পুরুলিয়ার কবি গৌতম রায় এর কাব্য “স্থাপত্য স্টেশন” নিয়ে আলোকপাত করলেন কবি তৈমুর খান ।

 Taimur Khan

মুগ্ধতার নিরবচ্ছিন্ন আয়োজন 
_________________________________________
“জয়চণ্ডীর শোভা কলোনিতে 
                   এ লি ডি উঠেছিল হেসে” 
এই সেই “প্রেম” যার মুগ্ধতায় নিরবচ্ছিন্ন আয়োজন যা তিলোত্তমা থেকে সফেদ হাতির স্বপ্ন, কোনার্কের সূর্যমন্দির থেকে গথিক সভ্যতা পর্যন্ত। আর কবি তখন লিখতে পারেন : “আমি সেই আলোয় 
               রূপান্তরের ভাষা 
                     করতে থাকলাম টাইপ”
এই রূপান্তরের ভাষা কবি গৌতম রায় এর “স্থাপত্য স্টেশন” (প্রথম প্রকাশ ২০১৯) -এ ধরা পড়ল। রচনাকাল ২০১৪-১৮ সময়ে কবির স্বয়ংক্রিয় পর্যবেক্ষণের ৪৮ টি কবিতায়। বৃষ্টিভেজা সকালের অভিযোজন অভিযানে পূর্ণতায় সাবলীল “হলুদিমায়” চেয়ে থাকা “বাতাবিয়া অডিশন” তারপর “আলোলিকা”র সমাগমে কদর ফুটানো বীজ সুগমের দিকে চলা আকাশে প্রসারিত হতে দেখি। কাব্যভাষায় শুধু গতানুগতিক ব্যঞ্জনা নয়, বিশেষণকে সচলতার ব্যাপ্তিতে ভিন্ন ভিন্ন প্রত্যয় যোগ করে নতুন এক বিনির্মাণের পথ দেখালেন।
রাবাংলা, চাঁদেলা, নদীতা, সুফিয়ানা, বেহুলানি প্রভৃতি শব্দ ব্যবহারে এবং নৈবেদ্যে খুশ খুশ বাষ্পমোচন, লাবণ্যপ্রভাব দিন, জলের পাশে তোয়া, জিরাত শরীরে উথলায় বিহঙ্গ আমন, রসায়নে রসায়নে ফুটে উঠছে পিটুনিয়া, অন্তরনক্সার ভেতর সাঁতরায় খনন, টিয়া ফলবতী থেকে খাচ্ছে আতা / জিরাতকে অর্ঘ্য দিচ্ছে বীজ প্রভৃতি বাক্যগুলিতে ছড়িয়ে আছে পোস্টমডার্নিজ অভিব্যক্তি। জীবনযাত্রা, লোকজ উপকথা, আঞ্চলিক ক্রিয়া ও উৎসব, প্রান্তিক মানুষের উত্থান প্রভৃতি প্রকৃতির অনবদ্য শিহরনে প্রত্যয় জেগে ওঠা এই মঞ্চভূমি কখনও দেবালয়, কখনও মন্ত্রোচ্চারণের যজ্ঞশালা। পুরাণ, ইতিহাস, বিজ্ঞান একসঙ্গে মিশে গেছে। জীববিজ্ঞানের শ্বসন শোষণ ক্লোরোফিল সালোকসংশ্লেস, কার্বনডাইক্সাইড অক্সিজেন থেকে চ্যাটিং পালস্ স্যাভলন গ্রাফিক্স ব়্যানট্যাক পেনকিলার ফ্রন্টফুট প্রভৃতি শব্দগুলি অনায়াসে ব্যবহার করেছেন। `আয়ত্ব’ (আয়ত্ত?) শব্দটির ব্যবহার এভাবে :
“এরপর জাগতিক বিন্যাসগুলির জাদুঘর 
               আয়ত্ব করতে করতে আসে লগ্নজিৎ”
জন্মলগ্ন(জন্মদিন) যে লগ্নজিৎ হয়ে শুভ হয়ে যায় তা কবি দেখালেন। উপমাত্মক শব্দের ব্যবহার কম, সংশয়বাচক অব্যয়ও তেমন নেই। এটা তো অধুনান্তিকেরই একটা বৈশিষ্ট্য। তবে সর্বত্রই কবির নিজস্বতাই ফুটে উঠেছে। কবি যখন লেখেন :
                “অনেক বাতাবি ফুল 
                 অনেক শিমুল 
                  অনেক পলাশ 
                    রাফখাতার মতো পড়ে আছে 
                                             রাস্তার মার্জিনে”
তখন কবিতা-ই মনে হয় যা প্রকৃতির পাঠশালা। “অস্ত্রপ্রচার” পরবর্তী সবুজ শ্যামলের সেই মরমি রূপ। আবার যখন সেই ব্যাপ্তির আভাস নেমে আসে :
 “আজ বুদ্ধপূর্ণিমা 
  উঠেছে সম্পৃক্ত চাঁদ 
  চেতনার ঢালে গলে নামছে জ্যোৎস্না” 
তখন তো মহীয়ান হয়ে ওঠে এই বোধও। কবিতা নিজস্ব ভুবন করে তোলে এই জগৎকেও।“ তখন চলাচল নাড়াই। অপেক্ষা বুনতে থাকে একটি সালোকসংশ্লেস সকাল।” আমেরিকান কবি ই ই কামিংসও যেমনটি বলেন :
“yours is the light by which my spirit’s born:
yours is the darkness of my soul’s return
–you are my sun, my moon, and all my stars”
(e. e. cummings) 
তুমিই সেই আলো যার দ্বারা আমার আত্মার জন্ম। তুমিই আমার সূর্য, আমার চাঁদ এবং আমার সমস্ত তারা। এই ব্যাপ্তির প্রেমময় আলোকদীপ্তির প্রাচুর্য “স্থাপত্য স্টেশন”ও। এই জন্ম পৃথিবীর মহান আলোক স্থান যেখানে কবির আত্মার স্ফুরণ ঘটেছে বেদান্ত থেকে লোকসংস্কৃতির নানান পর্যায়ে। প্রচ্ছদ শিল্পী দেবাশিস সাহার প্রচ্ছদও ইংগিতপূর্ণ। 
_________________________________________
*স্থাপত্য স্টেশন : গৌতম রায়, পাঠক, কলকাতা ৭০০০০৯, মূল্য ১০০ টাকা ।
              আলোচক :তৈমুর খান 

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *