ঝড়, ৭ম পর্ব // বন্য মাথব

ঝড়, ৭ম পর্ব  //  বন্য মাথব
আজ অফিসে ঢুকেই একটা সংবাদ প্রাপ্তি হল। দুপুর দেড়টায় সাধারনসভা, রাইটার্স থেকে এক বড় নেতা আসবেন। টেবিলে টেবিলে খবর পৌঁছে যাচ্ছে। ভাল, তবে আমার এখন এসব ভাল লাগে না। শুনতে হয় শুনি আর কি! চাঁদা পত্তর যা চায় দিয়ে দিই। কোন বিতর্কে ঢুকি না। ঢুকেই বা কি করবো! মাঝে মাঝে মনে হয়, মানুষগুলোর আচ্ছা করে মগজ ধোলাই করে বাজারে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। কলের পুতুলের মত শুধু বকবক করে যায়। বিচার বিবেচনা রহিত এক শ্রেণির মানুষ।
 
 
আজকাল এদেরকে এড়িয়ে যাই। অবশ্য সংগঠন করাটাও তো জরুরী। সংগঠিত শক্তির প্রয়োজন সবসময়ই, এটা অবশ্য ঠিক, বিশেষ করে যেখানে শোষণটা আছে। 
 
সে যাই হোক, একটা হিরো হিরো ভাব যে আমার মধ্যে আছে, সেটা বেশ ভালই অনুভব করি, একেবারে ছোট থেকেই।
 
 
একবার হল কি, খুব গরম পড়ছে। গরমের সময় স্কুল মর্নিং হয়। সেবার কবে হবে কেউ বলতে পারছে না, স্যারেরাও জানেন না। কে জানে? হেডস্যার। কেউ তাকে কিছু বলার সাহস করছে না, না স্যারেরা, না ছাত্ররা। আমি আর কয়েকজন বন্ধু মিলে ঠিক করলাম, হেডস্যারকে এ বিষয়ে ব্যাবস্থা নিতে লিখিতভাবে জানাব। ভাবামাত্রই এ্যাকসান। একটু মক্সো করেই লিখে ফেললাম চিঠি, কিন্তু সে চিঠি পেয়ে তিনি খুব রেগে গেলেন। আমাদের ডেকে যাচ্ছেতাই বললেন। মোদ্দা কথা হল, আমি কি জন্যে আছি, সময়মতই মর্নিং করবো। তোদের কাজ এসব দেখা? সব লায়েক হয়ে গেছিস…. ইত্যাদি ইত্যাদি।
 
 
 
তো, লায়েকরা খবরের কাগজে পোষ্টার বানালো, দিস্তা কাগজেও, স্কুলের আশপাশ এলাকা রাতের মধ্যে পোষ্টারে ছেয়ে গেল। কিন্তু সকাল হতেই কে বা কারা সেগুলো ছিঁড়ে ফেলল। ছাত্র সংগ্রাম কমিটির সদস্যরা কি হয় কি হয় এমন একটা চিন্তায় আছি। এলাকায়, স্কুলে, ক্লাসে চাপা গুঞ্জন। কারা করল এমন কান্ড? কথা চাউর হতে বেশি সময় লাগে না। ছেলেছোকরাদের কাজে শেষ পর্যন্ত নকশাল ছাপ পড়ল। তাহলে এসব কাজ নকশালরাই করে? নকশালরাই তাহলে সাহসিক কাজের হকদার? আর সবার গোলটেবিল? যাইহোক, সেদিন টিফিনের আগের পিরিয়ডে মর্ণিং এর নোটিশ এল।
 
 
সেই শুরু। তারপর মৌলানা আজাদে পড়তে এসে সরাসরি নকশালদের সঙ্গে জড়িয়ে পড়া। তারপর তাদের সঙ্গেও অটোমেটিক বিচ্ছেদ।
 
 
তাহলে দাঁড়াচ্ছে এই ওটা আমার জায়গা ছিল না, শুধু হিরোইজমের টান। সংগঠনের মিটিং এ, মিছিলে মন হলে যেতাম, নচেৎ নয়। তারপর তো কলেজ পরিবর্তন, নতুন কলেজে বেটারদের সঙ্গে থাকা, ইচ্ছে হলে মিটিং মিছিলে যাওয়া, ব্যস ঐ পর্যন্তই। মিকিদি ঠিকই বলে, দিদিও, রাজনীতির কচু বুঝি আমি। ঠিক।
 
 
পাড়ায়ও ডাকা হতো, চুপচাপ শুনতাম, এদের রাজনীতি শুধু চাওয়া পাওয়ায়, আর কে কে দলের বিরুদ্ধে সেসব খোঁজা হতো। এদের মতে পাড়ায় বিরোধী বলে কিছু রাখা যাবে না, রাখলেই বিপদ। 
 
 
সেইজন্যেই কেলে যখন একলা পেয়ে সূর্যির মেয়েটার সঙ্গে ইন্টুবিন্টু করলো, দলের লোকের ব্যাটা বলে বাচ্চা ছেলের তকমা পায়, ঘা কতক দিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়, থানা পুলিশ হয় না। কিন্তু বিরোধী বলে, সুপতা রাত ন’টায় ফিরলে গলির ঠেকে বাঁকা কথা ছোঁড়া হয়, প্রতিবাদ করলে হাত ধরে টানাটানি চলে, থানায় গেলে আপস মীমাংসায় বসার পরামর্শ মেলে।
 
 
আসলে, যত বড় হচ্ছিলাম, রাজনীতি নিয়ে বীতশ্রদ্ধ হয়ে পড়ছিলাম, এ বি সি দলগুলোর ভাল লোকগুলোর সঙ্গে শুধু যোগাযোগ থাকছিল, এর ফলটা হলো এরকম, সব দলই আমাকে আর দলীয়করণ করার কথা ভাবতো না। যেদল ঘনিষ্ঠ হতে চাইতো, সঙ্গে সঙ্গে তাদের নেগেটিভ দিক তুলে কিছু বললেই তারা সরে পড়তো।
 
 
এমনই দিন চলছিল। একদিকে মিকিদি আর দিদি আর অন্যদিকে আমি ও আমার অস্থিরতা। ওরা কিন্তু স্থির বিশ্বাসী, বরং বলা ভাল প্রবল আফিম বিশ্বাসী। ওদের পথচলা, বিশ্বাসে মিলায় বস্তু তর্কে বহুদূর এর পথে। কিন্তু ও পথ আমি ছেড়েছি অনেক ছোটবেলায়। খুব মন দিয়েই পড়েছি, এখনও পড়ি, বিশেষ করে কথামৃত আর বিবেকানন্দের লেখাগুলো। ঝরঝরে ভাষা আর গল্পের মায়াজাল। মায়াজালে মায়ার শরীর গড়া।
 
এসব বললে মিকিদি হাসে আর দিদি খুব রেগে যায়। বলে তোর বক্তৃতা মাঠে গিয়ে দে, একটা মানুষ তো দূরের কথা, একটা পশু পাখিও ঘুষ ছাড়া তোর কথা শুনবে না। একটা কোথাও ছাপা না দেখি, পৃথিবী ব্যাপী নামডাক হোক, ইয়াং জেনারেশন একডাকে যেন শুভকুমারের নাম চেনে। তা না যত তা না না ধেই ধেই আমাদের সঙ্গে।
 
হুম, চুপ যাও শুভকুমার, এখন বাজার বেজায় গরম।
 
 
একটা সময় আমার অস্থিরতা এতটা বেড়েছিল, মিকিদিও অবাক হয়ে গিয়েছিল। আশপাশের কোন বাড়ি পুজো হলে যাওয়া তো দূর অস্ত, প্রসাদটাও মুখে দিতাম না। দিদি খুব রেগে যেত, ঠাম্মি দুঃখ পেত আর মিকিদি কিছুতেই বুঝতে দিত না, ওর মনে কি আছে। খুব দরদ দিয়ে বলত, আচ্ছা, ঠিক আছে, মন চাইছে না খেয়ো না, কোন সকালে হয়তো ফল কাটা, তোমাকে ঘরের জিনিস দিচ্ছি খাও। এই সময় ওকে একটু গম্ভীর গম্ভীর লাগত। দিদি মিকিদিকে বকতো, বলতো তোর জন্যে ওর এসব বাতিক। মিকিদি হেসে বলতো, ও উপাদি, বাতিক যখন কাটতে ক’দিন? 
 
মাননীয়া উপাসনাদি তবে একটু থামতেন।
 
রাজনৈতিক দলগুলোর কর্মকাণ্ড নিয়ে সবচেয়ে বড় ধাক্কাটা খেলাম মিকিদির মামার বাড়ি গিয়ে, ওরাও আমাদের আত্মীয়। তখন ঘোর বর্ষাকাল, জোরকদমে জমি রোয়া চলছে।
 
 
আমরা যেদিন গেছি, বিলকুল সব পিসফুল, খেলাটা রাতে হল। এ পার্টির লোকেরা নাকি বি পার্টির লোককে নিকেশ করেছে। ব্যক্তিটি আদিবাসী। মামাদের এখানে পঞ্চায়েত থেকে এম পি সব বি পার্টির। এ পার্টিকে আরও কোনঠাসা করার জন্যেই বি পার্টি আদাজল খেয়ে লাগল। প্রশাসন পকেটে পুরে বি পার্টি চলল এ পার্টির কর্মী নেতাদের বাড়ি ভাঙচুরে। হাতে হাতে আধুনিক অস্ত্র, বোমা। ভুলেই গেছে তারা শরিকদল।
 
সারাটাদিন একে বৃষ্টি, তার উপর গণ্ডগোল চলছে তো চলছেই, শেষ আর নেই, এত হিংসা, এত খুনে মানসিকতা, চোলাই মদে চুর একদল উন্মত্ত মানুষ, মানুষ তো? এসব দলদাস, পার্টিজান, পার্টির কথাই শেষকথা। নেতারা নিরাপদ দূরত্বে, দু’চার দিন পর নিশ্চয়ই শান্তি মিছিলে হাঁটবে, যার গেল তার গেল।
 নিশ্চয়ই শহীদ বেদি হবে, নিজেরাই আবার ভুলে যাবে বেদিতে মালা দিতে। এ যেন জমিদারি প্রথা অন্যভাবে ফিরে এল। এর জমিদারি পছন্দ না হলে ওর জমিদারিতে চলে যাও, কিন্তু কাজ তোমার একটাই, ক্ষমতা ধরে রাখতে আধুনিক লেঠেল হও। জমিদারের সাত গুষ্টির, ইস্কুল কলেজে ৩৮ পেলে ৮৩ করে মার্কশীট বেরবে, চাকরি বাকরিও সব তাদের, তোরা বংশ পরস্পরায় লেঠেল হ, ওরা কত পিঠ চাপড়ানি দেবে, আর ডায়ালগ বাজি চলবে। কত কাঁদুনি!
 
মামাদের ভিটের একদিকে লোকজন জড়ো হতে শুরু করল। পরপর বোম চার্জও করতে লাগল। কি ধোঁয়া আর আওয়াজ। হাল্লা চলেছে যুদ্ধে…
হল্লা শুরু হল, উন্মত্ত উল্লাস, বি পার্টির কিছু লোকজন আগে থেকেই মামাদের বাড়ি আশ্রয় নিয়েছিল, কিন্তু তারা আর সংখ্যায় ক’জন? শুভকুমার, এবার প্রাণ নিয়ে ঘরে ফেরো কি করে দেখি! মিকিদির মুখ শুকনো। এমন উটকো গণ্ডগোলে পড়লে কার মুখে আর হাসি থাকে? মামীমা তেতো হাসি হেসে বলছে, কোন ভয় নেই রে, ওরা এর বেশি এগোবে না, বলতে বলতেই একটা গুলি এসে লাগলো গোয়ালে, গরুগুলো তারস্বরে চিৎকার করে উঠলো, বলতে চাইছে যেন, ছোঃ, তোরা আবার মানুষ, গরুরও অধম!
 
 
পরপর পেটো ফাটতে লাগলো, বাতাসে বারুদের গন্ধ, ভাবছিলাম, শুখোর সময় হলে কি হতো! গ্রাম কে গ্রাম আগুন জ্বলত, বর্গিরাও কি এত নিষ্ঠুর ছিল? মানুষ হয়ে মানুষের এত ক্ষতি করতে পারে? মেয়েরাও এর শিকার হয়, এই অরাজকতা চলছে তো চলছে। অত্যাচারীর মুখ বদল হল শুধু। 
প্রশাসন বলে তখনও কিছু ছিল না, এখনও নেই। নেই রাজ্যের নৈরাজ্য চলছে চলবে। এখানে স্কুল হলে মাষ্টার মেলে না, হাসপাতাল হলে ডাক্তার। সামান্য ব্যাপার নিয়ে ঝগড়া ঝাঁটি, খিস্তি খেউড়, মারপিট লেগেই আছে। যার আছে, সে শহরে আরও একটা আস্তানা গেড়ে রেখেছে, নিজেদের স্বার্থের জন্যে দলকেও কিনে ফেলেছে, এরা এতটাই ক্ষমতাশালী।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *