নতুন রহস্য ধারাবাহিক // শেষ নেই যার // সুব্রত মজুমদার // পর্ব – ৭

 শেষ নেই যার // সুব্রত মজুমদার // পর্ব - ৭
 শেষ নেই যার // সুব্রত মজুমদার // পর্ব – ৭
এরমধ্যেই আমাদের নৌকা অনেকদূর এগিয়ে গেছে। নৌকা যত এগোচ্ছে ততই দু’পাশের জঙ্গলের গভীরতা বাড়ছে, আর তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে নির্জনতা। যতই এগোচ্ছি রাস্তা ততই  সঙ্কুচিত হচ্ছে, দু’পাশের গাছপালা নুইয়ে পড়েছে জলের উপর । এইসব গাছপালার মধ্যে বেশিরভাগই বাঁশ। মাঝির সঙ্গে থাকা জমাতিয়া লোকটা নৌকা হতে নেমে পড়ল। একটু সাঁতরেই পাড়ে পৌঁছে দা দিয়ে বাঁশগুলো কেটে জলপথ পরিস্কার করতে লাগল। এইভাবে কিছুদূর এগোই আর নৌকা আটকে যায় blog-post। লোকটা আবার নেমে রাস্তা পরিষ্কার করে, নৌকা আবার এগিয়ে যায়। এইভাবে আরো অনেকটা এগিয়ে যাওয়ার পর মাঝি বলল, “নৌকা আর যাবে না বাবু, বাকি পথ হেঁটে যেতে হবে।” 
 
 
বিক্রম বলল, “মালপত্র সব নামিয়ে নাও। আমাদের সঙ্গে যা রসদ আছে তাতে তিনচারদিন চলে যাবে। মানসিক প্রস্তুতি নাও, যতদূর সম্ভব এগোবো আমরা। পথে  হয়তো অনেক সমস্যা আসবে, আমাদেরকে সব উপেক্ষা করে এগিয়ে যেতে হবে।” 
 
প্রথমেই  ঘটলো অঘটন, মাঝি আর তার সঙ্গের লোকটি এগিয়ে যেতে রাজি হলো না। মাঝি বলল,” মা চক্রাকমার শাপ লাগবে বাবু, রাতে ভেতরে যেতে পারবো না। আমরা বরং ফিরে যাই। দরকারে কাল এসে ঠিক এইখানে একটা নৌকা বেঁধে দিয়ে যাব। ফেরার সময় আপনাদের কাজে লাগবে। “
বিক্রম মাঝির প্রস্তাবে রাজি হয়ে গেল। সবাই নৌকা হতে নেমে মালপত্র নিয়ে এগিয়ে যেতে লাগলাম। সময়ের সাথে সাথে রসদ কমে আসবে আর আমাদের ভারও কমবে। আমাদের যাত্রাপথের একদিকে শীর্ণ জলধারা তিরতির করে বয়ে চলেছে, আর সেই জলধারার পাশে চওড়া পাথরের মেঝে। রাস্তা না বলে মেঝেই বললাম, কারন প্রকৃতি এই পথ মনুষ্য চলাচলের জন্য বানায়নি।
 
 
দু’পাশের পাহাড় ছাদের মতো আমাদের মাথার উপর বিস্তৃত হয়ে রয়েছে। মাথার উপরের পাথরের গা’ হতে টপটপ করে জল ঝরে পড়ছে। রেইনকোট গায়ে থাকার জন্য গা’-মাথা ভিজছে না, তবে শীত কিন্তু বেড়েই চলেছে। হঠাৎ একটা বিচিত্র আওয়াজ কানে এল। বিক্রম পকেট হতে পিস্তলটা বের করে বাগিয়ে ধরল। আমিও কম সাহসী নই, খালি হাতেই পাথরের গায়ে কান লাগিয়ে আওয়াজের উৎস অনুসন্ধান করতে লাগলাম। একসময় পেয়েও উৎসটা গেলাম।
 
 
শীর্ণ জলাধারার পাশেই একটা বিশাল বড় পাথরের চাঁইয়ের আড়াল হতে আসছে আওয়াজটা। আমি বললাম, “নির্ঘাত কোন বুনো-শুয়োর হবে। অনেকটা সেরকমই আওয়াজ আসছে।”  বিক্রম আমার কথায় আমল দিলো না, দেবলীনা কিন্তু বেশ ভয় পেয়ে গেছে। আমি হাতের লাঠিটাকে বাগিয়ে ধরে এগিয়ে গেলাম। এরপর লাঠি দিয়ে পাথরের অপরদিকে থাকা জন্তুটাকে লাগলাম দমাদ্দম বাড়ি। একটা গোঁঙানির আওয়াজ আসতেই বিক্রম দৌড়ে এসে আমার হাত হতে লাঠিটা কেড়ে নিল।
 
 
আমি হকচকিয়ে গিয়েছি। বিক্রম পাথরের আড়ালে থাকা জন্তুটার দিকে ছুটে গেল। পেছন পেছন আমিও গেলাম। তারপর যা দেখলাম তাতে তো আমার চক্ষুস্থির। দেখলাম হাত পা বাঁধা অবস্থায় পড়ে আছেন অঘোরবাবু, মুখে নিকোপ্লাস্ট লাগানো। বন্ধনমুক্ত হতেই হাউমাউ করে কেঁদে উঠলেন তিনি। বললেন, “ঘর হতে পর ভালো, তারচেয়ে গাছতলা ভালো মশাই। আপনারা তো আমার জানের পেছনে হাত ধুয়ে লেগে পড়েছেন।”
 
 
বিক্রম আর দেবলীনা হেসে বাঁচে না। আমি হাত জোড় করে অঘোরবাবুর সামনে দাঁড়ালাম, বললাম, “খুব অন্যায় হয়ে গেছে অঘোরবাবু, এ যাত্রা আমাকে ক্ষমা করে দেন। একটু বেশিই বাড়াবাড়ি করে ফেলেছি। “
অঘোরবাবু সেযাত্রা আমাকে মাফ করে দিলেন। মলমপট্টি করে অঘোরবাবুর শুশ্রূষা করা হল। ফ্লাক্সে রাখা গরম গরম চা খেয়ে শরীর গরম করে নিলেন অঘোরবাবু। বিক্রম বলল, “চায়ের স্টক কিন্তু অল্প অঘোরবাবু, আর বার দু’য়েক হবে। তবে শুকনো খাবার যথেষ্টই আছে। বলুন অঘোরবাবু, কি করে এখানে এলেন, যেতে যেতে আপনার গল্পটা শুনি । “
অঘোরবাবু কপালের ফুলে ওঠা জায়গাটা হাত দিয়ে একবার স্পর্শ করে ‘উঃ’ করে চিৎকার করে উঠলেন, তারপর বললেন, “সে ছোটোখাটো ট্রাজেডিক নভেল মশাই, অঘোর বাঁড়ুজ্জের  শনির দশা লেগেছিল। আমার সারা জীবন আর কোনোদিন ওরকম পরিস্থিতিতে পড়িনি।
 
 
সকালবেলা এককাপ চা নিয়ে বসেছি, এমন সময় দরজায় ধাক্কা, – দরজা খুললাম। দুটো দশাশই লোক হুড়মুড় করে ভেতরে ঢুকে এল। তারপর ওদের একজন আমাকে প্রায় চ্যাংদোলা করে ভেতরে নিয়ে চলল, আরেকজন সদর দরজাটা লাগিয়ে দিল। আমি তো মশাই ভয়ে কাঁপছি। ওদের একজন বলল, “এই যে বুড়ো, আমাদের একটুকুসখানি কাজ করে দাও তো। একটা ফোনকল..”
আমি চিৎকার করতে গেলাম, সঙ্গে সঙ্গে লোকটা  আমার কানপাটিতে বন্দুক ধরে বলল, “কেলো করবেন না কত্তা, কেলোর কিত্তি আমরা অনেক দেখেছি। বুয়েছেন কিনা !” 
 
 
আমিও কাঁপতে কাঁপতে ফোন ধরালাম। ওরা সবই বলেদিয়েছিল, কাকে ফোন করতে হবে কি বলতে হবে এইসব আরকি। আমিও সায়ককে সেইভাবেই বললাম। চালাকি করার চেষ্টা করিনি মশাই, জানে মেরে দিত। “
দেবলীনা বাঁ হাতটা মুখে রেখে বলল, “ওহ্ মাই গড ! কি ডেঞ্জারাস !”  বিক্রম কিন্তু কোন প্রতিক্রিয়া দিল না, অগত্যা আমিই বললাম,” তারপর কি হল অঘোরবাবু ? “
অঘোরবাবু অবিন্যস্ত চুলে  আঙুল চালাতে চালাতে বললেন,” তারপর সব অন্ধকার। যখন জ্ঞান হল, দেখলাম একটা অন্ধকার কুঠুরির ভেতর হাত-পা বাঁধা অবস্থায় পড়ে আছি। অনেকক্ষণ পরে পারিপার্শ্বিক আওয়াজ আর দুলুনিতে বুঝতে পারলাম আমাকে প্যাকিং বাক্সে ভরে গাড়িতে করে নিয়ে যাচ্ছে। ট্রেনে ওঠার আগে আমার মুখে মাস্ক পরিয়ে দেওয়া হয়েছিল, ওই যে যেসব পাগল কামড়ে দেয় তাদের পরায় যে মাস্কগুলো.. ”     
 
 
আমি মাথা নেড়ে বুঝিয়ে দিলাম যে আমি মাস্কের ব্যাপারটা বুঝেছি। অঘোরবাবু আবার শুরু করলেন,” ওরা আমাকে পাগল সাজিয়ে ট্রেনে তুলেছিল। কলকাতায় দীর্ঘদিন চিকিৎসার পর আগরতলার বাড়িতে ফিরছি। আগরতলা হতে গাড়িতে করে একটা নদীর তীরে আনে, তারপর নৌকায় করে নিয়ে এসে এখানে ফেলেরেখে পালিয়ে গেল। আমি তো মশাই তিলে তিলে মৃত্যুর জন্যে প্রস্তুত হচ্ছিলাম। আপনারা এসে বাঁচিয়ে দিলেন। তবে সায়ক আমাকে মেরেই ফেলত, ভাগ্যিস আপনি মাঝখানে এসে পড়লেন। ” এতটা বলে অঘোরবাবু থামলেন। 
 
বিক্রম বলল,”আপনাকে ছবিমুড়াতেই পাবো সেটা আমি জানতাম। আমাদের সামনের অদৃশ্য জাদুকরটির উদ্দেশ্য খুব একটা মহৎ তা নয়, তবে অযথা প্রাণহানি যে সে চায় না তা বোঝাই যাচ্ছে। তবে অঘোরবাবুর টার্গেট হয়ে যাওয়ার জন্য আমি দুঃখিত। ”   বিক্রমের কথা শুনে অঘোরবাবু একবার বিক্রমের দিকে তাকালেন, তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে সামনের দিকে হাঁটতে লাগলেন। 
আমাদের চলার পথের দু’পাশের দেওয়ালে বিচিত্র সব মূর্তি খোদাই করা রয়েছে, তবে কোনোটাই স্পষ্ট নয়, কালের হস্তাবলেপে ক্ষয়ে ক্ষয়ে বিমূর্ত অবয়বে পরিণত হয়েছে। কোনোটার হাত, কোনোটার পা, আবার কোনোটার শরীরের অংশবিশেষ দিয়ে কিছুটা চিনে নেওয়া যায়।
 
 
 
যেমন ওই সামনেরটা মুখ ও শরীরের কোনোঅংশই অবশিষ্ট নেই, একমাত্র হাতগুলো ছাড়া। হাত আর হাতে থাকা অস্ত্রশস্ত্র দেখে বোঝা যায় ওটা কোনও শক্তিমূর্তি হতে পারে। তার পাশের মূর্তিটা বৌদ্ধদেবতা অবলোকিতেশ্বরের। যত এগিয়ে যাচ্ছি আবহবিকারের পরিমাণ ততই কমছে। আর মূর্তিগুলোও ততই স্পষ্ট। বিক্রম তার ডিজিটাল ক্যামেরায় যথাসম্ভব ছবি তুলে রাখছে। অঘোরবাবু ভাস্কর্যগুলো দেখেই হতবাক, বললেন, “সেবার বিক্রমবাবুর সঙ্গে পুরি গিয়েছিলাম, পুরি হতে কোনার্কের সূর্য্য মন্দির। ওহ্, কি অপূর্ব ভাস্কর্য ! বুঝলে সায়ক, এমন রোমান্টিসিজম আর কোথাও দেখা যায় না। তবে এখানকার ভাস্কর্যগুলোও এক সে বড়িয়া এক। ওখানে মৈথুন আর এখানে আত্মসমর্পণ। দুটো দু’রকম।” 
 
 
 
 ………..  চলবে ।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *