ঝড় — ৯ম পর্ব —- বন্য মাধব

ঝড় --- ৯ম পর্ব   ----   বন্য  মাধব

জল জঙ্গলে বাস আমাদের। ডাঙায় বাঘ আর জলে কুমীর। সাপ আর কামটও বলা যায়। বলা যায় পুলিশ আর জল ডাকাত। আর এখন পার্টি ভার্সাস পার্টি।
 
 
এ কথাটা সবচেয়ে বেশি জানে বাদা অঞ্চলের নদীগুলো। মাতলা তার যৌবন হারিয়েছে, কিন্তু তার বুকে থাকা কামোট কুমীররা আজও টাটকা মনুষ্য মাংসের লোভে বসে থাকে। সেটা  পেলেই তাদের মোচ্ছব শুরু হয়। 
 
 
জোয়ারে বৃদ্ধা মাতলা ফুলছে। তার সুসময় হলে কাঁপন ধরাতো পাড়বাসীদের। তবুও নদীবাসী মানুষ এখনও তাকে সমীহ করে, পূজো দেয় ভক্তিভরে। শুধু বিশেষ গণ আর তিথি এলে মাতলা পাগলিনী হয়ে ওঠে, সঙ্গে যদি নিম্নচাপ আর ঝোড়ো বাতাসকে পায় তখন তাকে দেখে কে! পুরানো মানুষজন জেগে ওঠে, কত গল্পকথা তিল থেকে ভুঁই কুমড়ো হয়! কিন্তু তাতেও নদীর উপর মানুষ আক্রোশী হয় না, কারণ তারা জানে নদী শুধু ধ্বংস করে না, গড়েও।
 
 
নতুন চর জাগে, মায়াবী ডাক তোলে, ভিটেমাটি হারানো মানুষ তার বুকে আশ্রয় নেয়, সংসার পাতে। বংশ পরম্পরা বজায় থাকে। নদী যেন জাপ্টে থাকে, কোনমতেই তাকে ছাড়ানো যায় না।
 
 
একথাটা বনের ক্ষেত্রেও সমান খাটে। বনও নদীর মত মায়াবী, তার টানও কম কিছু নয়। যারা বনবিবিকে, দক্ষিণ রায়কে ভয়ে আর ভক্তিতে পুজো দেয়, অষ্টপ্রহর তাদের শরণ নেয়, সেইসব মধু ভাঙা লোক, মাছমারা লোক, লাল লাল ডিম ভর্তি ইয়া বড় বড় কাঁকড়ামারা লোক, গরাণখোপা, গোলপাতা কাটা লোক তারাই জানে বনের টান কি বিষম বস্তু!
 
 
এ অঞ্চলে বাঘে মারা লোক নেহাৎ কম নেই। বাঘের মুখ থেকে ক্ষত বিক্ষত শরীর নিয়ে বেঁচে ফেরা লোকও কম নেই। বাঘের দেখা আর সাপের লেখা এ এলাকার চাক্ষুস করা লোকও কম নেই। সুধন্যকাকার কথা ধরা যাক। বনে মাছ কাঁকড়া ধরার পারমিট ছিল কাকার। ফি বছর দল বেঁধে বনে যেত কাকারা।
 
 
সেবারও গিয়েছিল। বিপত্তিটা শেষের দিকে ঘটে গেল। সরু খাঁড়িতে ভাঁটির সময় আড়াআড়ি জাল পেতে নৌকাতে ফেরার সময় তিনি দেখা দিলেন একেবারে ঘাড়ের ওপর থাবা চালিয়ে। তারপর যমে মানুষে টানাটানিতে অচৈতন্য, অর্ধমৃত সুধন্যকাকাকে ফেলে যম পালাল।
 
 
গোসাবা হাসপাতাল, ক্যানিং হাসপাতাল হয়ে এন আর এস। পাক্কা একমাস পরে খাটিয়া চেপে কাকা ফিরে এল। এসব ক্ষেত্রে যা হয়, দূরদূরান্ত থেকে লোক ভেঙে পড়ল। একদিন, দুদিন, তিনদিন…..  চলতেই থাকল, চলতেই থাকল। গল্পকথা বড় হতে হতে গাছে উঠতে লাগল।
শতকাকা, মনুমামা, জগা, মাদাই সব পুরনো পাপীদের গল্পগুলো ভুস ভুস করে ভেসে উঠল।
 
 
পুলিস এল, বনদপ্তর এল। কাকার পারমিট থাকায় কোন অসুবিধা হল না, নামমাত্র সরকারি সাহায্যও মিলল। একটা মানুষ সারাজীবনের মত পঙ্গু হয়ে গেল। একমাত্র উপায়ীলোক হলে সংসার হুমড়ি খেত। 
 
 
আর সাপ? বাপরে বাপ। বাঘের চেয়ে তিনি কোন অংশে কম যান না। সুযোগ আর সুবিধা মত তার মরণ কামড়! মানুষের কাছাকাছি থাকতে তিনি খুবই পছন্দ করেন। বাস্তুতে থাকলে তার একটা সুবিধাও মেলে, সুযোগ পেলেও সহজে মানুষ তাকে মারে না। মা মনসার জীব যে! ফলে পুজো মেলে, তার চলাফেরার পথে কেউ বাধা দেয় না। মানুষ আর তার মধ্যে একটা অলিখিত চুক্তি থাকে। সেই চুক্তি কোন পক্ষ ভাঙলেই অঘটন অনিবার্য।
 
 
এ অঞ্চলের মানুষের কাছে তাই বনবিবির আর মনসার ভাসান পালার এত খ্যাতি। কীর্তনের প্রসারের বহু আগেই এই দুই পালা গান এই বাদা অঞ্চলের লোকের হাড়ে মজ্জায়। জীবন আর জীবিকার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এ পালা গান। হেন পাড়া নেই যেখানে বনবিবি বা মনসার পুজো এবং পালা গান হয় না। সরল বিশ্বাসী মানুষ কঠোর জীবন সংগ্রামকে নমনীয় ও কমনীয় করে তোলে এইসব পালাগানে।
 
 
আহা, পালা গান! সুরোদির মনসা ভাসান গান লোকের মুখে মুখে ঘোরে। এমন একটা উৎসবও ধীরে ধীরে অন্য উৎসবের মত অসৎ পয়সাওলা মানুষের ট্যাঁকে গোঁজা পড়ল, বিশেষকরে সুদখোরদের ট্যাঁকে। ভুক্তভুগী মানুষ এসব থেকে সরে আসতে থাকল। বিশ্বাসী মানুষের বিশ্বাসে চিড় ধরতে লাগল। চাঁদা তুলে করা বারোয়ারি উৎসবও সে চিড় ঠেকাতে পারল না।
 
 
তাও যাহোক করেই চলছিল কিন্তু শোষণ মানুষকে, তার বিশ্বাসকে টলিয়ে দিল, সব কিছুকে সে যুক্তি দিয়ে ধরতে চেষ্টা করল। মানুষের মনের রঙে লাল রঙ মিশতে শুরু করল। বিশ্বাসে মিলায় বস্তুকে সে গৌণ জায়গায় ঠেলতে লাগল। সেখানেও বর্জিত মানুষ ঘুসঘুস করতে করতে ঢুকে পড়ল, অ্যাং ব্যাং চ্যাং বোঝাতে লাগল, তার ফল আজ আমরা যেটা দেখছি, লালে লালে মহারণ!
 
 
আর প্রাণ যাচ্ছে সেই সাধারণের, সরল বিশ্বাসীর। এই যে কেসে আমাদের ধরা হল, সেওতো লালে বিশ্বাসী সাধারণ একজন আর যাদের হাতে তার প্রাণ গেল তারাও লালে বিশ্বাসী। আর যাদের ধরা হল গায়ের ঝাল মেটাতে আর প্রমোশনের লোভে বা চাকুরী বাঁচাতে, তারাও লাল। আর যারা দোষী এবং এক্কেবারে ঠিক সময়ে পলাতক, তারাও লাল।
 
 
আর যারা খেলাচ্ছে তারাও লাল। লাল সূর্য্যের শুধু খোঁজ মিলল না, শুধুই  ঝরে চলেছে লাল টকটকে রক্ত! এই খোঁজেরও শেষ নেই, এই রক্ত ঝরারও শেষ নেই। শ্রেণীহীন, শোষণহীন সমাজ কবে যে ধরা দেবে, আদৌ তাকে ধরা যাবে তো! এতো বিভাজনের, এত বিভেদের পাঁচিল টপকানো যাবে তো? তার আগেই তো দেখছি এ পার্টির আর বি পার্টির গোড়ার দিকের কারিগররা থম মেরে গেছে, কেউ কেউ একেবারেই বসে গিয়েছে। এই যেন তেন প্রকারে ক্ষমতায় থাকা, থাকতে চাওয়া পার্টির জন্যে তারা জান প্রাণ দিয়ে লড়ে নি। এ পার্টি আম জনতার বুকের ধুকপুকানি বোঝে না, তার দামও দেয় না।
 
 
 
রামকাকুর মধ্যেও এই হতাশা লক্ষ্য করেছি, বাবার মধ্যেও। যেন তেন প্রকারে ভোটে জেতাটাই বিপ্লব। বিরোধীদের নিকেশ কর, না পারলে একঘরে করে রাখ, বর্গীদের মত লুঠপাট চালাও, পদে পদে হেনস্থা কর, পুকুরে বিষ ঢালো, সদ্য রোয়া ধানক্ষেত তছনছ করে দাও, পাকা ধান ঘরে তুলতে দিও না, দোকান, বাড়ি ভাঙচুর কর। গবাদি পশু, হাঁস মুরগী, ধানের গোলা লুঠে নাও, দরকার হলে আগুন লাগাও, এলাকা ছাড়া কর, মেয়ে বউদের টানাটানি কর। শেষ অস্ত্র বডি নামাও নদীতে।
 
 
লঞ্চে একটা হাঁকডাক শুরু হল। এবার ঘাটে ভিড়বে লঞ্চ। বন্দুকধারীরা রেডি হচ্ছে। এখনও রাত। ভরা জোয়ারে নৌকো একেবারে শুকনো জেটিতে। আমরা পরপর নামতে লাগলাম, মোটমাট চোদ্দজন। আগে, মাঝে আর শেষে ভুঁড়িওয়ালা তিন বন্দুকধারী। তাদের চেহারা তেলে জলে বেশ থাকার কথা জানান দিচ্ছে। এ আমলে বেশ বাবু বাবু একটা ক্লাস তৈরি হয়েছে এদের দেখে বেশ বোঝা যায়। 
 
 
বেশ একটু নরম স্বরে তারা বলল, আর একটু পরেই আমরা ক্যানিং থানায় পৌঁছে যাব, ওখানে আপনাদের চা টার ব্যবস্থা আছে। আরো কি সব বলল।
 
 
মিনিট পাঁচেক হাঁটার পর থানা এসে গেল, লক আপে আমাদের জায়গা হল। আমরা হাত বদল হলাম আরকি! অখাদ্য লাল চা আর একটা ঘুঁটে বিস্কুটে ধড়ে প্রাণ এল যেন। চাওয়ালাই জানিয়ে গেল ৯টার মধ্যে  খিচুড়ি খাওয়াবে আর তারপর সদরে চালান দেবে। অর্থাৎ আলিপুর ক্রিমিনাল কোর্টে আজ তোলা হবে এবং যেহেতু আমরা খুনের কেসের আসামী অতএব জামিনও হবে না। 
 
 
টিভিতে বড় বড় করে খবর হবে। নেতা, পুলিশ সবার ভাষণ শোনা যাবে। চোখে মুখে আত্মসন্তুষ্টি ঝরে পড়বে। কেউ টুঁ শব্দও করবে না এফ আই আরে যাদের নাম আছে তাদের একজনও কেন গ্রেফতার হল না! ব্যাপারটা সেই বাঘ আর ছাগল ছানার গল্পের মত। তুই দোষ করিস নি তো কি হয়েছে তোর বাপ করেছিল। সুতরাং উদোর পিন্ডি বুধোর ঘাড়ে অনায়াসে চাপানো যায়! এবং গেলও। শিকার তুমি রাজশক্তির বিরুদ্ধে লড় দেখি কেমন পার! রাজশক্তি তোমার বাপ কাকাদের আর মোছার প্রয়োজন বোধ করে না। ভাত ছড়ালে নাকি কাকের অভাব হয় না। তা বটে!

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *