদের বেশ চলছিল। কিন্তু হঠাৎ একদিন ওর বাবা কোথায় চলে যায় কেউ জানে না। সে রিক্সা চালাত। যা হোক করে সংসার চলত। স্বামী চলে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পদ্মার শুরু হয় সেই অসহনীয় জীবন। 
ছেলের পড়া পরের কথা তাদের দুবেলা খাবার জোটানো কঠিন হয়ে দাঁড়ায়।। এর মধ্যে ফুটপাতের স্কুলের খবর পেয়ে ছেলেকে নিয়ে আসে নীলমনির কাছে। সেই সাক্ষাৎকার তাকে যেন নতুন দিনের সন্ধান দেয়। তবে সেটা তো  জ্যৈষ্ঠের দুপুর। কেমন করে সেপ্টেম্বর হবে! 
  স্মৃতির এই সূত্র ধরে পদ্মা তার অতীতে ফিরে যায়। নীলমনির সান্নিধ্যে ছেলে পড়াশুনায়  মন দেয়। নীলমনির ধারণা ছেলেটি বেশ মেধাবী। কিছুদিন ফুটপাতের স্কুলে পড়া শেষ হলে ওকে একটা সরকারী স্কুলে  ভর্তির ব্যবস্থা করে। সে-ই খরচ বহন করতে থাকে। 
ছেলের পড়াশুনোর যাবতীয় দায়িত্ব নেয়। তখন থেকেই পদ্মার সঙ্গে নীলমনির যোগাযোগ। সে নীলমনির সাহায্যকে অনুগ্রহ বলেই গ্রহণ করে। অনুগ্রহ  আর কৃতজ্ঞতার নাগপাশেই প্রথম প্রথম সেটা বন্দী থাকে। সে এক রঙীন ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখতে শুরু করে। তার বিশু লেখাপড়া করে বড় হবে, চাকরি করবে তাদের অভাবের আকাশে সুখের চাঁদ উঠবে।
সেটা ঘটবে নীলমনির আশীর্ব্বাদে। সাক্ষাত ভগবানের আশীর্ব্বাদ। যখন-ই পদ্মা  নীলমনিকে সাক্ষাত ভগবান বলে কৃতজ্ঞতা জানাতে গেছে তখন-ই সে বকা খেয়েছে। এই বকাটা-ই তার শরীরে শিহরণ জাগাতো। কোন এক নতুন সম্পর্কের ছোঁয়া সে অনুভব করত। তাও সে এই সম্পর্ককে অনুগ্রহের সম্পর্কের বেশি কিছু ভাবতে পারে না। 
তার সামাজিক অবস্থান তাকে অনুশাসনে রাখত। আজ এই সামাজিক অনুশাসন আলগা হয়েছে। অনুগ্রহের বাইরের সম্পর্কটাতে  যে মান অভিমান রাগ বিরাগ সোহাগ ভালবাসার সম্পর্ক তা স্পর্শ করে পদ্মাকে। সে যেন ফিরে পায় তার অতীতকে।
 নীলমনির হাতধরে পদ্মা এখানে  একটি নারী সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হয়। সারাদিন এ বাড়ি সে বাড়ি কাজের মধ্যেও সে মেয়েদের মধ্যে কাজ করতে থাকে। ছেলেকে কেন্দ্র করে যে অনুগ্রহের সম্পর্কের সূত্রপাত হয় তার অনুগ্রহের দিকটা আসতে আসতে ঢিলে হয়।
 নীলমনি তাতে সক্রিয় ভূমিকা নেয়। পদ্মার নিজের অজান্তেই তার আর নীলমনির আজকের এই সম্পর্ক সেদিন গড়ে ওঠে যা তখন সুপ্ত ছিল। এখনও এই সম্পর্ককে পদ্মা একধরনের অনুগ্রহ বলে একেবারে যে ভাবে না তা নয়। তবে সেই অনুগ্রহের সঙ্গে আজ যেন কিসের মিশ্রণ যা তাকে একটা নিজস্ব সত্তা দিয়েছে। সেখানে একটা সম্মানবোধ, স্বাধিকার বোধ কাজ করে। 
পদ্মার মনে পড়ে সুন্দরবনে তাদের জীবনের কথা। অল্প বয়েসেই সুনুর সঙ্গে বিয়ে হয়। কিছুদিনের মধ্যেই এই সন্তান। সামান্য  জমির ওপর নির্ভর করে জীবন চলতে থাকে। কিন্তু বেশিদিন সুখ সইল না। সামান্য জমি আর জীবিকাকে কেন্দ্র করে যতটুকু সুখ ছিল তাও প্রকৃতি দেবী কেড়ে নেন। সেই ভয়ংকর  আয়লা জমি শুদ্ধ সবকিছু ভাসিয়ে নেয়। 
সুনুর তৎপরতায় তারা বাঁচে। তারপর জীবিকার সন্ধানে কলকাতায় আসা। ওর স্বামী ওকে খুব ভালোবাসত। সারাদিন রিক্সা চালিয়ে তার জীবিকা। এরই মধ্যে হাসিখুসির  জীবন। তাও টিকল না। সুনু যে কোথায় হারিয়ে গেল। তা নিয়েও নানা জনের কটুক্তি। তবে পদ্মা জানে সে কেমন ভালো মানুষ ছিল।
পদ্মা নীলমনির সহায়তায় আবার উঠে দাঁড়াবার চেষ্টা করে। ছেলেকে আঁকড়ে  ধরেই ওর জীবন। সেখানেও হানা দেয় এক অচেনা শত্রু। বস্তিতে সেই ভয়াভয় আগুন। পদ্মা একে ভগবানের মার বলে মেনে নিতে চায় । তবে নীলমনি  বলে ওটা মানুষের লোভের পেটে গেছে। এক বড় প্রমোটার আগুন লাগিয়েছিল। জমি দখল নেওয়ার পর আজ সেখানে তো ফ্ল্যাটই হয়েছে। নীলমনি ভুল বলেনি। ভগবানকে আর দোষ দেওয়া কেন।
নীলমনি বলে তোমার ভগবানের সঙ্গে এই মানুষগুলোর আঁতাত। ভগবানের ওপর বিশ্বাস-ই  বা রাখা যায় আর কত! নীলমনি বলে নিজেদের ওপর বিশ্বাস রেখে লড়াইটা চালিয়ে যেতে হবে। দেখলে তো একবার ভগবান আরেকবার মানুষ রূপী ভগবান আক্রমন হানছে। গরিবের বন্ধু তারা নয়। আজ আর কথাটা অস্বীকার কি করে করে পদ্মা। তাও অবিশ্বাসের মধ্যেও ওপরওয়ালার ওপর বিশ্বাস আর তাই নিয়েই বেঁচে থাকা। 
ওই কতই সেপ্টেম্বর বলল? সেটা আবার তার কাছে বিশেষ কোনদিন! হাজার ভাবনা ভাবতে ভাবতে বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যে হ’য়ে এল বলে। আজ আর সংগঠনের কাজে  যাওয়া হল না। আকাশ পাতাল ভেবেও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না সে দিনটাকে। এ এক অশান্তি। ছেলে স্কুল থেকে এসে খেলতে গেছে। নীলমনি আবার ছেলে খেলতে না গেলে রাগ করে। এসব ভাবতে ভাবতে নীলমনি এসে হাজির :
—— কি শরীর খারাপ নাকি? এখনও ওঠোনি।  
—— না ভাবছিলাম ওই সেপ্টেম্বরের দিনটায় কি ছিল।
—– থাক ওটা আর ভাবতে হবে না। 
—– আচ্ছা  গতবছর যে দিনে তুমি আমাকে এখানে নিয়ে এসেছ সে দিনটা কি?
—– সে দিনটা আবার তোমার বিশষ দিন হবে কেন? সেদিন আমাদের বাড়িতে তুমি কিভাবে অসম্মানিত হয়েছিলে মনে নেই? তাছাড়া সেটা সেপ্টেম্বর মাস ছিল না।  
—– আমার অসম্মানের কথা  ছাড়। সবমেয়েদের কপালেই সেটা জোটে। সেই দিনটাই তো আবার আমার এই জীবনের শুরু। আমার মত অভাগার কাছে সেটাই কত বড় ভগবানের আশীর্বাদ।
—– তোমরা এই জন্যই আরও মরলে। জীবনটাকে কারও  না কারও অনুগ্রহ বলেই ধরে নেও। আচ্ছা এখন একটু চা খাওয়াও। ওই দিনটা আমি খুঁজে এনে দেব। 
—— ও আমার ভুল হয়ে গেছে। তাড়াতাড়ি  উঠে সে রান্নাঘরে যায় চা করতে।
নীলমনি ঘরে এসে শুয়ে পড়ে। ও বাড়ি থেকে বেরোবার আগে  যেভাবে অপমানিত হয়েছে সেটা পদ্মার ভোলার নয়। কিন্তু সে ওটা ভুলে থাকে। কোনদিন রাগ হলেও পদ্মা সে কথা তোলেনি। নীলমনি ভাবে। সে আজ ঠিক করে এসেছে ছেলের সামনেই পদ্মার সেই বিশেষ দিনটা পদ্মাকে মনে করিয়ে দেবে।
পদ্মার মাথায় ও বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসার আগের ঘটনাটা সবসময়ই মনে ঘোরে । ও  ভুলবে কি করে! সেদিন আগুনে সব পুড়ে যাওয়ার পর বিকেলের আগে নীলমনি পদ্মাকে তার বাড়িতে নিয়ে আসে। সঙ্গে ছেলে বিশু। তাকে আর বিশুকে নিজের  ঘরে বসিয়ে মায়ের কাছে আসে। পাশের ঘর থেকে সব পরিষ্কার শোনা যাচ্ছিল। নীলমনি বলে: 
—– মা ও এখানে থাকবে। ব্যবস্থা করতে হবে।
—– তুই তো সব ঠিক করেই এসেছিস। তোর দাদা আছে বাড়িতে, অন্যেরা আছে তাদের মত নিতে হবে না? আর মেয়েটি কে, ছেলেটিই বা কে সব জানা দরকার তো। তোর সঙ্গে সম্পর্কই বা কি?
—— সম্পর্কের প্রশ্নটা পরে। ওরা এখন উদ্বাস্তু, সহায় সম্বলহীন। ওদের আগে একটা ব্যবস্থা করতে হয় তো। নীলমনি কোন কথা না লুকিয়ে পদ্মার পুরো পরিচয় দেয়। ওর স্বামীর কথাও  বলে।
—— জাতপাতের ঠিক নেই।  একটা রিক্সাওয়ালার বৌকে একটা ঢ্যাঙ্গা ছেলে শুদ্ধ এ বাড়িতে ওঠাতে হবে! সে কি কথারে খোকা ! এরই মধ্যে নীলমনির  বৌদি আর বোন এসে উপস্থিত। তারা সব শোনে । বৌদি বলে :
—– না তা কোনভাবেই হোতে পারে না। ও হবে আমার জা!  তা কখনই নয়। নীলমনির উত্তর: 
—– বৌদি, তুমি তো  ধরেই নিয়েছ ও আমার বউ। না জেনে না শুনে এটা ধরে নেওয়া  কেন ? আর আমার বউ-ও যদি হয় তুমি আপত্তি করার কে ?
—— ও কে মানে ? এ বাড়িতে বৌমারও তো  একটা অধিকার আছে। দেখ খোকা আমি এটা মেনে নিতে পারি না। এর মধ্যে ও ঘর থেকে পদ্মা বেরিয়ে আসে। ও বলতে চায় যে যখন কারও  মত নেই তখন থাক। আমরা আমাদের ব্যবস্থা করে নেব। ওর কথা না শুনেই নীলমনির বোন বলে:
—— তুমি এখানে কেন আমাদের মধ্যে ?
—– ওকে  নিয়ে কথা, ওতো থাকতেই পারে । নীলমনি বলে । 
—— এসেছে ভিখিরি হয়ে আবার কথা। দাদা দেখ, এইসব ছাইপাশ যদি বাড়িতে ঢোকাস তবে ভালো হবে না কিন্তু! আর মনে হচ্ছেতো বিয়েটা করে নিয়েই এসেছিস। বৌদি বলে কি ভুল করেছে ?
—— দেখ ফুলু তুই অধিকারের সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছিস। যাকে তাকে অসন্মান করার অধিকার তোর নেই।
—– কাকে অসন্মান! যে আশ্রয় চাইতে অসম্মান বোধ করে না তার আবার সন্ম্মান কি ?   একবার বিয়ে হয়ে গেছে, এত বড় ছেলে। আবার নিচু জাতের মেয়ে হয়ে আঁকাশের চাঁদ পেতে চায়। ভুজুং ভাজং দিয়ে ভুলিয়েছে তার আবার কথা। ফুলু বলে। 
—— এত কথার দরকার নেই। সবাই একমত তো। আমার ব্যাপারে আর কেউ এসো না। আর ফুলু এরপর কথা বললে কিন্তু তোর কথাও উঠবে।সেটা তোর পক্ষে সম্মানজনক হবে না। নীলমনি বলে। 
পদ্মা অনেক করে ওকে নিরস্ত করার চেষ্টা করলেও নীলমনি পদ্মা আর বিশুকে নিয়ে বেরিয়ে আসে। পদ্মা কোনদিন নিজের  ভাগ্যের সঙ্গে নীলমনির মত মানুষের ভাগ্য জড়াতে চায় নি। সে তার কাছে দেবতূল্য। এটা সে নীলমনিকে বলেছিল। সে নীলমনিকে ভালোবাসলেও তার এটাই ছিল দৃঢ় মত । কোথা থেকে যে কি হয়ে গেল! ফুলুর  চোখের ঘৃণার প্রকাশটা পদ্মাকে এখনও বেঁধে। গত এক বছরে নীলমনির সস্নেহ সান্নিধ্য আর অকপট প্রেম সেটা অনেকটা দূর করতে সাহায্য করলেও আজ যেন সেটা আবার জিগিয়ে ওঠে।
চা বানিয়ে পদ্মা ঘরে ঢোকে। নীলমনি ছেলেকে ডেকে নেয়। সে বলে, কি দিনটা মনে করতে পারলে না তো ? বিশু তোরও সেটা জানা দরকার। বাবার সত্যিকারের পরিচয় ছেলে জানবে না তা কি করে হয়। বিশু জানতে আগ্রহী। লোকটা হারিয়ে গেল কেন কোথায়  তা সে কিছুই জানে না। পদ্মা বলে হেয়ালি কোর না। যা বলবার বল।
নীলমনি কিছু না বলে তার ব্যাগ থেকে একটা ছবি বার করে  পদ্মার হাতে দিয়ে বাইরে চলে যায়। পদ্মার চোখে জল। এই লোকটাই তো সেদিন হারিয়ে যায় যে দিনটাকে পদ্মা হাতড়ে বেড়াচ্ছে। সেদিনটাই আজের এ দিন। সবাই তাই জানে। তবে নীলমনি বলেছিল হারায় নি। সে নতুন জীবনের স্বপ্ন দেখতো যেখানে সবাই সুখে থাকবে। সমাজ পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখত।
 একটা গোপন সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল। আজ সে আর নেই। তার সেদিন থেকে আর খবর পাওয়া যায় নি। পপদ্মার মনে পড়ে দিনটা ছিল ২৫শে সেপ্টেম্বর। অষ্টমী পুজো। রাতের দিকে করা এসে সুনুকে ডেকে নিয়ে যায়। সেই যে সে যায় আর ফেরে নি। সে শুধু বলে যায় তার ডাক এসেছে। যুদ্ধ শুরু। তাকে যেতে হবে। 
পদ্মা বিশুকে বুকে  টেনে নিয়ে বাবার পরিচয়টা  দেয়। বিশুর চোখে জল নেই। আনত মুখে মায়ের হাত থেকে নিয়ে দেওয়ালে টাঙানো নীলমনির ছবিটার পাশে বাবার ছবিটা টাঙিয়ে দেয়। মাথা তুলে অদ্ভুত প্রত্যয় আর আত্মবিশ্বাসে ছবি দুটোর দিকে তাকিয়ে থাকে। পদ্মা চোখ মোছে।    

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *