ঝড় — পর্ব – ২৩ — বন্য মাধব

স্বপ্নের ঘোরে ছিলাম, কখন দিদি ঘরে ঢুকেছে জানতে পারি নি, কপালে ঠান্ডা হাত পড়ায় চমকে উঠলাম, চোখ খুলে দিদির হাসি মুখ দেখতে পেলাম, কত কত দিন পর দিদি আদর করছে, আস্তে আস্তে চুলে বিলি কেটে দিচ্ছে, আরামে চোখ জড়িয়ে আসছে, দিদি মারা যাবার পর ক্লাস সেভেন পর্যন্ত কখনও দিদি কখনও ঠাম্মির কাছে ঘুমোতাম, তারপর দিদিরা আমার আলাদা থাকার ঘর দিল, একটু একটু করে দূরত্ব বাড়তে লাগল, দিদিও কেমন যেন নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ল, একটু খিটখিটেও, লক্ষ্য করতাম দিদি যেন একটা অস্থিরতায় ভুগছে, চুপচাপ নিজের মনে সবসময় কী যেন ভাবে, কাজ করতে করতে আনমনা হয়ে যায়, মিকিদি বলতো, দিদিকে একটু সময় দিতে, দিদির সঙ্গে সময় পেলে গল্পগুজব করতে, মিকিদিও আমাদের বাড়িতে এলে দিদির সঙ্গে বেশি সময় কাটাতো, আমাকে আলাদা জিজ্ঞাসা করতো, স্যারের সঙ্গে কিছু কী হয়েছে নাকি? বলতাম, হ্যাঁ, মাঝেমধ্যে কথা কাটাকাটি হতে শুনি, স্যারও এই সময় খুব গম্ভীর হয়ে যেত, দিদি তো হতোই।

এ্যাই ভাই, জানিস আজ না মার স্বপ্ন দেখলাম, কতদিন পর, আমি চমকে উঠে বললাম, তাই! আমিও তো এইমাত্র দেখলাম, কী কাকতালীয় ঘটনা বল!
আজ কী কী করবি, কোথায় কোথায় যাবি, ঠিক করলি কিছু?  রোববার আমি আর মিকি যাব, এ ক’দিনে সব গুছিয়ে নে, দিদি, আমার মায়ের গলায় কথা বলছে, আমি বাধ্য ছেলের মতোই বললাম, হ্যাঁ, প্রাথমিক কাজগুলো অনেকটা এগোবে, সমিতি একটা পা রাখার জায়গা পাবে, মাসখানেকের মধ্যেই আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনও করা যাবে, তুই চিন্তা করিস না দিদি, সব ঠিকঠাক চলছে, দিদি মায়ের মতোই হাসল, আমার সব কেমন গুলিয়ে যাচ্ছে, দিদি আর মা একাকার হয়ে যাচ্ছে, দিদি বলছে, তোর ওপর অনেক দায়িত্ব চাপিয়ে দিলাম রে, বাবুদাকেও জড়িয়ে নে, এক এক করে তোর ভাবনাগুলো আমরা সবাই কাজে লাগাবো, তুই এরমধ্যে একটা চাকুরি বাধিয়ে ফেলিস, কী বলিস, তাইতো? ঐ কাজটা হেলা করবি না ভাই, ঠিক আছে?
ঠিক না থেকে আর কোথায় যাবে!
ঠাম্মি ঘরে ঢুকলো, দু’ভাই বোনে কী আলোচনা হচ্ছে, নিশ্চয় সমিতি? তা’ ভালো, ভালো চিন্তা নিয়ে দিন শুরু হওয়া ভালোই, উঠে পড় সব, এক সপ্তাহের মধ্যে পাঁচটা ছাত্রী আমার চাই-ই, মনে রাখবি, হুঁ, দিদি আমি দু’জনেই হেসে ফেললাম, দিদি বলল, ঠাম্মি, তুমি বাবাকে বুঝিয়ে বোলো সব, ঠাম্মি বলল, সে আর বলতে! তোদের বাবা দেখবি কোনো অমত করবে না, এতো ভাল একটা কাজ, কেনই বা বাধা দেবে? বরং দেখিস, কতো ভাবে তোদের কাজে হাত লাগাবে, ও শুভকুমার, ওঠো এবার, কাজ ছকে নাও দেখি, একটা বিদ্যুৎ খেলে গেল শরীরে, উঠে পড়লাম।
ঘর থেকে বেরোবার মুখে আমি আর দিদি পড়বি তো পড় বাবার সামনে, যদিও বাবাকে আমাদের কোনোদিন বাঘের মতো মনে হয় নি, মা মারা যাবার পর বাবা যখন সংসারে উদাসীন ছিল, তখনও না, আর এখনও না, বাইরে একটা সমিতির বোর্ড দেখলাম, ওটা কার? বাবার ছোট্ট জিজ্ঞাসা, আমাদের কিছু বলার আগেই ঠাম্মি বলল, সে অনেক কথা রে খোকা, আগে চা-টা খা, তারপর সব বলছি, ঠাম্মি রান্নাঘরে চললো, দিদিও, বাবা হাসি মুখে টয়লেটে, আমিও ব্রাশে পেষ্ট লাগিয়ে বাইরে গেলাম, একটা যুত মতো জায়গা খুঁজতে লাগলাম, কোনখানটায় বোর্ডটা ঝোলানো যায়, হুম, ঐ ঐ জায়গাটা, বাবার জানলার তলায়, হুম, ঐ জায়গাটাই বেষ্ট, কেষ্টা আসছিল, ও এখন ভোরে দৌড়াতে বেরোয়, আর্মিতে ঢোকার জোর প্রস্তুতি নিচ্ছে, বললো কি ব্যাপার শুভদা, তুই এতো ভোরে উঠে এখানে কী খুঁজছিস রে! শোনালাম ব্যাপারখানা, বলল এই ব্যাপার! এটা একটা ব্যাপার হলো! ধ্যুস, তুই আমাকে মাত্তর তিরিশটা টাকা দিস, আচ্ছা, তাও দিতে হবে না, তুই বরঞ্চ আমাকে দু’টো ক্ল্যাম্প আর একটা গুলপেরেক এনে দে, না, না, থাক, তুই বোর্ডটা বরং বার কর, আমি আসছি, একছুটে পগার পার, আরে শোন, শোন কেষ্টা, আর কেষ্টা!
এই আমাদের কেষ্টা, যেটা করবে বলে সেটা সদ্য সদ্যই করা চাই চাই-ই, একবার ওই-ই ঠিক করলো, সবাই মিলে সরস্বতী পুজো করা হবে, এবং সরস্বতীর মতো দেখতে রিকাকে দিয়েই উদ্বোধন করানো হবে, যেমন ভাবা তেমন কাজ , দু’দিনে বাড়ি বাড়ি গিয়ে চাঁদা তোলা শেষ, রিকাকে, ওর বাবা মাকে রাজি করানোও, একেবারে করিৎকর্মা ছেলে, পাড়াময় একটা হুলুস্থুল পড়ে গেল, বড়রাও সোৎসাহে পিছনে দাঁড়িয়ে গেল, ফলে আয়োজনও বাড়তে লাগল, শাঁখ বাজানো, মোমবাতি জ্বালানো, বালতিতে বল ফেলা, মিউজিক্যাল চেয়ার, আবৃত্তি, মায় তিনদিন তিনটে নাটক, প্রথম দিন রবি ঠাকুরের অমল ও দইওয়ালা, দ্বিতীয় আর শেষদিনে সুকুমার রায়ের অবাক জলপান এবং গেছোবাবা, বাব্বা, যত জন সমর্থন বাড়তে লাগল, কেষ্টারও মাথা খাটাবার চেষ্টা তত বাড়তে লাগল, এই সেই কেষ্টা, চেষ্টা করেও আমরা যা মাথায় আনতে পারি না, ও তাই পারে, ও মাধ্যমিকে অঙ্কে নিরানব্বই পায়, ইতিহাসে পায় চৌত্রিশ, বলে সাল তারিখ ওর মনে থাকে না, তারপর পড়াশোনায় আর মন নেই, কোনক্রমে উচ্চমাধ্যমিক, আর এখন আর্মিতে ঢোকার জন্যে আদাজল খেয়ে নেমেছে।
সরস্বতী পুজো প্রথম দু’দিন হিট করে গেল, আমরা ভাবছি শেষদিন সুপার হিট হবেই হবে, তাই হল, তবে সেটা হল গিয়ে সুপার ডুপার হিট, প্রথমে গেছোবাবা পাটের দাড়ি চুলকাতে গিয়ে বিপত্তি ঘটালো, দাড়ি খুলে এক্কেবারে দর্শকদের মাথায় পড়ল, হাসির হুল্লোড় উঠল, গেছোবাবারূপী কেষ্টা এরপর কী করবে ভেবে না পেয়ে নামতে গেল, আর মড়মড় করে বাঁশ ভেঙে নীচে পড়ল, ভাগ্যিস কারো ঘাড়ে পড়ে নি, ঘটনা সামাল দেবার জন্যে কেষ্টা তড়িঘড়ি মঞ্চে এল, মাইক হাতে বলতে লাগল, বন্ধুগণ, যুগের হাওয়ায় মূল নাটকের এইটুকু পরিবর্তন আমরা করেছিলাম, করতেই পারি, দেখলাম, তোমরা বেশ আমোদ পেয়েছো, এই তো চাই, থ্রি চিয়ার্স ফর আটিপাড়া, থ্রি চিয়ার্স ফর সরস্বতী পুজো, আরও কী সব যেন বলে মঞ্চ থেকে নেমে দাড়ি লাগিয়ে এবার আর বাঁশের আড়ায় নয় খোদ জামগাছটায় বসে পা দুলিয়ে দুলিয়ে দাড়ি নাড়তে লাগল, নাটক আবার জমে গেল।
এই কেষ্টার গুণের শেষ নেই, একবার বড় পুকুরপাড়ে আড্ডা মারতে মারতে ও আমাদের সঙ্গে একটা দুঃসাহসিক বেট করে বসল, জিতলে এক কেজি রসগোল্লা ওকে খাওয়াতে হবে, হারলে ওই-ই খাওয়াবে আমাদের, বাজার করে এই পথ দিয়ে যে লোক প্রথম ফিরবে তাকে ঠেলে পুকুরে ফেলে দিতে হবে, এটাই বেট, হুম, দেখাও কেষ্টা চেষ্টা করে তোমার কেরামতি! আমরা ওকে দুয়ো দিতেই লাগলাম, বললাম, ধর কেষ্টা, এর মধ্যে যদি আমাদের বাড়ির কেউ ফেরে? তাতে কী! তোরা তো জানিস, কথা ইজ কথা, কেষ্টার কথা, নট নড়নচড়ন!
যত সময় কাটতে লাগল, শীতের আলো মিলিয়ে যেতে লাগল, দু’হাতে বাজার ভর্তি ব্যাগ নিয়ে হনহনিয়ে কে আসছে, আমাদের উত্তেজনা বাড়তে লাগল, আরে ওতো ভোটোদা, বাড়ি ভর্তি কুটুম, চোব্যচোষ্যর মালমশলা নিয়ে যাচ্ছে, যাক আমাদের কারো বাড়ির কেউ নয়, বাঁচা গেল, আমি তবুও বললুম, এ্যাই কেষ্টা, আর কিছু না হোক, কতটা বাজার নষ্ট হবে ভাব, কেষ্টা বললো, ভাবাভাবির কিছু নেই, দ্যাখ না, হুম, দেখা যাক, আমার তো আর বাড়িতে মার খাবার ভয় নেই, শুধু রসগোল্লার চাঁদাটা যাবে এই যা, কেষ্টা প্রায় লাফ দিয়ে ঠেলে উঠল, ততোধিক লাফ কেটে ভোটোদার সামনে গিয়ে দাঁড়ালো, ঘটনা ক্ল্যাইমেক্সে পৌঁছালে যেমনটা হয়, আমাদেরও তেমনটা হতে লাগল, কী ঘটে কী ঘটে!
কিন্তু যা ঘটলো, তা এককথায় অবিশ্বাস্য বলা যেতেই পারে, কেষ্টা চিৎকার করে বলল, ভোটোদা, বাজার আমাকে দাও, ছাড়ো, ছাড়ো, বৌদি কলতলায় পড়ে গিয়ে পা ফুলিয়ে কাতরাচ্ছে, তুমি ঝট করে ব্যাথার ট্যাবলেট আর মলম নিয়ে এসো, দাও, দাও, ব্যাগ ছাড়ো, ভোটোদা তো হতভম্ব হয়ে ব্যাগ ছাড়ল, তারপর কেষ্টার খেল, কেষ্টার নিপুণ পুশিং আর ভোটোদার আ আ আওয়াজসহ জলে ঝপাং, ব্যাগ দু’টো নিয়ে তীরবেগে পীঠটান দিতে দিতে কেষ্টা বললো, যা যা ভোটোদাকে ধুইয়েধাইয়ে বাড়ি পৌঁছে দে, আমি বাজারটা দিয়ে আসি।
আমরা তড়িঘড়ি হাত লাগিয়ে ভেটোদাকে পুকুর থেকে তুললাম, ছাড়, ছাড়, রাগ রাগ গলায় ভেটোদা বললো, কী ব্যাপার বলতো, তোরা কিছু জানিস? সত্যি তোদের বৌদির কিছু হয় নি তো রে! কেষ্টাটা বা এমন করল কেন? দাঁড়া, মজা দেখাচ্ছি, ফাজলামো ছাড়াবো, তোরাই বা এখানে কী করছিলিস? আমি নরম করে বললাম, আমরা তো খেলেটেলে হাত পা ধুতে এলাম, ওই তো এক্ষুণি হন্তদন্ত হয়ে এল,  তোমাকে যা বললো, আমাদেরও সেই কথাই বলছিল, আর সেই সময় তুমি এলে, বুঝতে পারছি না কী ব্যাপার।
দাঁড়া, কাপড় ছেড়ে আসি, বোঝাচ্ছি সব, ভোটোদা যেতে যেতে গজগজ করেই চলেছে, করেই চলেছে, বাড়িতে ঢুকতে না ঢুকতেই বৌদি বললো, তোমার জামা কাপড় ভিজলো কী করে, আর কেষ্টা বাজার দিয়ে গেল, বললো, তুমি নাকি আবার বাজারে গেছো, গরমমশলা না কী ফেলে এসেছো!
আমি বললাম, পুকুরঘাটে হাত ধুতে গিয়েই তো পা পিছলে কান্ডটা ঘটল, ভাগ্যিস আমরা ওখানে ছিলাম, একবাড়ি লোকের সামনে ভোটোদাকে লজ্জার হাত থেকে বাঁচাবার জন্যে আমিই আগ বাড়িয়ে বললাম, বাঁচাবার পথটা জুৎসই মনে হল ভোটোদার, তবে রাগ চেপে বললো, কাল সকালে কেষ্টাকে আমার সঙ্গে দেখা করতে বলবি, না হলে এত বড় উপকার করার পুরস্কারটা আমি নিজে বাড়ি বয়ে গিয়ে দিয়ে আসবো, আচ্ছা বলবোখন বলে আমরা চলে এলাম।
বেরিয়েই দেখি কেষ্টা দাঁড়িয়ে, কোনো চিন্তা নেই, বেট জেতার হাসি মুখে, পরের দিন সকালে, দুপুরে, সন্ধ্যেয়, রাতে, তারপরের দিন, তারপরের দিনও সেই হাসি, কোন জাদুতে ভোটোদাকে সে ম্যানেজ করেছিল আমরা বুঝতেই পারি নি, পারার কথাও নয়।
( চলবে)

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *