বরাহ গ্রহের আলো // সুব্রত মজুমদার // ২

বরাহ গ্রহের আলো // সুব্রত মজুমদার // ২

একটা স্পেসবোট খোলা হল। স্পেসবোটের কন্ট্রোলে রইলো শঙ্কর আর কো-পাইলট ক্যাপ্টেন যোগন্দর  সিং । সিস্টেম চেক করা হল। হেনরি আর রিও কম্যুনিকেটিং লিঙ্কগুলোর পরীক্ষা করে নিল।

স্পেসবোট আলোর চেয়েও তীব্র গতিতে ছুটে চলল রহস্যময় সেই গ্রহের উদ্দেশ্যে। গ্রহটির বায়ুমণ্ডলে ঢোকামাত্র স্পেসবোটের নিরাপত্তাবলয়ের চারদিক নীল আগুনের শিখায় ভরে গেল। নিরাপত্তাবলয় থাকার জন্যে ঘর্ষনজনিত তাপ স্পেসবোটের কোনো ক্ষতি করতে পারল না। স্পেসবোট যেখানে ল্যান্ড করল সেই জায়গাটা কালচে পাথর দিয়ে তৈরি একটা ক্ষয়জাত পর্বতের সানুদেশ।

সবার প্রথমে বায়ুমণ্ডলে বিভিন্ন উপাদানের বিশ্লেষণ করা হল । এমা বলল, ” বাতাসে অক্সিজেনের মাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে একটু বেশিই আছে। আর আছে একটা অজানা গ্যাস। তবে আমাদের ‘লাইফোমিটার’ জানাচ্ছে, গ্যাসটা মানব শরীরের পক্ষে ক্ষতিকর নয়। বাতাসে তেমন অজানা ক্ষতিকর ভাইরাস বা জীবাণু নেই।”

শঙ্কর বলল, “তাহলে আমরা নামতে পারি ?”

এমা জানাল, “স্বাচ্ছন্দে। কোনো গ্যাস মাস্কের প্রয়োজন নেই। এমনকি স্পেসস্যুটও অপ্রয়োজনীয়। “

সবাই মিলে ‘প্ল্যানেটারি রোভার’ – এ গিয়ে বসল। রোভারটি আস্তে আস্তে বেরিয়ে এল স্পেসবোট হতে। রোভারটি একটা বড়সড় ইভি ভ্যানের মতো। এর ভেতরটা পুরো এয়াকণ্ডিশন করা আছে। রোভারের ভেতরে ল্যাব সহ অন্যান্য সুবিধা রয়েছে। রোভারটি চলতে থাকল। পাহাড়ের তলদেশে একটা গুহামতো জায়গার সামনে রোভারটি দাঁড়করানো হল।

রোভার থেকে সবাই নামল। প্রত্যেকের হাতেই অত্যাধুনিক অস্ত্র। শঙ্করদের সঙ্গে চলেছে খানচারেক অত্যাধুনিক রোবট। এরাই মূলত স্যাম্পল সংগ্রহ, প্রাথমিক প্রতিঘাত, ডিফেন্স আর ফার্স্ট-অ্যাডের কাজ করবে।

শঙ্কর বলল, “এই গুহাটা তল্লাশি চালানো দরকার। যদি প্রাণের সন্ধান পাওয়া যায় তো ভালো, নতুবা এই গুহাটা আমাদের ভালো শেল্টার হবে।”

অস্ত্র উঁচিয়ে সবাই গুহাতে প্রবেশ করলো। গুহাটা প্রাকৃতিক। পাহাড়ের কোনো অংশ হতে জলের ধারা বেরিয়ে আসার ফলে এই গুহার সৃষ্টি হয়েছে। জলের ধারণাটি পাথর কাটতে কাটতে একপাশে সরে গেছে, অন্য দিকটায় মার্বেলের মতো মসৃণ মেঝে। হেনরি গুহার তাপমাত্রা পরীক্ষা করে বলল,” গুহাটার ভেতরের তাপমাত্রা ২৫° সেলসিয়াস, একদম স্ট্যাটিক। কিন্তু তা কি করে হয় ক্যাপ্টেন ? খোলামুখ গুহার টেম্পারেচার স্ট্যাটিক হয় কিভাবে ?”

    এবার শঙ্করের মাথাতে বিদ্যুৎ খেলে গেল। জলস্রোতে তৈরি প্রাকৃতিক গুহার মেঝে ও দেওয়াল তো কখনোই এত মসৃণ হতে পারে না। ঠিক তখনই রিওর চিৎকার শোনা গেল। সবাই রিওর কাছে গিয়ে দেখল রিও দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কাঁপছে। একটা ঝাঁঝালো তরল ছাদ হতে টপ টপ করে  রিওর সারা শরীর ঝরে পড়ছে, আর সেই তরলের প্রভাবে শীতল হয়ে যাচ্ছে রিওর শরীর।

বিন্দুমাত্র দেরি না করে রিওকে ওই জায়গা হতে সরিয়ে আনল যোগিন্দর। এরপর রোবোটেরা লেগে গেল শুশ্রূষায়। তরলটা মুছিয়ে কৃত্রিম তাপকারক যন্ত্রের সাহায্যে রিওর শরীরের তাপমাত্রা স্বাভাবিক করা হল।

এমা তরলটার স্যাম্পল নিয়ে অ্যানালাইজারে পরীক্ষা করতে লাগল। হেনরি আর শঙ্কর ছাদের যেখান হতে তরল ঝরে পড়ছে সেই জায়গাটা পরীক্ষার কাজে লেগে পড়ে। রিও এখন অনেকটাই সুস্থ্য, সে উঠে বসে।

এমা অ্যানালাইজারের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে বড় বড় চোখ করে বলে ওঠে, “ও মাই গড !”

রিও এমার দিকে এগিয়ে যায়। এমার কাঁধে হাত রেখে বলে, “কি হয়েছে এমা ?”

এমা বলে, ” তোমার গায়ের উপর যে তরলটা ঝরে পড়ছিল সেটা কি জানো…!”

রিও কৌতূহলী হয়ে ওঠে, “কি তরল ওটা !”

এমা বলে, ” অ্যামাইনো অ্যাসিড। এক ধরনের জটিল অ্যামাইনো অ্যাসিড। এই ধরনের যৌগ পৃথিবীর বুকে পাওয়া যায় না। এই তরলটা হল প্রাণের আদি রুপ। আবার এই যৌগ উত্তম শীতলকও।”

এতক্ষণে শঙ্কর আর হেনরিও ফিরে এসেছে। আসার সময় তারা এমার সব কথাই শুনেছে।

শঙ্কর বলল,” এই গুহার মাথার উপরে এই অ্যামাইনো অ্যাসিডের রিজার্ভার আছে। সেখান থেকেই তরলটি ঝরে পড়ছে। কোনো কারনে গুহার ছাদে ফুটো হয়েছে বা করা হয়েছে। “

” ফুটো করা হয়েছে ! ”  বিস্ময় প্রকাশ করে যোগিন্দর।

শঙ্কর গুহার মেয়ের দিকে তাকিয়ে বলে, “হ্যাঁ, ঠিকই শুনেছ, – ফুটো করা হয়েছে। এই গুহাটা কোনো উন্নত প্রাণীর পরিশ্রমের ফসল”

এমা বলল,” তার মানে তুমি বলতে চাও এই গ্রহে উন্নত প্রাণীরা বাস করে….! “

শঙ্কর তার লেজার লাইটটা গুহার দেওয়ালে একটা বিশেষ জায়গার উপর ফেলল। সেদিকে তাকাতেই সবার চোখ-মুখ বিস্ময়ে ভরে উঠল। দেওয়ালের গায়ে আবছা কিছু লিপি খোদাই করা আছে। লিপিগুলো অজানা কোনো দুর্বোধ্য ভাষার লিপি।

হেনরি বলল,” আমাদের চাপ বেড়ে গেল ক্যাপ্টেন। এখন হতে খুব সাবধানে পা ফেলতে হবে আমাদের।”

রিও লিপিটা স্ক্যান করে সুপার কম্পিউটারের ডাটাবেসে পাঠিয়ে দিল। পাঠোদ্ধারের একটা চেষ্টা অন্তত চালাতে হবে। জলধারা হতে নেওয়া জলের পরীক্ষা করা হয়েছে। জলের মধ্যে এক ধরনের সুপার ব্যাক্টিরিয়া রয়েছে যা অনায়াসে জলের ক্ষতিকারক জীবাণুকে খেয়ে ফেলে জলকে দূষণমুক্ত রাখে।

এমা বলল, “ঠিক আমাদের গঙ্গাজলের মতো। বহুদিন রেখে দিলেও নষ্ট হবার সম্ভাবনা নেই।”

শঙ্কর মেঝেতে বসে পড়ল। তারপর  শঙ্কিত গলায় বলল, “আমাদের স্পেসবোটেই ফিরে যেতে হবে। সেখানটাই আমাদের জন্যে নিরাপদ। যেসব প্রাণী জটিল অ্যামাইনো অ্যাসিডকে শীতলক হিসাবে ব্যবহার করতে পারে তাদের  মেধাকে কম করে দেখা উচিত নয়। “

শঙ্করের কথাটাই হয়তো সত্যি। আশপাশের কিছু নমুনা সংগ্রহ করে সবাই রোভারে চড়ে বসল। রোভার এসে পৌঁছাল স্পেসবোটে। এবার বিশ্রাম নেওয়ার পালা।

.

… চলবে

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *