পুস্তক আলোচনা

পুস্তক আলোচনা

স্ববৃত্তীয় নারী-পুরুষের আদিম প্রবাহ    তৈমুর খান

.

.

ফজলুল হক (১৯৫১) এর “মৃতরাত্রিপুরাণ”(প্রথম প্রকাশ বইমেলা ২০১৯) এক ভিন্নস্বরের উপন্যাস। প্রচলিত ধারায় যে ঘটনাবহুল কাহিনি ও চরিত্রের সংঘাত দেখা যায়, এখানে তা সম্পূর্ণরূপে মনস্তাত্ত্বিকভাবে সাম্প্রতিক কালের নারী-পুরুষের যৌনতা ও প্রেমের সম্পর্ককে তুলে আনা হয়েছে। লেখক উত্তম পুরুষে কাহিনির গভীরে জীবন্তিকা নামে এক রমণীর দাম্পত্যজীবনের শূন্যতা থেকে শরীরী চাহিদার উদ্দামতাকে অপরিসীম আত্মক্ষরণের মগ্নতায় নিভৃত সংলাপে বিন্যস্ত করেছেন।.

.

প্রথম জীবনে জীবন্তিকা যমজ সন্তান হিসেবে জন্মগ্রহণ করে বলে তার ভাইকে পিতা-মাতা নিজেদের কাছে রেখে তাকে লালন পালনের দায়িত্ব দেয় অন্য আর এক দম্পতিকে। বড়ো হয়ে সে জানতে পেরে পুনরায় ফিরে আসে।.

.

কিন্তু নিজ মাতা-পিতার কাছেও অবহেলা অনুভব করে তার ভাই ও দিদির তুলনায়। তার প্রতি বাবা-মায়ের স্নেহের কৃপণতা থেকেই তার মানসিকতা দৃঢ় ও জেদি হতে শুরু করে। প্রথম যৌবনে একজনের সঙ্গে ঘর ছাড়ে, কিন্তু সেখানেও প্রত্যাখ্যাত হয়। ইতিমধ্যে ফেসবুকে তাঁর সঙ্গে পরিচয় হয় অন্তিক নামে এক যুবকের।.

.

সে ভালো চাকরি করে, উচ্চ শিক্ষিত, সব জেনে শুনেই জীবন্তিকাকে বিয়ে করে। জীবন্তিকা মনে করে এই বিয়ে দয়ার নয়, অধিকারের। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই সে বুঝতে পারে সেই দাম্পত্যজীবনও মহাশূন্যতায় ভরা। অন্তিকের কর্মব্যস্ততা ও দীর্ঘ অনুপস্থিতিতে তার জীবনে হাহাকার নিঃসঙ্গতা নেমে আসে। তখন ফোনেই আলাপ লেখকের কাছে সে সবকিছুর সমাধান চায়। এই বদ্ধ জীবন থেকে সে মুক্তি চায়। আর এই মুক্তির জন্য একটা চাকরি দরকার।.

.

    লেখক ও তাঁর সঙ্গী শুভ্রা তাদের বিচ্ছেদ হওয়ার মুখে দাম্পত্যজীবন নিয়ে বহু কাউন্সেলিং করেও তাকে মানসিকভাবে সুস্থ করে তুলতে পারেন না। এক বছর সময় দিয়ে পুনর্গঠনের চেষ্টা করেন। অবশেষে লেখকের পরামর্শে তাদের দাম্পত্যজীবন জোড়া লাগে একটা অদৃশ্য দূরত্ব বজায় রেখেই। লেখকই জীবন্তিকার আদর্শ পুরুষ। বয়সের ভারে লেখক অনেকটাই ক্লান্ত বলে কখনও কখনও নিজেকে পিতার আসনে বসান। কিন্তু এহ বাহ্য, শেষ পর্যন্ত শারীরিক সম্পর্কেই ধরা দেন। অক্ষমতা কাটিয়ে যে অনাবিল সুখ দেওয়া যায় তা উপলব্ধি করেন।.

.

    এই কাহিনিই কাব্যিক ও মননশীল ভাষায় আশ্চর্য উচ্চতায় প্রকাশ করেছেন। জীবন্তিকাকে দেখেই তাঁর মনে হয়েছে :“এ মেয়ের শরীরে গাঁথা আছে বিচিত্র গল্পকথা, অন্যরকম গান।”(পৃষ্ঠা ২১).

.

অন্তিক সম্পর্কে তাঁর মনে হয়েছে :“যৌনতায় অদক্ষ ওই অসহ্য লোকটার প্রতি আমার করুণা ছাড়া আর কী থাকে।” (পৃষ্ঠা ২২).

.

যৌনতার আশ্চর্য মাদকতা এক নৈঃশাব্দ্যিক স্রোতে যেন আত্মরসায়নের ধ্বনি তুলেছে। সেক্স ডিপ্রেশান কতখানি মারাত্মক এবং নারীর পুরুষ নির্বাচনে বয়সও যে বাধা নয় তা খুব সহজেই বোঝা যায় : “সময়ের ব্যবধান এই মেয়েটি কখনও মানে না।” (পৃষ্ঠা ৪১).

.

প্রথা ভাঙার ও সাহসী হয়ে উঠার এই অনিরুদ্ধ মেয়েটি লেখকের কৌতূহল জাগ্রত করে। অন্য যেকোনও পছন্দের পুরুষের সঙ্গে তার সম্পর্কের কারণ বোঝাতে সে বলে :  “দেহ আমার কাছে অতি সাধারণ। তার পরিচর্যার জন্যে যা যা দরকার তা দিতে হবে। তার জন্যে ঘটা করে এমন বিয়ের দরকার নেই। মনের মতো একজন মানুষ চাই যার কাছে আনন্দ পাব।”(পৃষ্ঠা ৫৫).

.

সুতরাং সম্পর্ক ভাঙাগড়াও স্বাভাবিক ব্যাপার। বর্তমানে অবস্থান করেও ভবিষ্যতের যাত্রায় ধাবিত তার ক্রিয়াগুলি ভাবনাবৃত্তে যে স্ট্রিম অফ কনসিয়াসনেসে সম্পন্ন হয়েছে তা অনুভববেদ্য প্রখরতায় বিস্ময়কর । সে বলে :“আমি নিজের মতো বাঁচতে চাই।” (পৃষ্ঠা ৬৯).

.

লেখকের সঙ্গে তার যৌনসম্পর্ক এবং আদিমতম শরীরী উল্লাসে মিশে যাওয়া খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার বলে মনে হবে। লেখক বলেছেন : “নারীর সঞ্চিত যৌন অঙ্গে আদিম গন্ধে শ্বাস নেওয়া কোনও মতেই অশ্লীল নয়। (পৃষ্ঠা ৭৯).

.

   গ্রন্থটিতে কোথাও এই সম্পর্ককে অবৈধ বা অশ্লীল বলে মনে হয়নি। সবই ন্যাচারাল এবং অমোঘ হয়ে উঠেছে। আমেরিকান নাট্যকার ও লেখক জিম্মি দীন(  Jimmy Dean) বলেছিলেন : “ Love is an ice cream sundae, with all the marvelous coverings. Sex is the cherry on top.” এই রোমান্সের বাতাবরণে বয়স ও বৈধ অবৈধের তোয়াক্কা না করে তাদের সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। বিয়ে অর্থে জীবন্তিকা লেখককে প্রশ্ন করেছে :“পুরুষেরা কি কেবল আমার যোনির নিরাপত্তারক্ষী?” (পৃষ্ঠা ৮৭).

.

লেখকও অবশেষে নিজেকে আবিষ্কার করেছেন : “পুরুষ যে ভোগী সেই ভোগের সাথে আমিও মিলে মিশে একাকার সেটা প্রমাণ হয়ে যায়।” (পৃষ্ঠা ৮৫).

.

 “মৃতরাত্রিপুরাণ” যেন সেই রাত্রিরই আদিম প্রবাহ যা প্রত্যেকে বহন করে নিয়ে চলেছে। এর উক্তিপ্রত্যুক্তি, ভাষাব্যঞ্জনা, ক্রিয়াবিক্রিয়ায় , বিভিন্ন পর্বের নামকরণে বেশ কাব্যিক তাৎপর্য আছে। বইটি উৎসর্গ করা হয়েছে আর একজন মানবচরিত্রের প্রত্ন অনুসন্ধানী “সেকালের কলিকাতার যৌনাচার” গ্রন্থের লেখক মানস ভান্ডারীকে। এই গ্রন্থের বিষয়ের সঙ্গে অনেকটাই মিল পাওয়া যায় বইকি!

.

.

.

.

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *