কবি বিরুপাক্ষ পণ্ডার “গাজন গানের শিখা” কাব্যটির আলোচনা করলেন কবি তৈমুর খান

তৈমুর খান


হৃদয় গলিয়ে শব্দ তৈরি করেন বিরূপাক্ষ 
—————-

তৈমুর খান 
——————

কবি হবার জন্য কেউ জন্মায় না, তবু তারা কেন কবি হয়ে যায় ? 
বিরূপাক্ষ পণ্ডাকে পাঠ করতে করতে আমার এপ্রশ্নেরই উদয় হয়েছিল । উত্তরও তাঁর কাছেই পেয়েছিলাম :
“বসে বসে মনখারাপের কাব্য লিখছি তাই 
প্রকাশ পেলে জানিয়ে দেবো কী পেলাম ভাই 
বহুদিনের পচা পেট হাতে কলম তুলি 
অনেকেই আপনজন, কীভাবে তাদের কথা ভুলি  !”
পৃথিবীতে আসার পর যখন তিনি উপলব্ধি করেন “অনেকেই আপনজন”  তখন তো তাঁকে কবিতাই লিখতে হয়। শূন্য থেকে জীবন শুরু করে মহাজীবনে পৌঁছতে মোক্ষম মাধ্যমটি “সৃজন প্রজাপতি”  ; হোক তা পাগলামোর খেরো লেখা বোকা কালিদাসের কর্ম। 
       বিরূপাক্ষ “গাজন গানের শিখা”  ২০১৩ তে লিখেছেন। খুব সাদামাটা কাব্য। প্রায় ৭২ টি কবিতা আছে এতে। কোনও কবিতাতেই চাতুরি নেই। নিজের হৃদয়কে গলিয়ে শব্দ তৈরি করেন বিরূ । ভেবেচিন্তে 
দুরূহ পথে হাঁটতে চান না। সময় ও জীবনকে দেখেন। হানাহানি, ধর্ম-সম্প্রদায়ের বিভেদ কোন্ কাজে লাগে ? 
দেবতা, ঈশ্বর নয়, জনজোয়ারের প্রাণের কথাটিই গাজন গানের শিখা হয়ে ওঠে :
“বিশ্বেও আজ বিষ সন্ত্রাস জ্বালা 
তোমরা এখন হিটলারেরই গুরু 
অমৃতলোকে বেঁচে থাক সব লীলা 
আমাদের হোক জনযাত্রার শুরু।”
এই জনযাত্রায় নিজেকেও সামিল করতে পারেন, কার্ল স্যান্ডবার্গের (১৮৭৮ —১৯৬৭) মতো তিনিও বলেন : “ I am the people — the mob — the crowd — the mass.”  এই আদিম অস্থিরতা কবিকে সকলের সাথে সামিল করেছে। এর কোনও মলাট নেই। ঘোর তন্ময়তায় বেদনার বুদবুদে কার্যকারণহীন অন্ধকার আর রক্তপ্রবাহে জনমানসের দগ্ধপ্রহর কাটে ।  বিরূ তো সেই কারণেই কবি হয়ে ওঠেন। 
      বিষণ্ণবেলার বিরহী পাখির কাজল চোখ আকাশের প্রসন্ন বেহাগ খুঁজে পায়। শব্দের মই, কবিতার উপসর্গ, কথার খই, ঘোল সরবত, অতিথির ব্যাকরণ, সুকেশী নারীর নকশি খোঁপা আর আঁধার আভরণ সব মিলেই যুগান্তরের বিপ্লবী কামাল পাশা। ঠিকানাবিহীন হয়েও মানুষের হৃদয়ে ঠিকানা হয়ে যান কবি। নিজেরই বৈভব যেন নিজেই। কবি বলেন “চেতনার গান মানেই আমাদের মহাজয়।”  যতই বৈপরীত্য আসুক, এরই প্রতিধ্বনি বেজে ওঠে :
“আমার সুখের নাম থরমরু 
আমার আলিঙ্গন কালো রাত 
আমার অভিসার ধুলোবালি 
আমার দুঃখ কোকিল আর কুহু!”
কবি তো জীবনেরই সমগ্রতায় আত্মস্ফুরণের নিবিড় সংশ্লেষে বেঁচে থাকেন। তাই ইতিহাস থেকে শূন্যতার জাগরণে ভাঙনে জনারণ্যে নিজেকে দেখতে থাকেন। ওয়াল্ট হুইট ম্যানের কথা যেন তাঁর কণ্ঠেও বেজে ওঠে : 

“I celebrate myself, and sing myself,
And what I assume you shall assume,
For every atom belonging to me as good belongs to you.”
(Song of Myself (1892 version)
BY WALT Whitman)

এই কণ্ঠই “গাজন গান” গেয়ে চলেছে “পৃষ্ঠায় পৃষ্ঠায় শুধু সাধনা আর প্রয়োগ।”  “সম্ভবে” এসে বসেছে “শূন্যতা” । তবু এর সাধনা অবরুদ্ধ হয়নি। জীবনের ব্যাপ্তি ও মহাবিজয়কে কবি এগিয়ে নিয়ে গেছেন বহুদূর। 

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *