গঙ্গাসাগর // মাধব মণ্ডল

এখন একটা হিড়িক উঠেছে যে কোন সমিতির সম্মেলন ছোটখাটো হলেও একটা বেড়ানোর জায়গায় করা। এ যেন রথ দেখা আর কলা বেচা।সপরিবারে চলো।একটা ট্যুর হয়ে যাবে। এইজন্যেই কখনও দার্জিলিং কখনও সাগর কখনও বকখালি, দীঘা, মুকুটমণিপুর বা অযোধ্যা পাহাড়ও বাদ যায় না। আর সমিতিগুলোর কর্মকর্তারা হাসি হাসি মুখে প্রেস কনফারেন্স করবেন – দেখ হে আমাদের পিছনে কত লোক!
এখন তো লোকজন সংগঠনে ভিড় করে কিছু পাবার আশায়। যে নেতা যত পাইয়ে দেবেন সে তত বড় নেতা।ধরাধরি, তেলমারা, কাজ উদ্ধার করাই জনসেবা, দেশসেবা।একটা ধান্দায় চলো, ধান্দায় থাকো। আশা না মিটলে গাল পাড়। নইলে দল ছাড়ো।
ধূর তেরিকা, আমার ওতো কী? আদার ব্যাপারীর জাহাজের খোঁজ করলে কী চলে? আসলে এসব কাজ রিপোর্টারের ভিতরে বসবাস করা আরেক রিপোর্টারের। আচ্ছা বাপ, তা তুই নিজের মত রিপোর্টারি কর! আমি যাই দেখি, সুধাংশুদা কী বলতে চান। একটা স্কুপ তো চাই আমার!
আরে এস এস – সুধাংশুদা সাদরে ডেকে বসালেন।
সকালের পর সান্ধ্য সেসনের তোড়জোড় চলছে। কিন্তু সুধাংশুদার মন অন্যদিকে। আমিও আনমনা। অন্য কাগজে কাজ করলেও সুধাংশুদা প্রথম থেকেই আমাকে বিভিন্নভাবে সাহায্য করেন। তবে এটাও মনে করিয়ে দ্যান – এটা কিন্তু ইনভেস্টমেন্ট, প্রয়োজনে তুলে নেব। কিন্তু এখনও পর্যন্ত সেটা হয় নি।
এই যে সকালের সেসনে কত প্রস্তাব উঠলো আর হাত তোলা ভোটে পাস হয়ে গেল। সন্ধ্যেতে বা কালও এসব হবে, এমনকি কমিটিও এভাবেই তৈরি হয়ে যাবে। আসলে দেখানো, দেখ আমরা কত গণতান্ত্রিক! ওসব ফালতু, কে আর বিরোধিতা করে চিহ্নিত হবে? কার ঘাড়ে ক’টা মাথা! সুতরাং অচলায়তন চলছে চলবে।


এই শোন পাগলা, সুধাংশুদার মুড ভাল থাকলে আমাকে এভাবে ডাকেন, কাছাকাছি যেতে ফিসফিসিয়ে বললেন, ঝাউবনে আজ সকালে না একটা মহিলার ডেডবডি মিলেছে, একটু খোঁজ নে ডাল মে কুছ কালা থাকতে পারে রে।
সকালেই এ খবর ছড়িয়ে গিয়েছিল। ওতে খবরের কিছু নেই ভেবে ছেড়ে দিয়েছি। এখন তো দেখছি ভুল হল। যেখানে দেখিবে ছাই, উড়াইয়া দেখিবে তাই, পাইলেও পাইতে পারো অমূল্যরতন —— রবীন্দ্রনাথ কি আমার মত রিপোর্টার ছিলেন নাকি?তাহলে তো সাংবাদিক রবীন্দ্রনাথ বলে নির্ঘাৎ একটা দু’টো বই বেরতো। আর বেরলে চোখে পড়বে না, তাতো হতে পারে না। মাঝে মাঝে ইচ্ছে করে, যে বই এখনও কেউ লেখে নি, সেটা লিখে ফেলি, রবি ঠাকুরের ছোট ও বড় বাইরে। যা কাটতি হবে না! আমার কবিতার বই এর মতো হাল হবে না। যাগগে…….
হাঁটছি, কানে আসছে নানা কথা। কেউ কেউ বলছে, কালকেই তো দুপুরে ওদের দেখা গেছে। গোটাচারেক ফাঁটওলা ছেলে আর দু’টো মেয়ে এখান দিয়েই সুমো করে গেল। ওরা বোধহয় জানতো না, এখানে এখন সম্মেলন চলছে, কোন ঘর মিলবে না ইত্যাদি ইত্যাদি। গুজব ভালই রটেছে। স্থানীয় লোকজন ওদেরকেই সন্দেহ করছে। পুরানো কত ঘটনাও এইতালে অনেকের মনে পড়ে যাচ্ছে। আর এক একটা প্রকৃত বক্তার জন্ম হচ্ছে।
মেয়েটি কে, কোথা থেকে এখানে এল, খুন এখানে হল নাকি খুন করে কে বা কারা এখানে ফেলে গেল, এসব ঝগড়া সৃষ্টিকারী, তর্ক সৃষ্টিকারী আলোচনায় এসব তলিয়ে দেখার অবকাশ নেই বা অবকাশ থাকে না। শুধু তর্কই চলছে, এখান থেকে আর কোন খবর মিলবে না। শুধু গুজব আর গুজব। এবার পুলিশ ফাঁড়িতে যাওয়া যাক।
ফাঁড়িতেও বিশেষ কিছু মিলল না। বয়স চল্লিশের কোঠায়, খুনের আগে গণধর্ষণ, পরিচয় জানা যায় নি, ধর্ষণ, খুন করে ফেলে এখানে ফেলে গিয়েছিলো ইত্যাদি ইত্যাদি। এত সাতপাতার চার পাঁচ লাইনের মত খবর। আরো খোঁজও হে রিপোর্টার!


ফাঁড়ির বাইরে চায়ের দোকানে বসলাম। এখানেও জোর কদমে একই আলোচনা। সবে চায়ে চুমুক দিয়েছি, ছোট হাতি করে একদল এল। নেতা টাইপের ক’জন হনহন করে ফাঁড়ির মধ্যে ঢুকে গেল। আলাপে জানা গেল কাছাকাছি একটা গ্রাম থেকে তারা আসছে। ফাঁড়িতে আমিও ঢুকলাম।
ওদের দাবিমতো লাশ দেখাল পুলিশ। ওরা জনে জনে গিয়ে শনাক্ত করে এল। এ তাদেরই মেয়ে। সংক্ষেপে ঘটনাটা হল, বিধবা মেয়েটিকে সাংসারিক কারণে একটু বকাঝকা করেছিল বাড়ির লোকজন, তাতেই নাকি মেয়েটা পরশু কাউকে কিছু না বলে বেপাত্তা হয়। আত্মীয় স্বজন সবার বাড়ি খোঁজা হয়, কোথাও কোন হদিস পাওয়া যাচ্ছিল না। লোকমাধ্যমে খবর পাওয়ামাত্র এখানে ছুটে এসেছে।
তাহলে সুধাংশুদা, এই যদি ঘটনা হয়, আমার স্কুপ কই? এমন ঘটনা তো প্রতিদিন কতই ঘটে চলেছে।
পাঠক পড়বে কেন? আমার চিফ রিপোর্টারই বা ওয়েল ডান বলে ছাপতে পাঠাবে কেন? হুম!! চল মন সাগর কিনারে, জলের ঢেউ দেখ আর গোন!
কতক্ষণ বসে ছিলাম জানি না। কত কি ভাবছিলাম। আমার ছোট্ট মেয়েটার কথা, তার হাসি কান্না, আবোলতাবোল, হযরলব কত কি! আসার সময় গলা জড়িয়ে কত আদর, কত আব্দার, এটা নিয়ে আসবে বাবা, ওটা নিয়ে আসবে বাবা। মাঝে মধ্যে মনে হয় রিপোর্টারদের বিয়ে করা উচিত নয়। ওকে ছেড়ে আসতে বুকের মধ্যে চিন চিন করে ওঠে!
শেষ দুপুরে এই ঘটনায় দু’জন টোটোওয়ালা, তিনজন ডালাওয়ালা এবং এক চাওয়ালিকে পুলিশ গ্রেপ্তার করল। সুধাংশুদা বললেন, এবার জমিয়ে লেখ হে রিপোর্টার!

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *