একটি ছড়ার ভেতর বাহির // যাকারিয়া আহমদ

 একটি ছড়ার ভেতর বাহির   //  যাকারিয়া আহমদ
ছড়াকার কবি রিতা ফারিয়া রিচি’র একটি ছড়া “আমরা দু’টি পাখি”। ছড়াটি পড়ে আমার মনে খুব আঘাত লেগেছে। লাগার কথা। হৃদয়বান কেউ পড়লে ব্যথিত হবে। আমার মনে হয় একজন সফল লেখকের এখানেই স্বার্থকতা। ৮ ও ৬ মাত্রার স্বরবৃত্তের এই ছড়াটি পড়ে আমার মতো অনেকের হৃদয় জ্বলেপুড়ে ছাঁই হবে।
একটি গাছের ডালে আশ্রয় নিয়ে ছিল দু’টি পাখি। ভালোবাসার বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে নির্জন বনে অনেক স্বপ্ন নিয়ে বসে ছিল তারা। ধরিত্রীর বুকে অন্যান্য পাখিদের মতো জীবন-যাপন করত তারা দুই’য়েও। দেখুন রিতা এই কথাগুলো কীভাবে বলছে__
“একটি ডালে বসেছিলাম
অামরা দুটি পাখি,
হৃদয় খুলে যে যার মতো
করছি ডাকাডাকি৷
স্বপ্ন ছিলো রাশি-রাশি
পাখি দুটির মনে,
করতো বসত দুইটি পাখি
নিঝুম গভীর বনে৷”
কিন্তু হঠাৎ করে কালবুশেখি ঝড় এসে তছনছ করে দিল তাদের রাশি রাশি স্বপ্ন ও বাসা। যেটাকে রিতা “প্রত্যাশাহীন ঝড়” বলেছেন। আসলে কেউ চায় না তার জীবনের স্বপ্ন গুড়েবালি হোক। কিন্তু গুড়েবালি হয়ে গেল এখানে। ঝড়ে আঘাতে একটি পাখি পা ছিঁটকে বা ডানা ভেঙে নিঃপ্রাণ হয়ে বালুচরে পড়ল দু’টি স্বপ্নের কুপোকাত হয়ে। যেভাবে বলছেন রিতা__
“মধুর সময় কেড়ে নিলো
প্রত্যাশাহীন ঝড়ে,
একটা পাখি ছিঁটকে পড়ে
তপ্ত বালুর চরে৷”
বেঁচে থাকা পাখিটির কাছ থেকে অনেক দূরে চলে গেল আলো-আশা আর ভালোবাসার দিনগুলি। পাথরের মতো বক্ষ নিয়ে বেঁচে আছে একটি পাখি। বন্ধু পাখিটির অবেলায় চলে যাওয়ায় বেঁচে থাকা পাখির মন এখন পুড়ে পুড়ে উথাল পাথাল হয়। যেমন__
“স্বপ্নমাখা দিনগুলো সব
যায় হারিয়ে দূরে,
কষ্ট-পাথর লেপ্টে থাকে
বক্ষটাকে জুড়ে৷
অাজ অবেলায় চলে গেলে
অনেক-অনেক দূরে,
মনটা আমার উথাল-পাথাল
যাচ্ছে পুড়ে-পুড়ে।”
বহমান নদীর মতো জীবনে কখন যতি পড়ে কেউ বলতে পারে না। পারবেও না কখনও। ঠিক তা-ই ঘটল কী না রিতার জীবনে জানি না। কাব্য কথায় বুঝা যাচ্ছে কল্পনার বাইরে থেকে তার জীবন ও যৌবনে হঠাৎ যতি এসে পড়েছে। যে বিচ্ছেদের কথা তিনি প্রতিদিনই ভাবেন। যেমন__
“জীবন ছিলো প্রবহমান
নদীর মতো গতি,
কখনো কি ভেবেছিলাম
পড়বে হঠাৎ যতি৷
প্রতিদিনই পাখি রে তোর
অপেক্ষাতে থাকি,
এই হৃদয়ে সারাটাক্ষণ
তোর ছবিটাই অাঁকি৷”
রিতা অপেক্ষায় থাকেন ঝরে পড়া পাখিটির প্রেমের টানে ফিরে আসার পথ পানে। পাখিটিকে নিয়ে রিতা’র অনেক স্বপ্নবোনা বাকি রয়েগেছে। পাখিটির ছবি আঁকতে আঁকতে রিতা’র আঁখি বেয়ে জল পড়তে থাকে। আর তার রূপরঙ নিয়ে ভাবতে ভাবতে মনের অজান্তে গেয়ে ওঠে__
“হায় রে পাখি ক্যামনে দিলি
সঙ্গিনীকে ফাঁকি,
তোর সাথে যে স্বপ্নবোনা
ছিলো অনেক বাকি৷”
জীবন মৃত্যুর মালিকের হাতে সব জীবের বাঁচা মরা। সুখ দুখ দুই’য়ের নিয়ন্ত্রণ তাঁর হাতে। জানি না রিতা’র বন্ধু বেঁচে আছে কী না। বেঁচে থাকলে বাঁচুক আরও বহুকাল। আর পরবাসী হলে সুখ-শান্তির ঠিকানা জান্নাত লাভ করুক এই কামনা।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *