কবি ও কবিতা পাঠকের দরবারে // তৈমুর খান

কবি ও কবিতা পাঠকের দরবারে // তৈমুর খান

সাম্প্রতিককালে কিছু উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বিবৃতি বা শ্লোগানধর্মী কবিতা নিয়ে কিছু কবিতার অগভীর ও খুচরো পাঠকের হইচই আমার মোটেও ভালোলাগেনি। কবিতা যিনিই লিখুন না কেন, প্রকৃত কবিতা যে এমনটি হবে না তা বলাই বাহুল্য। এতে বরং কবিতার মাহাত্ম্যই নষ্ট হয় বলে মনে করি।.

কবিতা আমজনতার প্লাটফর্ম নয়। সকল শ্রেণির পাঠকের মুখ চেয়ে প্রকৃত কবি কখনও কবিতা লেখেন না। জীবনানন্দ’র বহু ব্যবহৃত কথাটি আর একবার উচ্চারণ করে বলা যায় “কেউ কেউ কবি”। এই “কেউ কেউ” কবিদের কবিস্বীকৃতি পেতে সারাজীবন অপেক্ষা করতে হতে পারে। তবে তাঁর সমকালে “কেউ কেউ”  যে তাঁকে চিনতে পারেন তা আমরা ইতিহাসের অভিজ্ঞতায় অনুমান করতে পারি।

ইংরেজি ভাষার বিখ্যাত কবি অ্যাডরিয়ান মিতচেল একটি সাক্ষাৎকারে এবং “পোয়েট্রি”  গ্রন্থে একথাই বলেছিলেন “Most people ignore most poetry because most poetry ignores most people.”  প্রকৃত কবিতা তাৎক্ষণিকভাবে জনপ্রিয় হয়ে উঠতে পারে না, বেশ কিছুদিন অপেক্ষা করতে হয়। আর দুর্বল কবিতা যদি জনপ্রিয় হয়, তবে তা বেশিদিন স্থায়িত্ব লাভ করতে পারে না।

জীবনানন্দ দাশের সমস্ত জীবন ধরেই এই ঘটনা ঘটেছে। সে যুগের পত্রপত্রিকাগুলি তাঁর অধিকাংশ লেখা ফেরত দিয়েছে। “বনলতা সেন” কবিতাটি দীর্ঘদিন প্রকাশের মুখ দেখেনি।

    কবিতা রচনা একটা শিল্প এবং এমনই শিল্প যে তা সর্বদা পরিবর্তনশীল এবং মারাত্মকভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষার বিষয়। শিল্পটিকে যে কবি যত নতুনভাবে পরিবেশন করতে পারবেন, সে কবি চিরাচরিত কবিতাচর্চার ধারণাকে বদলে দিয়ে পাঠককে নতুন এক অভিজ্ঞতার সম্মুখীন করাবেন।
.

পাঠককে ভাবানো, পাঠককে চিরচেনা পথের বাইরে নিয়ে যাওয়া এবং নতুন করে শিল্পকর্মটির ব্যাপারে আগ্রহী করে তোলাই কবির কাজ। এই কাজটি যে কবিরা করতে পেরেছেন, পরবর্তীকালে তাঁরাই সাহিত্য’র ইতিহাসে স্থান করে নিয়েছেন। আমাদের বাংলা সাহিত্যে এবং বিদেশী সাহিত্যে তাঁরাই স্মরণীয়।

     কবিতা সর্বযুগে একইরকম হবে, এ ধারণা ঠিক নয়। বা সব কবিতাকে একইরকমভাবে আলোচনা করা যাবে এ পথও ভ্রান্ত। কবিতা যেমন পাল্টাচ্ছে, আলোচনার পদ্ধতিও পাল্টাচ্ছে। রস আস্বাদনের বিষয়টি ভিন্ন পথে চালিত হচ্ছে। সুতরাং বেশিরভাগ কবিতাই বেশিরভাগ পাঠকের কাছে গ্রহণীয় হচ্ছে না।.

অনুকরণ ও অনুসরণে বাংলা কবিতা যেমন জীর্ণ, তেমনি গতানুগতিক ক্লিশে হয়ে পড়ছে। সেইসব ক্লিশে কবিতাই চির অভ্যস্ত পাঠক গ্রহণ করে। গতানুগতিক পদ্ধতিতে সেসবেরই বিচার বিশ্লেষণ করে। এসব অদক্ষতা অদূরদৃষ্টির কারণেই ঘটে। প্রকৃত কবিরা এই শ্রেণির পাঠকের থেকে সর্বদা দূরেই থাকবেন।

      “দি পাইলন” রচনায় বিখ্যাত কবি স্টিফেন স্পেন্ডার বলেছেন “Great poetry is always written by somebody straining to go beyond what he can do.”   কবিতাকে এই সিদ্ধির পর্যায়ে নিয়ে যেতে যে দক্ষতার প্রয়োজন হয়, তা একজন প্রকৃত কবিরই থাকে। আবহমানকালের মানবসঞ্চার, বহুমুখী জীবনের প্রগাঢ় ব্যাপ্তি এবং সময়াতীত আবেদন না থাকলে সেই সৃষ্টির মধ্যে অমোঘতা খুঁজে পাওয়া যায় না।

যে ভালোলাগা শুধু কবিতার বিষয়েই সীমাবদ্ধ থাকে তা নয়, অর্থ না বুঝতে পারারও রহস্যময়তার আবরণ হৃদয়ে একপ্রকার আবেদন নিয়ে উপস্থিত হয়। কবিতার এই বোধের উপস্থিতি পাঠক বুঝতে পারে, কিন্তু ভাষায় প্রকাশ করতে পারে না। আমরা জানি অনুভূতির কোনও ভাষা নেই ।  অনুভূতির কোনও বিকল্পও নেই। বিরহের জ্বালা এবং ক্ষুধার জ্বালার অনুভূতি এক নয়। ক্ষুধার অনুভূতি শারীরিক, কিন্তু বিরহের অনুভূতি মানসিক।

      আমাদের সৃষ্টিতত্ত্ব, আত্মতত্ত্ব, শরীরতত্ত্ব এবং ঈশ্বরতত্ত্ব নানাভাবে কবিতায় প্রতিফলিত হয়। জীবন তো এক রহস্যময় জন্ম-মৃত্যুর নিগড়ে বাঁধা। কবিরা নিজস্ব উপলব্ধিতে নানাভাবে তা তুলে ধরার চেষ্টা করেন। আবার মানুষ আদিম প্রবৃত্তির দ্বারাও চালিত হয়। সামাজিক অনুশাসনের কারণে তার অবদমন ক্রিয়াও চলতে থাকে। এই আদিম প্রবৃত্তি এবং প্রবৃত্তির অবদমন কবিতায় নানাভাবে আসতে পারে।

সুররিয়ালিস্টিক বা অধিবাস্তবতায় কিংবা জাদুবাস্তবতায় তা কখনও কখনও রূপ পরিগ্রহ করে। অবচেতন মনের স্বয়ংক্রিয় অভিযাপনে কবির এই ভাবনাপ্রবাহ প্রতিনিয়ত এক মহাজাগতিক মুক্তির প্রয়াসী হয়ে ওঠে। এইসব কবিতার অন্তরালে ব্যক্তিজীবনের অচরিতার্থতা থেকে শূন্যতার মর্মর বিষাদের দেখা পাই।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *