কিশোর কবি ইমদাদুল হোসেনের স্বর আজও শুনতে পাই // তৈমুর খান

কিশোর কবি ইমদাদুল হোসেনের স্বর আজও শুনতে পাই // তৈমুর খান

ইমদাদুল হোসেনকে ভুলতে পারি না, আজও মনে হয় ভোরের কুয়াশায় সে আমার আগে আগে হেঁটে চলেছে। তাঁকে অনুসরণ করতে করতে হঠাৎ সম্বিৎ ফেরে।

.

না, ইমদাদুল নয়, আমারই ভ্রম। বীরভূমের প্রান্তিক গ্রাম রাজগ্রাম থেকে রামপুরহাটে ট্রেন থেকে নেমে সে সারারাস্তা হেঁটে আসত আমার গ্রামের বাড়িতে। অবাক হতাম। বলতাম, তোমার কি মাথা খারাপ?

.
সে উত্তর দিয়ে বলত, আসলে বাসে উঠেও নেমে গেলাম, মানুষেরা বড়ো কাঁদছে। আমি কান্না সহ্য করতে পারি না।
সত্যিই তার কাছে মানুষের দুঃখের কান্না বাজত । অভাবের ঘ্রাণে দিশেহারা হয়ে যেত ইমদাদুল।

.

তার মানসিক ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া এমনই যে তা ভেবেও সে অস্থির ও বিমর্ষ হয়ে পড়ত।
স্কুলজীবনেই ওর সঙ্গে পরিচয়। চিঠিপত্রের আদান-প্রদানও। কিশোর মনের কত স্বপ্ন ও লুকোচুরি, ইশারা ও সম্মোহন উপলব্ধি করতে পারতাম। ওইটুকু বয়সেই তার কবিতার শব্দে পারস্য- ইসফাহানের ভ্রমর-ভ্রমরীর গুঞ্জন শুনতে পেতাম। বয়ঃসন্ধির ইরানী বালিকার নূপুর বেজে উঠত।

.

ওমর খৈয়াম, আমির খসরু, মির্জা গালিব যেন সবাই এসে তার চারিপাশ ঘিরে আছে। তাঁদের লেখা প্রেমের ও বিরহের কবিতাগুলি সে নিজেই অনুবাদ করে শোনাচ্ছে। শুনতে শুনতে তন্ময় হয়ে যেতাম। ভাবতে পারিনি সেই ছেলেটাই একদিন রেললাইনে ঝাঁপ দিয়ে মৃত্যুর স্বাদ পেতে চাইবে। আমেরিকান কবি সিলভিয়া প্লাথের (১৯৩২ -—১৯৬৩) মতো তারও মনে কি প্রশ্ন জেগে উঠেছিল? “Is there no way out of the mind?” কিংবা তার মনে হয়েছিল “Dying is an art, like everything else….”

.

অথবা আমেরিকান আর এক কবি অ্যান সেক্সটনের (১৯২৮ —১৯৭২) মতো তাকেও পেয়ে বসেছিল “Death, I need my little addiction to you….”

.
এই আত্মহত্যা যে মারাত্মকভাবে নিজেকে ধ্বংস করার পথ তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। যে সময় তার উন্মুক্ত ও মহাবিস্ময়ের ব্যাপ্তি নিয়ে লোকসম্মুখে আসার কথা, সেইসময়ই সব অন্ধকার হয়ে যাওয়া।

.

ইমদাদুল হোসেন পৃথিবীতে এসেছিল ৭ জানুয়ারি ১৯৭৪ সালে। প্রস্থান করেছিল ৩০ অক্টোবর ১৯৯৮ সালে। পিতার নাম আব্দুল মকিম শেখ, মাতা সেলিনা বানু।

.

জন্মস্থান বীরভূমের প্রত্যন্ত গ্রাম রাজগ্রাম। বিড়ি বাঁধা শ্রমিক ঘরে জন্ম বলে অভাবের লোনা স্বাদ পেয়েছে ছোট বয়সেই। অত্যন্ত মেধাবী হওয়ার কারণে বৃত্তিও পেয়েছে কয়েকবার। মাধ্যমিকে “স্টার” পেয়ে উচ্চ মাধ্যমিক পর্যন্ত গড়ালেও অভাবের কারণে পড়াশুনো বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়।

.

১৯৯১ সাল থেকেই বেশকিছু পত্র-পত্রিকায় তার লেখা প্রকাশিত হতে থাকে। ১৯৯৪ সালে ৪ জানুয়ারি “দেশ” পত্রিকায় তার “ইক্ষুক্ষেতের ভিতর পরীক্ষাহল” নামে একটি কবিতা প্রকাশিত হয়। সুধী মহলে কবিতাটি রেখাপাত করে। এসময় ভারত-বাংলাদেশের বহু পত্রিকায় গুচ্ছ গুচ্ছ কবিতা প্রকাশ পায়। এক অভূতপূর্ব চিত্রকল্পধর্মী কবিতা স্বপ্ন ও বাস্তবের মাঝামাঝি অন্য জগতে পাঠককে টেনে নিয়ে যায়। সাহিত্যের নতুন পদধ্বনি বলে মনে হয়।

.

তবে নব্বই দশকের যা বৈশিষ্ট্য আত্মাভিমানে পুড়ে ছাই হয়ে যাওয়া জীবনের স্বরূপ ইমদাদুলেরও কবিতার প্রধান বিষয়। প্রেমশূন্য, মানবিক সম্পর্কশূন্য এক জগতের ঊষর মরুতে কবি দাঁড়িয়ে যেন পাতা ঝরিয়ে দিচ্ছে। আত্মহননের মরমি করাত কবির সত্তাকে সর্বদা চির্ চির্ করে দিচ্ছে। দীর্ণ অস্তিত্বের ভেতর সময় ধারণের অনুলিখন ফুটে উঠছে। মাত্র ২৪ বছর বয়সেই জীবনের অন্তিম মুহূর্ত তাই সমাগত। “ইক্ষুক্ষেতের ভিতর পরীক্ষাহলে” ইমদাদুল লিখেছে :

.

“ইক্ষুক্ষেতের ভিতর পরীক্ষাহল, ইক্ষু খেতে খেতে পরীক্ষা দিই আমরা !
আমি, অভিজিৎ, সচরাচর না দেখা-যাওয়া মৃণাল
চশমা-পরা শ্যামলদা
মিঠিপুরের ভাস্কর গাঙ্গুলি, নৃপেন, নৃপেন্দ্রকৃষ্ণ —
সেলিমদা ;

.

মেয়েরা এসেছে যথারীতি
মহুয়া তার বান্ধবী সিঁদুর-মাথায় নির্মলার সঙ্গে গল্পরত
ইক্ষুক্ষেতের ভিতর পরীক্ষাহল, ইক্ষু খেতে খেতে পরীক্ষা দিই আমরা !”

.

নব্বই দশকের গ্রামবাংলা ছিল “ইক্ষুক্ষেত” যেখানে আমাদের মানবসভ্যতার পরীক্ষাহল। বিভিন্ন স্থানে বসবাসকারী বিভিন্ন নাম ধারণকারী আমাদের পরিচয়টিও কবি তুলে ধরে।

.

কবিতার পরবর্তী অংশে আমরা দেখি এর ওর প্রশ্নপত্রে উত্তর লিখে দেওয়া,উপযুক্ত পরীক্ষকের অভাবে রুই মাছ এঁকে দেওয়া, টেবিল বাজিয়ে “হাওয়া হাওয়া”গান করা — যা শাসনহীন শৃঙ্খলাহীন জীবনের রসদে ডুবে যাওয়ার মতো ঘটনা।

.

এর মধ্যে যে শ্লেষ আছে, জীবনের দিশাহীন, মৌলিক প্রত্যয়হীন কাণ্ডকারখানা আছে তাতে সময়কে জানানোর পক্ষে যথেষ্ট। অথচ “সিঁদুর-মাথায় নির্মলা”র পরিচিতিতে সামাজিকতা ও সৌজন্যও আছে, তবু যেন সবই এক-একটা ফার্স মাত্র। তখন কি টি এস এলিয়টের কথাই মনে হয় না? “All our knowledge brings us nearer to our ignorance.”

.

আর্থিক ও পারিবারিক কারণে কবি মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলে। খুব বেশিদিন আর স্রোতের বিরুদ্ধে লড়াই করে উঠতে পারে না। অবশেষে চলন্ত ট্রেনের সামনে নিজেকে ঠেলে দেয়। ১৯৯৪ সালের জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি সংখ্যা বাংলাদেশের বিখ্যাত সাহিত্য পত্রিকা “দ্বিতীয় চিন্তা” (সম্পাদক : ইফফাত আরা) পত্রিকায় প্রকাশিত তার একটি কবিতার কিছুটা অংশ উল্লেখ করলে বোঝা যাবে তার কবিতার বৈশিষ্ট্য :

.

“একজন হকার মশলা-মুড়ি তৈরি করছে। সোমবার।
তিনটি আন্দোলনের ইস্তাহার ইস্টিশানের দেয়ালে ঝুলছে
আটজন পুরুষ-রমণী চাদর ঢাকা দিয়ে শুয়ে আছে মেঝেয় —
কবি ও দক্ষিণের কয়েকজন প্যাসেঞ্জার বসে আছেন লম্বা কাঠের চেয়ারে

.

একটি পশমের শিশু তার মায়ের স্তন পান করছে —
কুয়াশায় আপাদমস্তক ডুবে আছে মীরকাশিমের দেশ..”

মীরকাশিমের দেশের কোনও ট্রেনস্টেশনের চিত্র। কবিতাটির আগের অংশে ভিখিরির হাতে থালা, ইউক্যালিপটাস গাছে কুয়াশার চাদর, হনুমান মন্দির, সি আর পির বাংলো, চাষির মাথায় বেগুনের ঝুড়ি সব দৃশ্যের মধ্যেই বাংলার সকালকে দেখতে পাই। ইতিহাসের সঙ্গে কবি বর্তমানকেও মিলিয়ে দিয়েছে।

.
ইমদাদুল একটাও কাব্য প্রকাশ করে যেতে পারেনি। কোনও কোনও লিটিল ম্যাগাজিনের সম্পাদক তাঁদের সম্পাদিত পত্রিকায় কবিকে খুঁজে পেতে পারেন। কোনও প্রকাশক বা গবেষক তার লেখাগুলি সংগ্রহ করে একটি সংকলন প্রকাশ করতে পারেন। এই কাজটি করতে পারলে ইমদাদুল বৃহত্তর পাঠকের কাছে পৌঁছাতে পারবে।

.

.

.

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *