টান // শুভ্র ঘোষ

টান   //  শুভ্র  ঘোষ
হটাৎ একটা শব্দে আচমকা ঘুম ভেঙ্গে গেল।মোবাইলে দেখলাম, সময় তিনটের আশে পাশে। অন্ধকার ঘরে বুঝতে পারলাম, কেউ ঘরে ঢুকেছে। কিন্তু দরজা তো বন্ধ ছিল। কম্পিত কন্ঠে প্রশ্ন করলাম , ‘কে?’
 
কিছুক্ষনের নিস্তদ্ধতা কাটিয়ে একটা ক্ষীণ কন্ঠস্বর শুনতে পেলাম মনে হল কেউ কিছু বলছে। আবার শোনার চেষ্টা করতেই শুনতে পেলাম, ‘কি রে একদিনও তো কাটল না। এর মধ্যেই এত অচেনা হয়ে গেলাম?’
 
অদ্ভূদভাবে কন্ঠস্বরে নারী পুরুষ বিভেদ করা না গেলেও বুঝতে পারলাম , দিদা এসেছে। দিদার চোখের দিকে তাকালাম।দিদার চোখ দেখা যাচ্ছে না।তবে দিদার সাথে কথা বলতে, আলাদা ভাবে সাহসের প্রয়োজন হয়নি। অদ্ভূদ সেই পরিস্থিতিতেই জিজ্ঞেস করলাম, ‘কখন এলে…’ । উত্তর দিল , ‘ তুই যখন ঘুমাচ্ছিলি’।
 
-‘ওঃ,তা ডাকলেই তো পারতে’।
 
-‘অনেকক্ষণ থেকেই ডাকছি।শুনতে পাসনি। খালি এপাশ ওপাশ করছিলি’।
 
-‘না তেমন কিছুনা, একটু ক্লান্ত ছিলাম’।
 
ঘরের চারপাশটা একবার ঘুরে দেখে নিয়ে দিদা আবার ঘরের এক কোনে গিয়ে দাঁড়াল। কিছুক্ষন পর বলল, ‘হ্যাঁ রে তোর ঘর এত নোংরা কেন?’
 
 -‘আমিতো এমনি ছিলাম, আমার ঘরও’।
 
-‘থাক সেসব কথা, দাড়ি কামাসনি কেন আমার যাওয়ার আগে?’
 
-‘ সময় পেয়েছিলাম বল?তোমায় নিয়েই তো পরেছিলাম’।
 
-‘দেবদাস সাজার শখ, আমি সব বুঝি। তোকে একদম মানাচ্ছে না’।
 
-‘ তুমি অনেক মডার্ন হয়ে গেছো। হটাৎ করে, কয়েক ঘন্টার মধ্যেই…’
 
-‘একা থাকলে হয়তো সবাই হয়। এখানে সব পরিষ্কার, স্বচ্ছ।কোনো আবেগ নেই, ভেদাভেদ নেই…’
 
-‘ কিছু খাবে?’
 
-‘আমাকে, খাবার কথা বলছিস!’
 
-‘ তাই তো! খেয়াল ছিল না’।
 
-‘কয়েকদিন ধরেই দেখছি, তোর অনেক কিছুই মনে থাকে না’।
 
কিছুক্ষন দুজনেই চুপ করে রইলাম।বিছানা ছেড়ে উঠে গেলাম বারান্দায়। সুর্যটা উঠব উঠব করছে।
 
-‘শোন, ঘরটা গোছাস। বিরক্ত লাগছে। তোর এমন দেবদাস মার্কা চেহারা দেখে নিজেকে অপরাধী মনে হচ্ছে।’
 
-‘ কেন এলে তুমি?’
 
-‘কেন?না এলে খুশি হতিস বুঝি…’
 
-‘ হয়ত… ঠিক জানি না…’
 
-‘ আচ্ছা শোন যা বলতে ফিরে আসা। তোর জামাইবাবু  আমার ব্যবহারের সবকিছুই প্রায় গঙ্গায় ভাসিয়েছিল।শুধু চশমাটা ওর পকেটে থেকে গেছে। বোধহয় কিছু স্মৃতি রেখে দিতে চেয়েছিল। 
ওকে বলিস চশমার খাপটা রেখে দিয়ে চশমাটা যেন গঙ্গায় ভাসিয়ে দেয়’। 
 
-‘ তুমি চশমা নিয়ে কি করবে? ওখানেও লাগে নাকি?’
 
– ‘ওরে না না। বুঝিস না, এত দিনের অভ্যাস। তাই এখানে এসে চোখটা কেমন খালি খালি লাগছে।তাই বললাম।যাকগে সময় হয়ে গেছে ,ফিরতে হবে।এই জগতে আবার নিয়ম আছে আলো ফোটার আগেই ফিরতে হবে।ভালো থাকিস।পরে দেখা হতে পারে…’
 
এরপর আবার সব চুপচাপ।নতুন সূর্য্যের আলোয় দেখলাম, সময় কাটা ঘড়িতে চারের ঘরে প্রবেশ করছে।
 
নিজের অজান্তেই একটা দীর্ঘশ্বাস বেড়িয়ে এল। বারান্দা দিয়ে বাইরে তাকালাম। আস্তে আস্তে দুনিয়াটা আঁধার থেকে আলোয় ফিরছে।সব অন্ধকার ফিকে হয়ে যাচ্ছে। পাখিরাও সব নেমে এসেছে তাদের বাসা থেকে।
 
চশমাটি গঙ্গায় ভাসিয়ে এসে গাড়িতে বসলাম। জানলা দিয়ে আরেকবার তাকিয়ে দেখলাম। চশমাটা ভাসতে দেখা যাচ্ছে। এইতো কয়েকটা মাস আগের কথা,দিদা একা থাকতে চাইতো না কখনও, ভয় পেতো। এখন আর ভয় পায় না দিদা । সত্যি, বদলে গেছে অনেক।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *