আত্মজীবনী বিষয়ক গদ্য

বাবার গল্প   //  তৈমুর খান


এক 
.

.
আমাদের মাটির বাড়িটি ছোট একটি পাখির বাসার মতো। চারিপাশে তালপাতা দিয়ে ঘেরা। মাটির দেওয়াল আর বাঁশের খুঁটি দিয়ে আটকানো খড়ের চাল। মেঝেতেই খেজুর পাতার তালাই পেতে ঘুমাই। গ্রীষ্মকালে উঠোনেই শুয়ে পড়ি ।

.

.

রেশনের কেরোসিনে লম্ফু জ্বলে । একটু বাতাস দিলেই লম্ফুর শিষ কাঁপে। তখন হাত দিয়ে বাতাস ঘিরে থাকি। বাবা পড়িয়ে দেন আর সঙ্গে সঙ্গে বানানগুলিও বলে দেন। বাবার সঙ্গে আমিও উচ্চারণ করি : কুজ্ঝটিকা, রাক্ষস, ভৌগোলিক, পৌরোহিত্য, বহিষ্কার, সাঙ্গোপাঙ্গ, প্রদূষ্য, ভোগৈশ্চর্য, শোচিষ্কেশ, হরিদ্রাঙ্গ হৃদয়দৌর্বল্য ইত্যাদি । নামতাগুলিও মুখস্থ হয়। সতেরো আঠারো উনিশের ঘরে আটকে যাই। কিন্তু কুড়ির ঘর কুড়িং কুড়িং চারশো অনায়াসে বলে দিতে পারি।

.

.

সব পড়া শেষ হলে ঘুম ঘুম চোখ। ঢুলতে থাকি। বাবা তখন শুরু করেন কতরকম গল্প। ঘুম ভেঙে যায়। পাড়ার কয়েকজন এসে বসে তখন। বাবার কাছে গল্প শুনতে চায়। আর গল্পগুলিও যেন কেমন। না, কোনও কিতাবের গল্প নয়। কারও বলা গল্প কিনা তাও জানা নেই। বাবা যখন বলছেন তখন বাবারই গল্প।

.

.

কেউ এসে বাবাকে জিজ্ঞেস করলেন :

—কী পাড়াচ্ছ?

—ব্যাকরণ ।

—ব্যাকরণের কী?

—অনেককিছুই…

—ছেলে কেমন পড়ছে?

—ওই যেমন চাষার ছেলে পড়ে!

—মানে ঠিক বুঝতে পারছি না।

তখন বাবা তাকে বোঝালেন এইভাবে :

.

.

তাহলে শোনো। এক চাষা তার ছেলের বিয়ে দেবার জন্য সুন্দরী শিক্ষিতা মেয়ের খোঁজ করছিল। কিন্তু কোথাও পাচ্ছিল না। মেয়ের বাবা-মায়েরা চাষার ছেলেকে দেখতে এসে জিজ্ঞেস করত : লেখাপড়া জানো? চাষার ছেলে শুধু মাথা নেড়ে বলত, না। তখন ওরা ফিরে যেত। শিক্ষিতা মেয়ের সঙ্গে কেউ মূর্খের বিয়ে দিতে চায়?

.

.

এদিকে ছেলের বয়সও বাড়ছে। স্কুল যাওয়ার অবস্থায় নেই। তখন চাষা একজন সংস্কৃত ভাষার পণ্ডিতকে এনে রাখল বাসায়। বলল : আমার ছেলেকেও পণ্ডিত করে দিতে হবে!

.

.

চলল রীতিমত পড়াশোনা।

—কী কী পড়াতেন?

—ভালো করে কথাবার্তা বলতে শেখা। ব্যাকরণ শেখানো ইত্যাদি।

—একটু বলুন না!

—ওই যে পণ্ডিত মশাই শেখাতেন :

ভাতকে কহিবি অন্ন, ধানকে ধান্য।

ঘি-কে কহিবি ঘৃত, ঘাসকে তৃণ।

জনক-জননী কইবি বাবা আর মা-কে।

ভুঁইকে কহিবি ক্ষেত্র, বনকে অরণ্য।

আকাশকে গগন কইবি, বাতাসকে মলয়।

পাখিকে খেচর কইবি, ঘরকে আলয়।

মাটিকে মৃত্তিকা কইবি, গাছকে কইবি তরু।

গাভী ও বৃষ কইবি যত বলদ গরু।

নাককে নাশিকা কইবি, অক্ষি হবে চোখ।

কান হবে কর্ণ, চুলকে কহিবি অলক।

—থামুন! এসব কি চাষার ছেলে শিখতে পারে?

.

.

—চাষার ছেলেকে শেখানোর চেষ্টা তো খুবই করেছেন। যেমন ধরো ব্যাকরণে সমাস শেখালেন। শুধু সমাসের নামটা মনে রাখলেই হবে। কিন্তু চাষার ছেলে তাও রাখতে পারল না। একদিন এক মেয়ে পক্ষের লোকেরা এসে জিজ্ঞেস করল :

.

.

—বাবা, তুমি কি লেখাপড়া জানো?

—হ্যাঁ, জানি।

—কী পড়েছ তুমি?

—ব্যাকরণ পড়েছি ।

—ব্যাকরণের কী পড়েছ?

.

.

ব্যাস, চাষার ছেলের “সমাস” নামটা আর মনে পড়ল না। এদিক-ওদিক চেয়ে দেখছে তখন। সেইখানে পণ্ডিত মশাইও উপস্থিত ছিলেন। তিনি চোখের ইশারায় উঠোনের মাচায় ঝুলে থাকা শশার লতার দিকে ইঙ্গিত করলেন যাতে শশা থেকে সমাস নামটা মনে পড়ে। কিন্তু চাষার ছেলের নজর গেল মাচার অন্যদিকে যেখানে ঝিঙের লতা ছিল। চাষার ছেলে সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিল : আমি ব্যাকরণে ঝিঙে পড়েছি।

.

.

বাবার এই গল্প শুনে সবাই হাসত। শিক্ষিত লোকেরা বেশি বেশি হাসত।

.

.

দুই

.

.

গ্রামে এক মেয়ের পিতা এসেছে তার মেয়ের জন্য বর দেখতে। বরের পিতা মেয়ের পিতার কাছে বেশি পণ আদায়ের জন্য মেয়ের পিতাকে নিয়ে মাঠে মাঠে ঘুরছে আর যে পুকুরটা, যে বাগানটা, যে ভালো জমিটা দেখছে, সবই আঙুল তুলে দেখিয়ে বলছে : এটা আমার। এটাও আমার। ওইযে ওটাও।…

.

.

সন্ধেবেলায় বাবা একটা বিড়ি টান দিতে দিতে দাওয়ায় এসে বসেছেন। গ্রামের কেউ এসে খবরটা দিলে। বাবা সব শুনে বললেন : তা হোক, যে যেমন তার কুটুম তেমন হবে।

.

.
শোনো তবে :

একদিন একজন চালাক লোকের সঙ্গে আর একজন চালাক লোকের সাক্ষাৎ হয়ে গেল। তো তাদের কথাবার্তা এরকম :

—তোমার বাড়ি কোথায় :

—এজ্ঞে আমার বাড়ি সর্ষে ডাঙা রায়পুর।

—আমার বাড়ি তিল ডাঙা তিসিপুর ।

—তোমার কয় ছেলে মেয়ে?

—আমার দুই মেয়ে —শ্বেতাম্বরী আর দিগম্বরী।

—আমারও দুই মেয়ে —জানুয়ারি আর ফেব্রুয়ারি।

.

.

বুঝতে পারছ চালাক লোকেরা কেমন হয়! তখন গাঁয়ের করিম চাচার নাম করে বলতেন : কেমন ঘাগু লোক বলো তো! কখনোই নিজের পরাজয় স্বীকার করেন না। ধরো ঘোড়দৌড়এ আর সকলের সঙ্গে সেও অংশ নিয়েছে। কিন্তু দেখা গেল তার ঘোড়াটা সবার শেষে এসে পৌঁছাল। কতৃপক্ষের সঙ্গে সে কিন্তু ঝগড়া লাগাবেই। বলবে, আমাকেই পুরস্কারটা দাও, কারণ আমি আগের সব ঘোড়াগুলোকে ছুটিয়ে নিয়ে এলাম!

.

.

চালাক লোক কতরকম হতে পারে দ্যাখো।

একজন অন্ধ মেয়ের পিতা আর একজন দুই পা-হীন ছেলের পিতা নিজেদের ছেলে-মেয়ের পরিচয় গোপন করে উভয়েই বর ও কন্যা খুঁজে খুঁজে হয়রান। একদিন স্টেশনে ওদের পরিচয় হল। উভয়েই তাদের নিজেদের উদ্দেশ্য কী তা বলল। কিন্তু ওদের ছেলে মেয়ে খোড়া এবং অন্ধ তা কেউ কাউকেই জানাল না। উভয়েই কথা করে নিল :

.

.

—যাক বেহাই, এতদিনে উপযুক্ত পাত্র পেলাম।

—হ্যাঁ, তা আর বলতে! আমি ভালো পাত্রীও পেলাম।

—আগামি ১২ই ফাল্গুন বিয়ের দিন তাই তো!

—হ্যাঁ, সব ঠিক। আমি মহাসমারোহে বাজনাসহ বরযাত্রী নিয়ে আসব ওইদিন রাত্রে।

—হ্যাঁ বেহাই, আমিও তৈরি থাকব। আমাদেরও সব আয়োজন থাকবে।

ব্যাস, সেই নির্দিষ্ট রাত্রে বিয়ে নিয়ে এল ছেলের পিতা। বাজনদারদের বলল : গ্রামে ঢোকার মুখে খুব বাজাবে।

মেয়ের পিতাও বলল : গ্রামে বিয়ে ঢোকার সময় একদম জমিয়ে বাজাবে।

ঠিক তাই। যেমনই খবর পেল এবার বিয়ে আসছে তখন মেয়ের তরফ থেকে বাজনদাররা ঢোলে একটা বোল তুলতে লাগল :

কানা-রে তোর কপাল ভালো

কানা-রে তোর কপাল ভালো

দ্যাখ্ কেমন বর এল

দ্যাখ্ কেমন বর এল

ছেলের তরফের বাজনদাররা বুঝতে পারল সেই বোল। ওরা পিছিয়ে থাকবে কেন? ঢোলে বোল তুলল :

দাঁড়ালেই দেখতে পাবি

দাঁড়ালেই দেখতে পাবি

কানা মেয়ের বর লিবি

কানা মেয়ের বর লিবি

বরের দু পা নেই তাই দাঁড়ালেই দেখা যাবে বলছে। এভাবেই তো ইঁটের জবাব পাটকেলে দেওয়া হয়।

.

.

তিন

.

.

বাবার কাছে ধর্ম ব্যাপারটা ছিল ইহকালেরই মানবিক কল্যাণের পথে যে আচার আচরণ। পরকাল বলে যে কালের কল্পনা করা হয় বাবা তার জন্য কখনও উৎসুক ছিলেন না। তাই যাবতীয় চিন্তা ও চেতনা ইহকালকে ঘিরেই। বাবা প্রায়ই বলতেন :

.

.

একদিন ঝড়-দুর্যোগের রাতে বিভিন্ন বিশ্বাস ও সম্প্রদায়ের মানুষ একটি বিদ্যালয়ে আশ্রয় নিয়েছিল। সারারাত সেখানে কাটানোর পর যখন ভোর হল তখন পাখি ডাকতে শুরু করল। এই পাখির ডাক শুনে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষ বিভিন্নভাবে তার ব্যাখ্যা করল।

.

.

পাখিতে কী বলছে?

হিন্দুরা বলল : পাখি বলছে :রাম লক্ষ্মণ দশরথ।

মুসলমানরা বলল:পাখি বলছে :আল্লা রসুল হজরত।

যোগ সাধকরা বলল : পাখি বলছে : ডন কুস্তি কসরত।

প্রেমিক-প্রেমিকারা বলল :পাখি বলছে : প্রেম পিরিত মহম্বত।

চাঁই সম্প্রদায় বলল :পাখি বলছে :পেঁয়াজ লসুন অদরাক।

খাদ্য রসিকরা বলল :পাখি বলছে :বাদাম পেস্তা সরবত।

বৌদ্ধরা বলল :পাখি বলছে :সন্ন্যাস সত্য ত্যাগ।

জৈনরা বলল :পাখি বলছে :মুক্তি মোক্ষ ধ্যান।

নাস্তিকরা বলল :পাখি বলছে :ভোগ সুখ প্রাণ। ইত্যাদি ।

বুঝতেই পারছ, ধর্ম ওই পাখির ডাকের মতো। যে যেমনভাবে শোনে তার কাছে তেমনভাবেই ধরা দেয়।

“আর একটি এই সেদিনের কথা শোনো”বলেই শুরু করলেন :

এক মৌলবি সাহেব মিলাদে বক্তব্য রাখছেন, ইহকালে অন্যায় করলে পরকালে তার হিসেব লাগবে। আমি মৌলবি সাহেবকে জানতে চাইলাম, একটা উদাহরণ দিন। ব্যাপারটা বুঝতে পারছি না।

.

.

মৌলবি বললেন : যদি অন্যকারও একটি ছাগল আপনি চুরি করে খেয়ে নেন, তাহলে পরকালে সেই ছাগলই জবান ফিরে পাবে। ছাগল নিজেই সাক্ষী দিয়ে বলবে : পৃথিবীতে এই লোকটি আমাকে জবাই করে খেয়েছিল।

.

.

তখন আপনাকে এই ছাগল খাওয়া ৠণ পরিশোধ করতে হবে।

—আমি তো সুযোগ পেয়ে যাব মৌলবি সাহেব। ছাগল যেমনই সাক্ষী দিতে আসবে, আমি ওর কানে ধরে ছাগলের মালিককে দিয়ে দেবো। বলব, আমি পৃথিবীতে থাকা কালীন খিদের জ্বালা সহ্য করতে না পেরে ছাগলটি খেয়েছিলাম। এখন তার পরিশোধ দিলাম।

.

.

আমার কথা শুনে মৌলবি সাহেব বেজায় চটে গেলেন। কাফের বলে গালাগালি করলেন। কিন্তু বুঝে দ্যাখো, খিদের মতো মারাত্মক কিছু আছে!

.

.

চার

.

.

কত গল্প বাবার । হাসির সঙ্গে রসিকতাও। আমাদের সেই মাটির বাড়ি আর উঠোন আজ নেই। কিন্তু ছোটবেলার স্মৃতিগুলি এখনও মনের উঠোনে ছুটোছুটি করে। জ্যোৎস্না রাতে হু হু বাতাসে আমরা ঘুমিয়ে পড়ি খোলা জায়গায়। বাবা সুর করে মুখস্থ বলে কোনও কবিতার পংক্তি। এর যেন বিরাম নেই। শেষ নেই।

.

.

“কৃপণ” কবিতাটি বাবার মুখের অন্যতম উচ্চারণ :

দোকান করে রামু দামু মিলে দুটি ভাই

দুই জনেতে বেজায় কৃপণ বাজে খরচ নাই।

একজন দেয় জিনিস মেপে, আর একজনা বসে

পয়সাগুলি বাক্সে তোলে হিসাব করে কষে।

বড় ভাই যায় দু ক্রোশ দূরে যেথায় তাদের বাড়ি

ছোট ভাইটি নিবিয়ে আলো ঘুমায় তাড়াতাড়ি।

রোজই যাবার সময় দামু ভাইকে যায় যে বলে

নিবিয়ে দিবি আলো যেন সারারাত না জ্বলে।

একদিন রামু বাড়ির দিকে ক্রোশ খানেক পথ গিয়ে

হঠাৎ তাহার মনে এল, আলোটি নিবিয়ে

দেবার কথা ভাইকে আসিনি তো বলে!

কী সর্বনাশ আলো যদি সারারাতই জ্বলে!

দু পয়সার তেল হবে ক্ষতি নাই কো কোনো ভুল

সেখান থেকে ফিরল রামু মন বড় ব্যাকুল।

দোকান ঘরের সামনে এসে করতে ডাকাডাকি

দামু উঠে দরজা খুলে শুধায়, দাদা নাকি?

বাড়ি যেতে ফিরে এলে খবর তো সব ভালো?

রামু বলে দেখে যেতে নিবল কিনা আলো।

দামু বলে আলোটা তো নিবিয়েছি তক্ষুনি

কিন্তু দাদা, একটি কথা বলো দেখি শুনি!

তুমি যেখান থেকে ফিরে এলে তোমার দু-ক্রোশ হবে চলা

ক্ষয় কি এতে হল না ওই জুতোর দুটি তলা?

রামু বলে, ভাইরে, আমি যে তোর দাদা

তবে আমায় ভাবিস কেন এত বড় হাঁদা!

যেখান থেকেই ফিরেছি ঠিক সেখানটাতে গিয়ে

জুতো দু-পাট প’রব পায়ে এই দ্যাখ্ না চেয়ে!

বগলদাবায় জুতো আমার হিসাব কি মোর নাই?

দামু বলে, সাবাস দাদা, চরণধূলি চাই ॥

.

.

.

.

 

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *