ঘামের দাম  // মাধব মণ্ডল

ঘামের দাম   //  মাধব মণ্ডল


একবার একটা রিপোর্ট করতে তালদিতে গেছি। স্টেশন লাগোয়া স্কুল। রাজ্য সাঁতারের বহু উঠতি মুখের আঁতুড়ঘর এই স্কুলটি। সুন্দরবনের একটা নামী স্কুলও এটা। পরিকাঠামো দেখে, সাঁতারুদের সঙ্গে , হেড ও গেমস টিচারদের সঙ্গে দীর্ঘক্ষণ কথাবার্তা বলে, খবরাখবর নোট বন্দী করে যাকে বলে একটা ফিচার উপযোগী মালমশলা বগলদাবা করে আমি আর ফটোগ্রাফার বিশু স্টেশনে ঢুকে চা খাচ্ছি।

 লোকাল লোকেরাও এটা ওটা জানাচ্ছিল। রিপোর্টার দেখলে  একদল এমন করে। আবার যে কাগজে সরকার বিরোধী লাগাতার খবর বেরোয়, তাদের অবশ্য অকথা কুকথা শুনতেই হয়। সুযোগ বুঝে মারধোর করতে, ক্যামেরা ভাঙতেও এরা পিছপা হয় না। কি আর করা যাবে, যে পেশার যে ধকল!

চা টা বেড়ে বানিয়েছে। বিশুকে খোঁচা দিলাম, দ্যাখ ও ব্যাটা কিছু বলবে মনে হচ্ছে। দূরে একটা লোক, একেবারে সাদামাটা, পোষাক আষাকও সেই রকম, আমাদের দিকে তাকিয়ে কিছু বলব বলব করছে। 
আপনি কিছু বলবেন মনে হচ্ছে? বিশু জানতে চাইল। লোকটা মাথা নাড়ল, বলল, বলব কিনা ভাবছি। পাশ থেকে একজন বলল, ও আমাদের চিনু, কবিতা শোনাবে মনে হয়।

একসময় আমিও খুব কবিতা লিখতাম। কাব্যঠেকে রোজ যেতাম, নানা কিসিমের গলাবাজিতে যোগও দিতাম। একটা বইও বেরোল, কয়েক ছিলিমের প্রশংসার ধোঁয়াও কপালে জুটল। কিন্তু ঐ পর্যন্তই। দোরে দোরে ঘুরেছি, কাব্যঠেক ছাড়া কেউ ছাপে না। তারপর রিপোর্টারি করতে এসে কবিদের দেখলে কেমন যেন অকম্মার ঢেঁকিটেকি মনে হয়। এড়িয়ে চলি বাছাদের। কিন্তু তারা আমাকে এড়ানো তো দূরের কথা, আষ্ঠেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরতে চায়।

দাদা, একটা উপকার করুন না, এই তিনকপি বই দিচ্ছি একটু পৌঁছে দিন না। অগত্যা……..,  তবে একটা শর্ত দিই, আমাকে বই নিয়ে আলোচনা বেরলো কিনা, আদৌ বেরবে কিনা, এ নিয়ে এক্কেবারে ফোন করা যাবে না। বেচারা কবিরা! নিজেকে কি ভাবে, বাংলা সাহিত্য যেন তার মত প্রতিভার জন্যে বসে ছিল এতকাল! যদিও আমিও একসময় ভাবতাম এমনটা। যাক গে ওসব….


ট্রেন আসছে, রোববারের বারবেলা, উঠে পড়লাম। ফাঁকা ট্রেন, বসতে না বসতেই, আরে সেই চিনু লোকটা আমাদের সামনাসামনি সিটে বসলেন। আলাপ হল, বেশ ক’টি কবিতার বই আছে ওর। শেষ বইটা আমাকে দেখার জন্যে দিলেন। একটু উল্টেপাল্টে দেখলাম, বাঃ কভারটা তো বেশ ভাল, নামটাও চমকে দেবার মতই, যৌনতার শহরে একা।

কিন্তু লেখায় চোখ বুলিয়ে আরও চমকে যাচ্ছিলাম।
একান্ত নারী বলে কিছু হয় না
আসলে যে সময়টুকু লেপ্টে থাকো তার শরীরে
বিশুদ্ধ নোনা নোনা ঘামের সঙ্গে
যৌনাঙ্গের শিরশিরাণিতে
সেটুকু ফেনিয়ে ফেনিয়ে ভাবি 
ভাবতে ভাবতেই নারীর মধ্যে পুঁতে ফেলি
সত্যি সত্যিই, পুষে রাখা ছায়ানারীদের
তাতো হবার নয়, তাতো হয়ও না
নারী থেকে নারীতে একান্ত নারী খুঁজে
খাঁটি এই সত্য আকাশে ঝুলিয়ে
নুড়ির মতো বহুগামী বদনাম কুড়াই
হায়, মনে হয়, এ ইতর জন্ম!
চিনুবাবুকে বললাম, এটা আমি নেব?

নিন না তবে দাম দিয়ে। আমি তো কাউকেও ফ্রি কপি দিই না, এমন কি কাগজে আলোচনার জন্যেও না। আমি মনে করি, সব মানুষের ঘামের দাম দেওয়া উচিত। কোথাও কেউ আমন্ত্রণ জানালেও আমি সেই একই কথা বলি। সব্বাই পয়সা নেয়, আর আমরা চাইলে আকাশ থেকে পড়ে! বলি, আমাদের চলবে কি করে? আমি হ্যান্ড মাইক্রোফোন নিয়ে হাটে বাজারে যাই নিয়মিত, সরাসরি মানুষের কাছে, বলি বই কিনে পড়ুন, শোনাই নিজের কবিতা, গল্প, ছড়া। মানুষ আসে, ভালবেসে দূরদূরান্তে নিয়ে যায়, থাকতে দেয়, ভালোমন্দ খেতে দেয়, আর যাতায়াত  খরচ ছাড়াও কিছু টাকাও দিতে যাতে না ভোলে সেটা বারবার মনে করিয়ে দিই।

দাম দিয়েই নিলাম বইটা। বিশু একটা ফটোও নিল। বললাম, আপনাকে নিয়ে একটা খবর করব।
একদিন আসুন, আমি চিফের অনুমতি নিয়ে রাখব। চিনুবাবু ফোন নম্বর দিয়ে বললেন, তার যেতে আপত্তি নেই, তবে টাকা দিতে হবে। বললাম, কথা বলে পরে আপনাকে জানাব। বাংলার হারিয়ে যাওয়া চারণ কবিরা, চিনু কবির নতুন রূপে কি ফিরে আসছেন? দেখতে হবে এবং দেখাতে হবে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *