একটি কাল্পনিক আত্মসাক্ষাৎকার // কল্পনা ও শব্দ গাঁথা- সঞ্চিতা রায়।

sanchita roy
 
আমি বই পড়ছিলাম হঠাৎ দরজায় বেল বাজলো।”আমরা সাধারণ মানুষের জন্য পত্রিকা থেকে আসছি।আমরা সাধারণ মানুষের কথা লিখি।আপনার একটা সাক্ষাৎকার নিতে চাই।”
ভারী মজার ব্যাপার তো।
 
সাংবাদিক- আপনার নাম?
 
সঞ্চিতা—সঞ্চিতা রায়।  
 
সাংবাদিক —   নামটা কি কোনো বিশেষ কারণে রাখা?                                                          
 
সঞ্চিতা-   আমার রাঙামাসি নজরুলের কবিতা খুব ভালবাসতেন ,তাই তিনি নজরুলের কাব্যগ্রন্থের নাম অনুসারে আমার নামটা রেখেছিলেন।                                      
 
সাংবাদিক- ছোটবেলা কেমন কেটেছে?                                                
 
সঞ্চিতা–ভীষণ আনন্দে।                       –  
 
আপনি কি করেন?  
                  
 সঞ্চিতা– আমি পেশায় গৃহশিক্ষিকা এবং ছোটো ব্যবসায়ী ।  
 
 সাংবাদিক – আপনি আপনার এই পেশায়  মানসিক ভাবে সন্থুষ্ট?  
 
সঞ্চিতা–অবশ্যই। আমি পড়াতে ভালবাসি। আর ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে সময় কাটাতে আমার ভীষণ ভাল লাগে। সকাল বেলায় যখন ওরা ভোরের শিশিরস্নাত ফুল আমার হাতে দিয়ে বলে“সুপ্রভাত মিস্ আমার মন অনাবিল আনন্দে ভরে ওঠে। ওদের পড়াতে পড়াতে ওদের মধ্যে আমার স্কুলবেলা খুঁজে পাই। আমি মনে করি যে যে কাজ করে আনন্দ পায় তার সেই কাজ ই করা উচিৎ। আর পড়িয়ে আমি আনন্দ পাই।                                      
 
সাংবাদিক –  আর আপনার ব্যবসা?          
 
সঞ্চিতা—আমার নিজের বাড়ি সংলগ্ন আমার একটা ছোটো দোকান আছে। তবে এখানেও একটা মজা আছে। আমি বিভিন্ন জায়গা থেকে জিনিস সংগ্রহ করে এনে দোকানে  বিক্রি করি ,তবে এখন ধরণটা অনেকটা বদলে গেছে। এখন আমি আমার ’আপন মনের মাধুরী মিশিয়ে’কাগজের,কাপড়ের, বা অন্যান্য কাঁচামালের গয়না তৈরী করি এবং বিক্রি করি। এই সৃষ্ঠিশীলতা নিয়ে থাকতে আমার ভাল লাগে। অর্থাৎ ব্যাবসার ক্ষেত্রেও আমি আমার ভাল লাগা বা আনন্দেকেই প্রাধান্য দিয়েছি।                  
 
 
সাংবাদিক -তাহলে আপনি যে কাজ করেন তা নিয়ে আপনার কোনো আপসোস  নেই। আপনি খুশি  তাইতো?      
সঞ্চিতা–অবশ্যই আমি আমার কাজের জগৎ নিয়ে সন্তুষ্ট। আপসোসোর কোনো প্রশ্নই নেই।                                                
 
 সাংবাদিক –আপনি কি প্রথম থেকেই এই পেশায় আছেন?                                        
 
সঞ্চিতা –না আমি একটা বেসরকারি সংস্থায় রিসেপসানিস্ট (ভালো ভাষায় একে আবার ফ্রন্ট অফিস ম্যানেজার বলে)ছিলাম।                                                
 
সাংবাদিক –আপনার বাবা মা কি চাকরি করেন বা করতেন  ?                                    
 
সঞ্চিতা—বাবা সরকারী উচ্চপদস্থ অফিসার ছিলেন। এখন অবসরপ্রাপ্ত । মা সংসার ম্যানেজমেন্টে আছেন।                
 
 সাংবাদিক –সংসার ম্যানেজমন্ট , খুব সুন্দর কথা বললেন তো!                        
 
   সঞ্চিতা— হ্যাঁ, আমি তাই মনে করি। ছোট্টবেলা থেকে দেখেছি কি নিষ্ঠা এবং দক্ষতার সঙ্গে তিনি সংসার পরিচালনা করছেন,সংসারের সব দায়িত্ব  পালন করছেন। আমার বাবা একজন সৎ দায়িত্ববাণ  অফিসার হিসাবে নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করেছেন। । তাঁকে তাঁর সরকারি দায়িত্ব  পালনের জন্য অত্যন্ত সকালে অফিসে এবং সাইটে যেতে হ‘ত।বাবা যাতে সুষ্ঠু ভাবে কাজ করতে পারেন,তাতে মা পূর্ণ সহায়তা করেছেন। রান্নাবান্না,টিফিন তৈরী  ,প্রয়োজনে বাজার করা,অতিথি এলে তাঁদের আপ্যায়ন ও খাওয়ানোর ব্যাবস্থা,সংসারে কোন খাতে কত ব্যায় হবে তার সুষ্ঠু ভাবে হিসাব রাখা অর্থাৎ আয় ব্যায়ের মধ্যে সামঞ্জস্য বজায় রাখা সবই তাঁকে করতে হয়েছে।তাছাড়া ও তাঁকে সংসারের নানা কাজ করতে হয়েছে,আজও করতে হয়,তাই আমি মনে করি মা সংসার ম্যানেজমেন্টে অনন্যা।                              
 
সাংবাদিক —- আপনার বাবা মা কি আপনার কাছ থেকে আরো ভাল কোনো পেশা আশা করেন না?                              
সঞ্চিতা—-আসলে আমার বাবা মা কোনো কিছু জোড় করে চাপিয়ে দেওয়ার বিরোধী। তাঁরা মনে করেন নিজ মেধা বা যোগ্যতা অনুযায়ী ই কাজ করা উচিৎ। হ্যাঁ হয়তো ডোনেসান দিয়ে পড়ার মাধ্যমে আনেক সময় পেশা কেনা যায়,কিন্তু আমরা মেধা অনুযায়ী কাজেই বিশ্বাসী । তাই আমার বা আমার ভাইয়ের পেশা নিয়ে বাবা ময়ের কোনো আপসোস  নেই। সাংবাদিক —ভাই কি করেন?                      
 
সঞ্চিতা–নিজস্ব ইন্সটিটিউটের কম্পিউটার  শিক্ষক।                                
 
আপনার জীবনের দুটি ভীষণ খুশির দিনের কথা বলুন।                                      
 
সঞ্চিতা –যেদিন আমার ভাই জন্মালো সেইদিন আর যেদিন আমি  যেদিন আমি প্রথম রোজগার করলাম সেই দিন। শুনলে অবাক হবেন আমার প্রথম রোজগার ছিল দিনে ৩৬ টাকা অর্থাৎ একদিন কাজ করে ৩৬ টাকা রোজগার। প্রথম যখন নিজের রোজগারের টাকা হাতে পেলাম  ,আমার মনে হচ্ছিল আমি পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মানুষ।                                                        
 
সাংবাদিক –আপনি গৃহশিক্ষিকা । সমাজের মানুষের মনোভাব আপনার প্রতি কিরূপ?                                            
 
 সঞ্চিতা—এটা খুব মজার। যখন আমি বেসরকারি সংস্থায় চাকরি করতাম,আমার কিছু কাছের লোক বলতেন,“ও চাকরি করে ,জব করে ইত্যাদি,অর্থাৎ তখন তবুও আমার কাজটাকে একটু আধটু দাম দেওয়া হ,ত এখন তাদের কেউ কেউ বলেন, “তোর আবার কাজ কি?” ”কাজ না থাকলেই এই হয় সেই হয় “ইত্যাদি। গৃহশিক্ষকতাও যে একটা কাজ তা সমাজের উচ্চপেশায় নিযুক্ত কিছু মানুষ বোঝেন না।আমি পড়ানোর জন্য তাদের কাছ থেকে একটা মাসিক সাম্মানিক পাই,অতয়েব যে সময়টা আমি তাদের দিয়ে রেখেছি,সেই সময়টা একান্তই তাদের। তাই যারা বলেন“করিস তো সামান্য গৃহশিক্ষকতা, দু একদিন না পড়ালে কি মহাভারত অশুদ্ধ হয়”তাদের কথার কোনো গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজনীয় তা আমি বোধ করি না। আমার কাছে আমার কাজের দাম আছে ,ছিল থাকবে। আর হ্যাঁ ছাত্রছাত্রী বা তাদের অভিভাবক অভিভাবিকার কাছ থেকে যে শ্রদ্ধা ভালবাসা আমি পাই তা আমার কাছে অমূল্য।                                
 
 সাংবাদিক — আপনি চাকরি করেছেন,এখন স্বাধীন  জীবিকায় আছেন,দুটো জীবনের মধ্যে কি পার্থক্য নজরে আসে?
 
                
সঞ্চিতা—-   দেখুন ওখানে একটা নির্দিষ্ট  মাইনে ছিল,পুজোর আগে বোনাস ছিল,এখানে সেক্ষত্রে ছাত্রছাত্রীর সংখ্যার উপর রোজগার নির্ভর করে। আর হ্যাঁ বোনাস নেই। কিন্তু একটা কথা স্পষ্ট করে বলি,যেহেতু আমাকে স্যালারী ভাউচার করতে হ’ত সহকর্মী দের মাইনে সম্পর্কে কিছুটা ধারণা আছে। বাস্তবিক পক্ষে আমার আশেপাশে অনেকেই গৃহশিক্ষকতা করে তাদের চেয়ে বরং বেশী ই  রোজগার করেন। আমার ক্ষেত্রে বলি,আমি আমার সময়টাকে নিজের মত করে সাজিয়ে নিয়েছি এখন,তাই ছাত্রছাত্রীদের সময়টা দেওয়ার পর আমি গান শোনা ,বই পড়া গান করা আমার ভাললাগার বিভিন্ন কাজ করতে পারি।      
 
সাংবাদিক –স্বাধীন জীবিকা র জন্যই কাজটা ছেড়েছিলেন?                                
 
সঞ্চিতা—-  না আমাকে একটা চিঠিতে বলা হয়েছিল,হয় আমাকে সাত দিনের মধ্যে কলকাতা অফিসে যোগদান করতে হবে,নয় নাকি আমাকে অন্যত্র চাকরি খুঁজতে হবে। আমার কাছে এই চিঠির ভাষা অত্যন্ত অপমানকর লাগে,দ্বিতীয়ত আমার সাতদিনের মধ্যে কলকাতায় গিয়ে চাকরি তে যোগদান করা সম্ভব ছিল না। আর একটা বড় কারণ(আমার ক্ষেত্রে বড় কারণ তো বটেই) কয়েক বছর চাকরিকরার পর অফিসকে নতুন করে সাজানোর পর এ সি মেশিনের ঠিক নীচে আমার বসার ব্যাবস্থা করা হয়েছিল ,সর্বক্ষণ ওই ঠাণ্ডা হাওয়া মাথায় সরাসরি লেগে আমার বুকে কফ বসে যেত। একই ঘটনা হয়তো ওদের কলকাতা অফিসেও ঘটতে পারতো। তাই পরিস্থিতির শিকার হয়ে চাকরিটি ছাড়তে হয়েছিল।                
 
সাংবাদিক –সংস্থাটির প্রতি আপনার কোনো রাগ আছে?                                  
 
  সঞ্চিতা–না আমি সুন্দর মুহূর্ত গুলোকে মনে রেখে জীবনে আনন্দ নিয়ে বাঁচায় বিশ্বাসী । সংস্থার সাথে আমার অনেক অনেক সুন্দর অভিজ্ঞতা আছে। অ্যাওয়ার্ড অফ এফিসিয়েন্সি পাওয়া, কাজের মাঝে মাঝে ছোট ছোট ব্রেক,যেমন রথের দিন সবাই মিলে পাঁপড় আনিয়ে খাওয়া,বিশেষ বিশেষ দিনে  সবাই মিলে খিচুড়ি রান্না করে  খাওয়া,একসঙ্গে বেড়াতে যাওয়া। বিশ্বকর্মা পুজোর দিন গুলোতে প্রতিবছর ভীষণ আনন্দ করা তাছাড়াও আমাদের সকলের  সাথে ম্যানেজিং ডাইরেক্টর স্যার ,চেয়ারম্যান স্যারের মিষ্টি সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক,বা সহকর্মী দের সাথে কাজের সময় একটা পরিবারের মত থাকা  এই সব মিষ্টি স্মৃতিগুলোই আমি মনে রাখতে চাই। আমি মনে করি সুন্দর মুহূর্তের স্মৃতি জীবনকে আনন্দময় করতে,পজিটিভ থাকতে সাহায্য করে।                                
 
 সাংবাদিক —-আপনার প্রিয় অবসর বিনোদন ?                                                    
 
 সঞ্চিতা—গান শোনা আর বই পড়া    ।        
 
সাংবাদিক — প্রিয় খাবার?                          
 
সঞ্চিতা— মায়ের হাতে মাখা আলুসেদ্ধ ভাত। আমার কাছে এটা নামী দোকানের বিরিয়ানির চেয়েও অনেক বেশী প্রিয়।      
 
সাংবাদিক —বেড়াতে যেতে ভালবাসেন?  
 
 সঞ্চিতা—আমার প্রিয় ভারতবর্ষে অনেক সুন্দর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর জায়গা আছে,সেইসব জায়গায় ঘুরে বেড়াতে চাই। বিদেশের প্রতি বিশেষ আকর্ষণ নেই। আর আমি সমুদ্র ভীষণ ভালবাসি।              
 
সাংবাদিক —নবীন প্রজন্মকে  মতামত দেবেন?                                              
 
সঞ্চিতা— নবীন প্রজন্ম যথেষ্ট বুদ্ধিমান  বা বুদ্ধিমতী,আমি কি বলবো?আমার মনের কথা হ‘ল যে চাকরি করতে চায় চাকরি করুক বা চাকরির চেষ্টা করুক,কিন্তু চাকরি না পেলে হতাশ না হয়ে যার যা প্রতিভা সেই প্রতিভাকে কাজে লাগিয়ে স্বনির্ভর হোক। নাচ শেখানো, গান  শেখানো বা আরো অনেক  কিছু হতে পারে। জীবনে আনন্দ খুঁজে নিতে হয়। আর নিজের ভালবাসার জগৎকে নিয়ে কাজ করতে পারলে  অনন্ত আনন্দ আছে। অবশ্যই ‘পাছে লোকে কিছু বলে’ কে অবজ্ঞা করে চলতে হবে। যে তোমার কাজকে ছোট করবে তাকে অবজ্ঞা করতে শিখতে হবে। যার কথা তোমার বিষাদ সৃষ্টি হতে পারে তার থেকে দূরে থাকো। আমার মতামতটা কবির ভাষায় বলি, ‘যত বড় হোক ইন্দ্রধনু সে সুদূর আকাশে আঁকা,আমি ভালবাসি মোর ধরণীর প্রজাপতিটির পাখা’  । যা পেয়েছি তাই নিয়েই খুশি থাকতে চাই।        
 
সাংবাদিক —-অনেক ধন্যবাদ সাক্ষাৎকার দোওয়ার জন্য।                      
 
সঞ্চিতা—আপনাদের অনেক ধন্যবাদ সাধারণ মানুষদের নিয়ে কাজ করার জন্য। ভাল থাবেন।                      আপনার জীবনের দুটি ভীষণ খুশির ঙনু সে সুদূর আকাশে আঁকা,আমি ভালবাসি মোর ধরণীর প্রজাপতিটির পাখা’  । যা পেয়েছি তাই নিয়েই খুশি থাকতে চাই।  
      
সাংবাদিক —-অনেক ধন্যবাদ সাক্ষাৎকার দোওয়ার জন্য।                       
সঞ্চিতা—আপনাদের অনেক ধন্যবাদ সাধারণ মানুষদের নিয়ে কাজ করার জন্য। ভাল থাকবেন।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *