কবি রাখহরি পাল এর কাব্য আলোচনা //  আলোচক : তৈমুর খান 

https://www.sahityalok.com/
জীবনের শূন্যতা থেকে নির্ঝরের বহুবৃত্তীয় উন্মীলন 
অঙ্কের অধ্যাপক কবি রাখহরি পাল (জন্ম ১৯৫৫) এর কবিতা খুব একটা পাঠ করার সুযোগ ঘটেনি। মাত্র দুটি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশ হয়েছে “আর একটা শূন্য”(২০১৭) এবং “কোনো গল্প নেই” (২০১৯) । “কোনো গল্প নেই” কাব্যটিই সম্প্রতি আমার হাতে এসে পৌঁছেছে। প্রায় ৭০ টি কবিতা বিভিন্ন সময়ে লেখা। কাব্যের ভূমিকায় কবি উল্লেখ করেছেন : “এক একটি টুকরো ভাবনা যা মনকে নাড়িয়ে যায়, যার অনুভবে ক্লান্তি ঘোচে,
 ক্লেদ মুক্ত হই, আর একটু সত্যের অনুবর্তী হওয়া যায় হয়তো বা ঈশ্বরীয় কিছুর প্রান্তে দাঁড়িয়ে পৃথিবীকে দেখা যায়, এসবের কল্প কথাই কবিতা, ব্যাকরণের অনুশাসন সেখানে অনভিপ্রেত, প্রাপ্তিও অনাকাঙ্ক্ষিত।” কাব্যের কবিতাগুলিতে এরই যথাযথ প্রতিফলন ঘটেছে। শব্দের স্নানে অনুভূতির মুক্তি ঘটাতে যে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ কবিতা নামক শিল্পটিতে উঠে আসে, রাখহরি পালের কাছে তা এক স্বর্গীয় আনন্দের মুহূর্ত বলা যেতে পারে। 
কেননা তিনি সত্যের অনুবর্তী হওয়ার পথ হিসেবেই কবিতাকে বেছে নেন। প্রাপ্তির আকাঙ্ক্ষা করেন না। এ রকম নির্মোহ আত্মনিবেদন ও আত্মিক অনুধ্যানে তাঁর জাগরিত শব্দবোধে আমাদেরও আগ্রহ জন্মে। ভালোবাসতে ইচ্ছে হয়। কাছে দাঁড়িয়ে তাঁর উষ্ণতাকে ভাগ করে নিতে চাই। 
      গার্হস্থ্য জীবনের বহুমুখী ক্রিয়ায় কবি কীভাবে বড়ো হয়েছেন, পড়াশুনো করেছেন, অঙ্ক করেছেন, পিতা-মাতাকে চিনেছেন, জীবনের শূন্যতা থেকে নির্ঝরের বহুবৃত্তীয় উন্মীলন যা “ডাইমেনশন চেঞ্জ হতে হতে অসীমে হাত বাড়ায়”। সেই অজ্ঞাত অসীম কীভাবে হাতছানি দিয়েছে তারই পরিসর কবিতায় পাই। জীবনের ছায়াগুলি নশ্বর হয়েও চিরন্তন মানবীয় পর্যায়ে ডানা মেলে দিয়েছে। তবু “শিকড়ে জড়ানো তাদের মায়ঘন বিস্তার” মরমিয়া এক অব্যর্থ “বোধচর্চা” হয়ে উঠেছে। কবি সাধারণ থেকে অসাধারণ দার্শনিক হয়ে উঠেছেন : 
“চিহ্ন হারানো শোক বুক ফাটা কান্নায় 
ফেরে না আলোর পাখি যেকোনো সংজ্ঞায় 
যতো তুমি ভরে তোল মৃত্যুর ব্যাকরণ 
শূন্য তার অস্তিত্বের শেষতম প্রকরণ।”(অনড় অধ্যায়) 
শেষপর্যন্ত নাথিংনেস্ প্রজ্ঞারই অবিন্যস্ত প্রকরণে সমস্ত অঙ্কেরই শূন্য উত্তর পেয়েছেন। সিদ্ধান্তও সেভাবেই দার্শনিক ভাবনার উত্তরণে পৌঁছে গেছে :
“অসীম তবু অসীমে থেকেছে 
রাত্রির তারারা ধাওয়া করে পিছু হটেছে উপবৃত্তে, 
তুমি দ্রুততর।” (হয়নি একটিও) 
https://www.sahityalok.com/
স্বাভাবিকভাবেই কবিতাও সেই নশ্বর, শিল্পহীন একটি কর্ম মাত্র। কবির তাই প্রতীতি “পঞ্চশরে বিদ্ধ জীবন সত্য ছদ্মবেশী”। কামচেতনা আর ভোগ ছাড়া জীবনে আর কিছু নেই। দেহ একটা শূন্যতারই আধার। “কুলটা হৃদয়” শুধু “নষ্ট অবসর” যাপনে ব্যস্ত। অনন্ত নির্মাণে তাই নিজেকে ক্ষুদ্র অপাংক্তেয় মনে হয়েছে :
“শুধু অবকাশগুলো 
জোনাকির মতো জ্বলে, নিভে যায়।” 
(অনন্ত নির্মাণে শুধু একবারই) 
কোথাও আলোর ঠিকানা নেই। রংধনু আঁকা আকাশেও শূন্যবৃত্তের নিঃসীম কারুকাজ । ঝরাফুল কুড়িয়ে আঁচল ভরে দিনযাপনের গ্লানি ভোগ করে যাওয়া। 
কবি প্রত্ন জীবনকে বহন করেন বলেই বলতে পারেন “ভাবনাগুলোর পিছু নেই।” বাবার অতৃপ্ত বাসনাগুলো তাঁর মধ্যে ফিরে আসে। কবিতার রূপ ধারণ করে। অপরদিকে প্রাত্যহিক নষ্ট সভ্যতার ছবিও অবক্ষয় আর ধ্বংসের মধ্যে জেগে ওঠে : 
“রাত্রি-আকাশে ডানা ঝাপটায় শোক 
শ্বাপদের ঠোঁটে ছটফট করে ভ্রূণ।” (শোক তবু ম্রিয়মান)
তবু অন্তঃসত্ত্বা দিনের দেখা পান কবি। সামাজিক আচারের ঊর্ধ্বে প্রাণের পরিণয় যেখানে হৃদয়কে আর এক হৃদয়ের কাছে পৌঁছে দেয় সেখানে কি গল্প থাকে? না, কোনো গল্প থাকে না। তবু এক ম্লান গল্প তৈরি হয় :
“কোনো উল্লেখযোগ্য উত্থান নেই 
পতনের আকস্মিকতাও ছিল না 
আর কোনো অপালারা আসেনি 
স্থির জলে নৌকা ভাসানোর ধারাবাহিকতা 
থ্যাবড়া সিঁদুরে বসিয়েছিল মৃত চাঁদের টিপ 
—এমন ছিল সেদিনের গল্প”(কোনো গল্প নেই) 
এই গল্প স্থির, ম্লান, গতানুগতিক, দৈনন্দিনের অনুসরণ ও অনুকরণ। জীবনের এই রূপ তো অভিজ্ঞতা সঞ্জাত। বাহিত হয়ে চলেছে অবিরাম। একজন ইংরেজ লেখকও তাই বলেছেন :
” Many of life’s failures are experienced by people who did not realize how close they were to success when they gave up.”   
(Thomas Edison)
জীবনের সাফল্য তো জীবনের অভিজ্ঞতার উপরই নির্ভর করে। যাঁরা সঠিকভাবে অনুধাবন করতে পারেন তাঁরাই সাফল্য পান। তাঁরাই বলতে পারেন “নিরাময়ের ছন্দ উপচে আনন্দ সাগর।” এই অভিজ্ঞতার সিঁড়ি বেয়েই রাখহরি পাল যেমন গণিতজ্ঞ, তেমনি কবি দার্শনিক এবং সত্যসন্ধানী এক সাধকও। জ্যামিতিক প্রচ্ছদের রঙিন বিমূর্ত বোধের আবেদন যথাযথ । শিল্পী দেবাশিস সাহাকে ধন্যবাদ। 
*কোনো গল্প নেই : রাখহরি পাল, পাঠক, ৩৬ এ কলেজ রো, কলকাতা ৭০০০০৯, মূল্য ১৫০ টাকা। 
    

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *