নতুন রহস্য ধারাবাহিক // শেষ নেই যার // সুব্রত মজুমদার // পর্ব – ৪

শেষ নেই যার // সুব্রত মজুমদার // পর্ব - ৪
এইরকম স্বপ্ন বারবার দেখতে থাকলাম,কাজকর্মও চুলোয় উঠেছে। রাত্রে দুঃস্বপ্ন আর সারাদিন কিসের একটা ছায়া আমাকে তাড়া করে বেড়ায়। এদিকে আবার নতুন একটা সমস্যার আবির্ভাব ঘটেছে, – টম কেনেডি। টম আমেরিকার এয়ারফোর্সের অফিসার। এখানে বেড়াতে এসেছে। ওরকম গায়েপড়া লোক আমি এ জীবনে আর দুটি দেখিনি। বিরক্ত হলেও টমকে সে কথা বুঝতে দিই না।
 
একদিন টম আর আমি দু’জনে আমার ঘরে বসে বসে গল্প করছি, হঠাৎ টমের নজর গিয়ে পড়ল ড্রাগনটার উপর। টম ড্রাগনটাকে নিয়ে নাড়াচাড়া করতে লাগল, আর অভিভূত হয়ে বলে উঠল, “ওহ্ মাই ঘড্ ! সো বিউটিফুল !”   
 
আমারও মাথায় বিদ্যুৎ খেলে গেল, যে করেই হোক এই অপয়া ড্রাগনটাকে দূর করতে হবে। আর এটাই সূবর্ণ সূযোগ । আমি বললাম, “এটা তিব্বতি জিনিস সাহেব। তুমি ইচ্ছা করলে নিয়ে যেতে পারো। এটাকে বন্ধুর দেওয়া ক্ষুদ্র উপহার মনে করো।”   টমও খুব খুশি। উপহারটা নিয়ে তার যে আনন্দ তা বলে বর্ণনা করা যাবে না। ‘
 
                      এই পর্যন্ত পড়েই ডায়েরিটা বন্ধ রাখতে হলো। কারণ নিদ্রাদেবী তার ঘুমের কাঠি বুলিয়ে আমাকে নিয়ে চলেছেন ঘুমের দেশে। সেখানে চাঁদের বুড়ি একরাশ পেঁজাতুলোর মতো মেঘ নিয়ে চরকা কাটছে। সাদা মিহি সূতো ছড়িয়ে পড়ছে দিকে দিগন্তরে। আমার চিন্তা ভাবনা আর অনুভূতিগুলো সেই সূতোতে বাঁধা পড়ে ঘুড়ির মতো উড়ে চলেছে রুপকথার রাজ্যে, যেখানে তান্ত্রিক মোহাবেশ খড়্গ নিয়ে বসে আছে গ্রামবাংলার কোনও অখ্যাত গ্রামের প্রৌঢ় ব্রাহ্মণকে বলি দেবার জন্য। জলের অতলে মন্দির হতে ঢাকের আওয়াজ ভেসে আসছে। কোলাহলে ভরে গেছে চারিদিক। সবাই যেন বলছে, “রক্ত চাই, রক্ত চাই…. তাজা নররক্ত…..”
 
মন্দিরের গর্ভগৃহের প্রবেশের মুখে একটা গুহা, গুহার দেওয়ালে সারি সারি জ্বলছে  রক্তশীতল করে দেওয়া চোখ। কোথা হতে যেন ভেসে আসছে হিংস্র শ্বাপদের ডাক। হঠাৎ একটা ভূমিকম্প অনুভূত হল, থরথর করে কেঁপে উঠল চারপাশ। গুহার দেওয়াল হতে খসে পড়ছে ছোটো বড়ো পাথরের চাঁই। একটা তো আমার নাক ঘেঁষে পড়ল। নাকের যন্ত্রণায় আর্তনাদ করে উঠলাম। সহসা ঘুম গেল ভেঙ্গে।
ঘুম ভেঙ্গে দেখলাম পাথরের চাঁই নয়, আমার নাকে পড়েছে অঘোরবাবুর বিরাশি শিক্কার একটা ঘু়ষো।  অঘোরবাবু শুয়ে শুয়েই চোখ বন্ধ অবস্থায় কিল ঘুষি চালাচ্ছেন আর চিৎকার করছেন।
 
“ছাড়েঙ্গা নেহি ! মার দেঙ্গে ! অঘোরনাথ বাঁড়ুজ্জের সাথে চালাকি ! লড়াই… লড়াই….”
 
গত্যান্তর না দেখে টেবিল হতে জলের জাগটা নিয়ে অঘোরবাবুর মুখে চোখে জলের ঝাপটা দিতে থাকলাম। অঘোরবাবু চোখ মেললেন। তারপর আমার দিকে কিছুক্ষণ ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থেকে বলে উঠলেন,” মারের বদলা মার। আচ্ছা পিটিয়েছি মৃগাঙ্ক সেনকে। ব্যাটা বলে কিনা আমি ভীরু, আমি কাপুরুষ ! আমার নাকি মশাই মেয়ে জোটেনি। অঘোরনাথের মেয়ে জোটেনি ! ওসব খাঁদি-পেঁচিগুলোকে আমিই পছন্দ করিনি মশাই।”  অঘোরবাবু উঠে বসে বাঁ হাত দিয়ে বাঁ জাঙ্ঘে থাপ্পর মারলেন।
 
এদিকে হইচই শুনে কখন যে বিক্রম এসে হাজির হয়েছে খেয়াল করিনি। দেখলাম বিক্রম দরজার পাশে দাঁড়িয়ে মুখ চেপে হাসছে।  হাসতে হাসতে বিক্রম খাটের দিকে এগিয়ে এল। অঘোরবাবু এখনো ঠিক প্রকৃতিস্থ নন, তিনি মৃগাঙ্ক সেনকে গালমন্দ করেই চলেছেন। বিক্রম খাটে এস বসল, তারপর বলল, “অঘোরবাবুর বয়স হয়েছে, অতগুলো পরোটা কি সহ্য হয় ! উনাকে গ্যাসের ওষুধ দাও সায়ক।”
 
বিক্রমের কথায় অঘোরবাবু বাস্তবে ফিরে এলেন বটে কিন্তু তার চিৎকার চেঁচামেচি কমলো না। তিনি বিক্রমের উপর খাপ্পা হয়ে বললেন, “ওরকম পেট আমার নয় মশাই, এ বয়সেও কিলো দু’য়েক মাটন সাবড়ে দিতে পারি। পারবেন আমার সঙ্গে বাজি রেখে লুচি খেতে ? আপনার মতোই ভুল করেছিলেন আমার কলিগের শাশুড়ি।”
 
উৎসাহিত হয়ে শুধোলাম, “কি হয়েছিল তাঁর ? আপনার সঙ্গে খাওয়ার প্রতিযোগিতায় নেমেছিলেন বুঝি ?
অঘোরবাবু একটা বীরত্বসূচক হাবভাব দেখিয়ে বললেন, “আরে না, আমাকে পেটভরে লুচি আর কষা মাংস খাওয়াবার ইচ্ছা হয়েছিল তাঁর। উনি গরম গরম লুচি ভাজেন আর আর আমি খাই। একসময় উনি সবিনয়ে আমাকে উঠে যেতে বললেন। আটার স্টক খতম মশাই।”
 
এতটা গুল আমি হজম করে নীলেও বিক্রমের দম আটকে যাওয়ার অবস্থা হল। অনেক কষ্টে নিজেকে সামলে নিয়ে বিক্রম বলল,” তা তো হলো, কিন্তু ঘুমের মধ্যে কার সাথে লড়াই করছিলেন বলুন তো। “
 
অঘোরবাবু জানালেন যে স্বপ্নে তিনি সেই মন্দিরে গিয়েছিলেন, আর সেখানেই মৃগাঙ্ক সেনের সঙ্গে অঘোরবাবুর বচসা হয়। দুজনের বেশ একপ্রস্থ মারপিট হয়। তারপর রেগে গিয়ে বললেন, “সায়ক মাঝখানে না এলে দেখেনিতাম মশাই। মুখে চোখে জল ঢেলে  অতবড় সূযোগটার পিণ্ডি চটকে দিলো মশাই। আর একটু সময় পেলে মৃগাঙ্ক সেনের বারোটা বাজিয়ে ছাড়তাম।”
 
আমিও আমার স্বপ্নের কথা বিক্রমকে বললাম। বিক্রম কিছু না বলে ঘর হতে বেরিয়ে গেল। ফিরলো মিনিট পাঁচেক পর। ডিসপোজাল সিরিঞ্জ  তুলো ইত্যাদি নিয়ে টেবিলে রাখল। বলল,” রক্তের নমুনাটা নিয়ে রাখি। কি জানি আমার মনে একটা খটকা লাগছে। “
 
রক্তের নমুনা নেবার পর ড্রাগনটিকেও ঘর হতে নিয়ে গেল। আমি জানতে চাইলে বলল, “তোমাদের নির্বিঘ্নে যাতে ঘুম হয় তার ব্যবস্থা করলাম। এটাকে আপাতত স্টোররুমের আলমারিতে রেখে দেব।”  বিক্রম চলে যেতেই আমরা আবার ঘুমোবার উদ্যোগ করলাম। যথারীতি অঘোরবাবুর ঘোরনাদ শোনা যেতে লাগলো। আমি কানদুটো বালিশে চাপা দিয়ে চোখবুজে শুয়ে পড়লাম। অঘোরবাবুর সাথে আর রাত্রিযাপন নয়।
 
মাধবদার ডাকে ঘুম ভাঙল। মাধবদা চা আর ব্রেকফাস্টের ট্রে নিয়ে হাজির। অঘোরবাবু চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে বললেন, “তা সেই টিকটিকিটি কই ? মর্নিং ওয়াকে ?”
মাধবদা একগাল হেসে বলল, “সকাল কি আর আছে  বাবু, দশটা বাজতে চলল। বিক্রম দাদাবাবু বাইরে গিয়েছেন। আপনারা জলখাবার খেয়ে স্নান করে নিন। দাদাবাবু এসে পড়বেন।”
 
ঘন্টাখানেক পর বিক্রম এল, সঙ্গে দেবলীনা। দেবলীনাকে দেখে অঘোরবাবু বেশ উচ্ছ্বসিত হয়ে পড়লেন। বেশ দরাজ গলায় অভ্যর্থনা করতে করতে এগিয়ে গেলেন,” ওয়েলকাম দেবলীনা, সুস্বাগতম ! অনেকদিন পর তোমার সঙ্গে দেখা হলো। “
 
 দেবলীনা অঘোরবাবুর পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করে বলল, ” আমি ভালো আছি কাকু, আপনার শরীর ঠিক আছে তো ! ” অঘোরবাবু  দেবলীনার মাথায় হাত দিয়ে আশীর্বাদ করে বললেন, “তোমার মতো মেয়ে হয় না মা। কিন্তু তোমার বাবাকে বোঝাও, ছেলেটার উপর আর যেন মানসিক অত্যাচার না করে। এই তো কালকেই ছেলেটাকে যা নয় তাই বলে অপমান করেছে। তুমি একটু বোঝাও মা। “
 
দেবলীনা অস্বস্তিতে পড়ে গেল, বিক্রম এগিয়ে এল এই সমস্যার সমাধানে। বিক্রম বলল, “দেখুন অঘোরবাবু, দেবলীনার বাবা নিজের দিক হতে ঠিক। মেয়ের বাবা হলে আপনিও দেবলীনার বাবার সঙ্গে একমত হতেন। ওসব কথা বাদ দিন, কাজের কথা বলি শুনুন। আপনাদের দুজনের রক্তের নমুনাই আমি টেস্ট করিয়েছি, আমার বন্ধু ফরেন্সিক এক্সপার্ট বিমল দাশগুপ্তর ল্যাব হতে। আমার সন্দেহই সত্যি, দুজনের রক্তেই ড্রাগের ট্রেস পাওয়া গেছে।”
 
অঘোরবাবু আর নিজেকে সংযত করতে পারলেন না। তিনি হুঙ্কার ছাড়লেন ,” এর মানেটা কি ! আমি মাতাল ? আপনার কোনও অধিকার নেই মশাই এই মেয়েটার সামনে আমার ইজ্জত নিয়ে খেলা করার। আমার কথা নাহয় বাদই দিলাম, আমি হাড়হাবাতে বুড়ো মদ-গাঁজা খেয়ে এখানে ওখানে পড়ে থাকি, কিন্তু ওই দুধের ছেলেটা?”
 
… চলবে 
 
 
 
 
 

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *