তৈমুর খান

আত্মসমালোচনা

    তৈমুর খান

 অনেক সময়ই যুক্তিও সংকুচিত হয়ে যায় কুযুক্তির চাপে। মানুষ আশ্চর্য এক জটিল প্রাণী। সর্বদা প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করাই তার উদ্দেশ্য। নিজেকে নেতা হিসেবে প্রতিপন্ন করা এবং যেকোনো সৎ বিষয়কে উল্লঙ্ঘন বা অস্বীকার করা তার একটা কর্তব্যের মধ্যেই পড়ে। তাই যেনতেন প্রকারে যুক্তির বিরুদ্ধে কুযুক্তি প্রয়োগ করে।

    লোকে কথায় কথায় বলে ‘আইন আছে, আইনের ফাঁকও আছে।’ এই ফাঁক বা ছিদ্রান্বেষণ একটি আদিম নেশা বলা চলে। এই নেশা থেকে বহু মানুষই বের হতে পারেন না।

     পৃথিবীতে সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ মানুষের বৈশিষ্ট্য কী এ প্রশ্ন আমাদের কাছে আসতে পারে।

        অনেকগুলো বৈশিষ্ট্যের মধ্যে বহু মনীষীর উত্তর বিশ্লেষণ করে একটি উত্তরকেই আমি বেশি গ্রহণযোগ্য মনে করেছি। আর তা হল, যে মানুষ আত্মসমালোচক, তিনিই পৃথিবীর মধ্যে শ্রেষ্ঠ মানুষের পর্যায়ভুক্ত। ভারতীয় শিক্ষাবিদ, লেখক, পণ্ডিত এবং মনোবিজ্ঞানী অমিত আব্রাহাম(জন্ম: ৮ সেপ্টেম্বর, ১৯৬৫) আফ্রিকার রুয়ান্ডা, কিগালি, রুয়ান্ডার মাউন্ট জিওন আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয়ে উপ-উপাচার্য বলেছেন:

“The best criticism is self criticism – its constructive and helps you improvise”. অর্থাৎ সেরা সমালোচনা হল আত্মসমালোচনা—এটি গঠনমূলক এবং আপনার উন্নতি করতে সাহায্য করবে। 

   কিন্তু আমরা ক’জন আত্মসমালোচনা করতে পারি? অপরের দোষ-ত্রুটি খুঁজতেই আমরা ব্যস্ত থাকি, নিজেদের দোষ-ত্রুটি বিচার করার সময় আমাদের নেই। কবি নজরুল বলেছেন:

 “নিজের পাপের বাটখারা দিয়ে অন্যের পাপ মাপি”।

 আমরা কি চেষ্টা করলে পারবো না নিজেদের সমালোচনা করতে?

  ছাত্রজীবনে একবার দেখা হয়েছিল সাহিত্যিক সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় সঙ্গে। তাঁকে জিজ্ঞেস করেছিলাম: কবি হওয়ার প্রথম শর্ত কী?

 তিনি যেসব প্রশ্ন করেছিলেন এবং আমি যেসব উত্তর দিয়েছিলাম তা নিম্নরূপ:

—প্রেম করেছ?

—হ্যাঁ করেছি।

—এখনও প্রেম আছে না চলে গেছে?

—চলে গেছে, অর্থাৎ আমি ব্যর্থ হয়েছি।

—তাহলে তুমি প্রথম শর্তে এগিয়ে গেছো।

—দ্বিতীয় শর্ত কী?

—কার কার কবিতা পড়ো?

—শক্তি, সুনীল, জয়, আল মাহমুদ, শঙ্খ, শামসুর প্রমুখ আরও বহু।

—পারলে ইয়েটস, এলিয়ট, কামু, র্র‍্যাঁবো, হুইটম্যান পড়ে নিও।

—তৃতীয় শর্ত কী?

—কবিতা লিখে কতবার ছিঁড়ে ফেলেছো?

—একবারও পারিনি।

—এখানেই হেরে গেছো। লেখার মায়া ত্যাগ করে বারবার ছিঁড়ে ফেলো। আবার নতুন করে লেখো। আবার ছিঁড়ে ফেলো। এই প্রক্রিয়া চলতেই থাকবে। নিজের লেখা নিজেই বারবার সমালোচনা করো। তারপর, অনেক পর কবিতা ছাপতে দাও। দ্রুত লিখে লিখে প্রকাশ করার চেষ্টা করো না তাতে কল্যাণ নেই।

       কবিতা সম্পর্কে এবং নিজের আত্মবিশ্বাস সম্পর্কে সেইদিনই আমার প্রথম পদক্ষেপ শুরু হয়েছিল। তিনি ঠিক বলেছিলেন কিনা তা আজ হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছি। বুঝতে পারছি প্রতিটি শিল্পর ক্ষেত্রেই আত্মসমালোচনা সাধনার প্রথম পদক্ষেপ। এখন মার্টিন লুথার কিংয়ের কথাটি বারবার মনে পড়ে:

“It is not a sign of weakness, but a sign of high maturity, to rise to the level of self-criticism.”

 অর্থাৎ আত্ম-সমালোচনার স্তরে ওঠা দুর্বলতার লক্ষণ নয়, বরং উচ্চ পরিপক্কতার লক্ষণ। আমরা একগুঁয়েমি অথবা অহংকারের কারণে এই আত্মসমালোচনার পর্বটি কি এড়িয়ে যাচ্ছি না? 

#তৈমুর_খান

#storyandarticlepage

https://sahityashruti.quora.com/

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *