ঝড় — পর্ব – ১১ — বন্য মাধব

 ঝড়  --   পর্ব - ১১  --  বন্য মাধব

সেলটা বেশ ভালো, আমাদের বাড়ির তুলনায় এক্কেবারে ফাইভ স্টার হোটেল! দোতলায় একটা হলঘরে আমাদের ঠাঁই হলো। দু’সারি আড়াআড়ি সিমেন্টের খাট। এক যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত কয়েদি এ সেলের সর্বেসর্বা। ভাল, সবই ভাল। আমাদের মাটির দেওয়াল খড়ের চালের বাড়ির চেয়ে লক্ষগুণ ভাল। তক্তোপোষে ছারপোকা নেই, বলা নেই, কওয়া নেই, দ্যুম করে বিছানায় চালবড়া সাপ পড়ার চান্স নেই,
হঠাই-ই পাঁচ হাত কালাসের দেখা পাবার সম্ভাবনাই নেই, মাঝরাতে সাপ দেখে হাঁস মুরগির মরণ ডাক নেই, কাঠের গাদায়, খড়ের গাদায় বিকট ফোঁসফোঁসানি নেই, নেই তা দিতে বসা ধাড়ি মুরগী বা হাঁসের চিল চিৎকার শুনে ছুটে বিষাক্ত সাপের কপাকপ ডিম খাওয়ার ভয়ানক বিভৎস দৃশ্য দেখার সুযোগই।
আর গা শিউরানো বাস্তু কেউটের সপরিবারে রোদ পোহানো নেই। এ এক অন্যপৃথিবী, জেলখানা যার পোষাকি নাম সংশোধনাগার! কি সংশোধন হবে? না এমনভাবে চল, আইন তোমার টিকিটিও যাতে না ছুঁতে পারে। সব জানে কিন্তু কিছুই জানে না, কিছুই দেখে নি ভান করে। সোজাকথা তুমি চালু সিস্টেমটাকে বজায় রাখো, এটাই তোমার মহান দায়িত্ব। পুলিস প্রশাসন পার্টি সবার কাছেই হাত কচলাও,
 তাহলে তুৃমি আমাদের লোক, নাহলে হারামি, বাঞ্চোৎ, শুধু শুধু গায়ে ছাপ্পা মারা হবে, ধরা হবে, মান অপমানের চূড়ান্ত করা হবে। সময় সুযোগ বুঝে নকশাল বা খ্যাঁকশালও বানাতে বেশি সময় লাগে না। অংশ বংশ ধ্বংস হবার যোগাড়, তবুও তুমি জোতদার, শ্রেণি শত্রু, আর যাদের বংশধরেরা ভোল পাল্টে খদ্দর পরে কিচ্ছু নেই ভান করে তেলেজলে থাকে তাদের সাতখুন মাপ।
চটকা ভাঙল, দু’টো করে কম্বল এসেছে, চল চল নিয়ে আসি,  হুম এতেও হুড়োহুড়ি!সব জায়গায় এই এক অবস্থা, শুধু নিজেরটা নিয়েই থামা নয়, যতটা পারা যায় নিজের লোকেদের জন্যেও করা, কি রেশন ধরা, টিকিট কাটা, বাস বা ট্রেনে বসার জায়গা রাখা, এমনকি ডাক্তার দেখানোতেও একই ব্যবস্থা, সব জায়গায় একা না বোকা, তালে তাল মেলাও, তবেই না জীবন!
আমি আর কাকুর জামাই মুকুন্দদা সবার শেষে গেলাম। মুকুন্দদা এমনিতে চুপচাপ, এই ঘটনা তাকে আরো চুপচাপ করে দিয়েছে। নিজের জীবনেই দেখেছি কিছু কিছু ঘটনা প্রবাহ মানুষকে একেবারে পেড়ে ফেলে, মুখ থেকে হাসি মিলিয়ে যায়। মুকুন্দার বোধহয় তাই। তবে সবটাই আমার অনুমান, সবটা সত্যি নাও হতে পারে, তবে গত একবছরে মিলিদিকে বিয়ে করা নিয়ে মুকুন্দদাকে যে অকারণ ঝড় ঝাপটার মধ্যে পড়তে হয়েছে, তার কিছু কিছু চোখে পড়েছে, কিছু কিছু শুনেছি, অন্য কেউ হলে, 
এমনকি আমি হলেও, কবেই ধ্যুততেরিকা বলে, নিকুচি করেছে ভালবাসার বলে কেটে পড়তাম। সেখানে একাই লড়ে মুকুন্দদা সব পাকামাথাদের চিৎ করে গেম বের করেছে। কিন্তু তাতেও শান্তি এসেছে বলে মনে হয় না, আর এই অকারণ অ্যারস্ট হওয়া, হাজতবাস বোধহয় শেষ পেরেক মারল, মিলিদির জন্যে আফশোষ হচ্ছে, আবার মিলিদি শ্যাম রাখি না কুল রাখি করেই কষ্ট পাবে।
মুকুন্দদাকে বললাম, দাদাকে খুব ক্লান্ত লাগছে, শুনে দাদা শুধু হাসল, বললাম, জামিন পেতে অসুবিধা হবে না, ফলস কেস না, তাতেও দাদা মন্তব্যহীন। মাঝেমধ্যে মনে হয় মুকুন্দদাকে বোঝা আমার পক্ষে অসম্ভব, ওনার এ্যান্টেনা সব সময় খাড়া থাকে অবশ্য, মনে হয় খুঁটিনাটি সব দেখছে, শুনছে। আমার মা বলে ছেলেটা আবেগে ছোটে আর অভিজ্ঞতা নেই বলে হোঁচট খায়, হবে হয়তো।
কম্বল নিয়ে পাশাপাশি দু’টো সিটে ফিরে এলাম, একটাকে পাতলাম, একটাকে বালিশ বানালাম, শরীর এলিয়ে দিলাম, যাও ক্লান্তি যাও আমার শরীর ছেড়ে, আমি ছিপছিপে হই, ছটপটে হই। সব চোখকান খুলে দেখি, শুনি, এমন মওকা আর কি পাব?
হ্যাঁ, মওকা বটে মওকা! বিনাকারণে এমন মস্ত অভিজ্ঞতা ক’জনের হয় জানি না, আমার হল, জামিন পেয়েই বেনামে একটা জম্পেস রিপোর্ট করলে, নিদেনপক্ষে দৈনিক কাগজে একটা চিঠি পাঠানোও যেতে পারে, দ্যুস ওসব করে কার লাভ, মাঝখান থেকে আমি চিহ্নিত হয়ে যাব, এ পার্টি বি পার্টি তো একই সরকারে, দু’পক্ষই শত্রু ভাববে। 
এই বাবু এরা রাতে আজ খেতে দেবে না? মুকুন্দদা জানতে চাইল।
সামনে দিয়ে একজন যাচ্ছিল, জানাল এবার আসবে, কুমড়োর ঘ্যাঁট আর হাফ পোড়া রুটি।
বাঃ, আমার মুখ ফসকে বেরিয়ে গেল, আহা অমৃত!
লোকটা এসে আমার বিছানায় বসল, আমাদের নিয়ে তার অনেক কৌতূহল, একে একে সব  মেটালাম। মুখে হাজারটা দাগ, কপালেরটা সবচেয়ে বড়, শত্রুরা সুযোগ বুঝে কোপাকুপি করেছে বোধহয়।
কিংবা নিজেই বোধহয় মারামারি করেছে, আর তার চিহ্ন বয়ে বেড়াচ্ছে। জানাল, খুনের কেসে সে লাইফার খাটছে এবং তার কোন খারাপ লাগাও নেই, এখানে সে দিব্যি আছে, কি কেসে? না, দলবেঁধে অপহরণ, রেপ আর খুনের কেসে। বিচার মিটতে মিটতে বছর ছয় আর দেখতে দেখতে আরও দুই, এ জেল ও জেল হয়ে এক্কেবারে এই খানদানি জেলে। এরমধ্যে পেরলে গিয়ে আরও খান তিনেক খসিয়ে এসেছে, বাপরে ওস্তাদ লোক! বললাম, ওগুলোতে ধরা পড় নি!
বলল, আমার বাপ আছে ঐ ওদিকটার সেলে, তিনি থাকতে আমার আর কোনও ভয় নেই। এখন বেরবো আর কাজ সেরে গুডবয় হয়ে ফিরে আসবো। 
বললাম, সেকি!
বলল, একবার যে এপথে নেমেছে, তার ফেরা হয়ে ওঠে? বরং এখানে জমিয়ে বসাই ভাল, তেলেজলে থাকা যায়। গুরুদেব এখানে বসেই রাজ্যপাট চালায়, কাল নিয়ে যাব, আলাপ হলে বুঝবে এমন লোককে কেউ এখানে আটকে রাখে? কত কঠিন কাজ কত সহজে গুরুদেব করে ফ্যালে।
মুখ ফসকে বেরিয়ে আসছিল, তো তিনি যে কেস খেলেন? দুমদাম চেপে পেটের কথা পেটেই চালান করে দিলাম, আরেকটু হলে বেফাঁস হয়েছিল আর কি! বললাম, হ্যাঁ হ্যাঁ, নিশ্চয় যাব। বলতে বলতে খাবার ঢুকলো। 
হুম, যেমন শুনেছিলাম, তেমনই বটে। হলদে হলদে জলে খোসাসুদ্ধ ডুমো ডুমো কুমড়ো আধ ভাষা হয়ে ঘুরছে, স্বচ্ছ জলে তলায় থাকা খোসাসুদ্ধ আলুর ছোট ছোট পিসও দেখা যাচ্ছে। বাঃ, বেশ গরম ধোঁয়া উড়ছে, আরেকটা ডেকচিতে রুটি, খাবলা খাবলা পোড়া। 
আমরাও বিনাবাক্য ব্যয়ে নিয়ে এলাম।
মজা করে খাচ্ছি, ছালফাল সব সমেত, আর মনে পড়ছে মার মুখ। একবার চাষের মরশুমে বাঁধ ভাঙলো, আর নোনাজল ঢোকা মানে চাষের বারোটা বাজা, সুতরাং হিসেব করে চল, একদানাও অপচয় করা যাবে না। আস্তে আস্তে আমরা অভ্যস্ত হয়ে গেলাম সব ধরনের খাবার খেতে। প্রথম প্রথম পেট নামত, তারপর ঠিক হয়ে গেল, আর একেবারে গরীব মানুষের অবস্থা চোখে দেখা যেত না, একটু ফ্যানের জন্যে তারা বাড়ি বাড়ি ঘুরত, এত অভাবের মধ্যেও মা ফ্যানের মধ্যে দু’মুঠো হলেও ভাত দিত।
খেতে গিয়ে একটা আলুর টুকরো ছিটকে গেল, যাচ্ছলে! আমি যেন সেই অভাবের দিনেই রয়েছি, কুড়িয়ে নিলাম। 
কর কি! খুব ক্ষিদে লেগেছে? এই নাও দু’টো রুটি, আমি আর পারছি না, বলেই মুকুন্দদা রুটি দু’টো দিতে হাত বাড়াল। একমনে খাচ্ছিলাম, মুকুন্দদা খাচ্ছে কিনা দেখার কথা ভুলে গেছিলাম।
খেয়ে নিতে বললাম, পরে ক্ষিদে পেলে খাবে, বললাম, না, শেষমেষ নিতেই হল। মিলিদির কথা মনে এল, কি করছে কে জানে, তবে কাঁদবে না, ছোটবেলা থেকে এসব দেখতে দেখতে মন শক্ত হয়ে গেছে।
বললাম, দাদা ঝোলটা তোফা হয়েছে, কুমড়াটাও সলিড শুধু আলোটা একটু…..
দাদা খালি হাসল, যার যেমন প্রকাশ ভঙ্গিমা!

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *