বার্মুদা রহস্য — পর্ব – ২০ — সিদ্ধার্থ সিংহ

sahityakaal.com
ওরা নাকি তাঁর সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু একজনের ভাষা অন্য জন বুঝতে না পারার জন্য সেটা একদমই এগোয়নি। তাই ওদের মধ্যে থেকে একজন ওই শিক্ষকের কাছ থেকে একটা ঝর্না কলম আর খাতা চেয়ে নিয়েছিল। তাতে হাবিজাবি কী সব রেখাচিত্র এঁকে দিয়েছিল। কী লিখেছে তা বোঝা না গেলেও সবাই অনুমান করছেন, ওদের ভাষায় ও কিছু একটা লিখে দিয়ে গেছে। কিন্তু যত দিন না ওদের ভাষার পাঠোদ্ধার করা সম্ভব হচ্ছে, অন্তত তত দিন বোঝার কোনও উপায় নেই, ওই মেয়েটি কী লিখে দিয়ে গেছে।
এর আগেও উড়ন্ত পিরিচ দেখা গিয়েছিল। উনিশশো পঞ্চাশ সালের সাতাশ এপ্রিল। টিডবলিউয়ে বিমান কোম্পানির এক প্রবীন চালক আকাশের বুকে হঠাৎ লাল আলোর বিচ্ছুরণ দেখতে পেলেন। তাঁর মনে হল, বিরাট বড় একটা লাল বল যেন এক দিক থেকে আরেক দিকে ধেয়ে যাচ্ছে। কী ওটা? বুঝতে না পেরে তিনি তাঁর কো-পাইলট রবার্ট অ্যালিকেসকে ব্যাপারটা একটু ভাল করে খতিয়ে দেখতে বললেন। অ্যালিকেস এত দিন ধরে আকাশে উড়ছেন, কিন্তু এ রকম কোনও জিনিস তিনি এর আগে কখনও দেখেননি। ফলে একটু ঘাবড়ে গেলেন। তিনি সঙ্গে সঙ্গে শিকাগো কন্ট্রোল টাওয়ারের সঙ্গে যোগাযোগ করে জানতে চাইলেন, তাঁদের কাছাকাছি কোনও বিমান আকাশে উড়ছে কি না বা ভুলবসত কোনও বিমান ঢুকে পড়েছে কি না।
আরও একবার ভাল করে দেখে নিয়ে কন্ট্রোল টাওয়ার থেকে তাঁকে জানিয়ে দেওয়া হল, না। শুধু ওখানে কেন? তাঁদের বিমানের ত্রিসীমানার মধ্যে কোনও বিমান উড়ছে না। কো-পাইলটের কাছ থেকে এই সংবাদ পেয়েই প্লেনের ভিতরে যে সব যাত্রীরা এতক্ষণ উগ্বিঘ্নে কাটাচ্ছিলেন, অ্যালিকেস তাঁদের জানিয়ে দিলেন, না। ভয়ের কোনও কারণ নেই। ওটা হয়তো অন্য কিছু।
মুখে বললেন ঠিকই, কিন্তু মনের ভিতরে কী যেন একটা খচখচ করতে লাগল তাঁর। তাই বিমান যাত্রীদের কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে তিনি তাঁর ফ্লাইটের মুখ ঘুরিয়ে দিলেন ওই লাল বলটার দিকে। তিনি চেয়েছিলেন, ওটা কী, সেটা অনুসরণ করে একবার ভাল করে দেখে আসতে। কিন্তু পিছু নেওয়ার কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই লাল বলটি মহাশূন্যে বিলিন হয়ে গেল। বিমানের জানালা দিয়ে হুমড়ি খেয়ে লাল বলটিকে দেখেছিলেন প্লেনের প্রায় সমস্ত যাত্রীরাই। পরে প্লেন থেকে নেমে তাঁরা বলেছিলেন, আমরা দেখা মাত্রই বুঝতে পেরেছিলাম, ওটা অন্য কিছু নয়। একটা ফ্লাইং সসার।
তাঁদের কথা এবং আরও অনেকের মন্তব্য শুনে রেডিওর বিখ্যাত ভাষ্যকার হেনরি জে টেলর বললেন, ভিন গ্রহ-ট্রহ নয়, এই উড়ন্ত চাকি তৈরি হচ্ছে এই পৃথিবীরই কোনও না-কোনও দেশের এক গোপন ল্যাবরেটরিতে। যিনি বানাচ্ছেন, তাঁর চিন্তাভাবনা সমসাময়িকদের থেকে এত গুণ এগিয়ে যে, সাধারণ মানের বিজ্ঞানীরা হাজার ভেবেও তাই এর কোনও তল খুঁজে পাচ্ছেন না।
এর পর বিভিন্ন দেশে একই সঙ্গে ঝাঁক ঝাঁক ফ্লাইং সসার দেখা যেতে লাগল। শুধু বিদেশেই নয়, ভারতের মুম্বইয়ের আকাশেও উড়ন্ত পিরিচ দেখতে পাওয়া গেল। একজন ব্যবসায়ী বললেন, তিনি স্পষ্ট দেখেছেন, আকাশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে বিপুল বেগে ছুটে যাচ্ছে একটি সসার। না। অত জোরে ছুটলেও তার থেকে কিন্তু কোনও শব্দ বেরোচ্ছিল না। এমনকী তার চলে যাওয়ার পরেও আকাশের বুকে কোনও ধোঁয়ার রেখা দেখা যায়নি।
তাঁরই মতো মুম্বইয়ের আরও অনেক বিশিষ্ট বাসিন্দা স্বচক্ষে ফ্লাইং সসার দেখেছেন বলে দাবি করলেন। মাইকেল জ্যাকব নামে কলেজের এক ছাত্র বললেন, মধ্যরাতে বাথরুমে যাওয়ার সময় হঠাৎ জানলায় চোখ পড়তেই আমি হতবাক হয়ে যাই। দেখি, উজ্জ্বল একটি আকাশযান আকাশের উত্তর দিক ছুটে যাচ্ছে। তার গতি, চলার ভঙ্গিমা এবং তার চেহারা দেখেই আমি বুঝতে পরেছিলান, এটা পৃথিবীর কোনও যান নয়। ভিনগ্রহ থেকে পাঠানো হয়েছে এটা।
মধ্যরাতে ঘুমের চোখে কী দেখতে কী দেখেছে, ভুলভাল বলতেই পারে। কিন্তু তাঁর কথা বিশ্বাস করে নিতেই হল। কারণ, একই সময়ে আলেকজান্দ্রিয়া আর ফ্রাঙ্কফুট শহরের আকাশেও ফ্লাইং সসার উড়তে দেখা গেল। আলেকজান্দ্রিয়ার প্রায় শ’খানেক মানুষ বললেন, তাঁরা একই সঙ্গে সবাই মিলে ফ্লাইং সসার দেখেছেন। ওই আকাশযান থেকে নানা রঙের আলোর বিচ্ছুরণ বেরোচ্ছিল।
কাছেই ছিল বিমানঘাঁটি। সেখানকার কর্মকর্তারাও দেখেছিলেন সেই আলোর ছটা। সঙ্গে সঙ্গে মানমন্দিরে খবর পাঠিয়ে দিলেন তাঁরা। সেখান থেকে দূরবীন দিয়ে যখন ওটাকে দেখার ব্যবস্থা করা হল, তার অনেক আগেই আকাশের বুক থেকে উধাও হয়ে গেল সেই ফ্লাইং সসারটি।
দেখা যেতে লাগল লেবানন, বেইরুট, ফ্রান্স, ক্যামেরুন থেকেও। ক্যারোলিনার আকাশও বাদ পড়ল না। সেখানকার অনেকেই ওই অদ্ভুত যানটিকে দেখলেন। দেখলেন, মনঃস্তত্ত্ব বিভাগের অধ্যক্ষ থেকে নিরাপত্তা বিভাগের প্রধানও। তখন যেন একটা অলিখিত প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে গেছে কোন দেশ কতগুলো ফ্লাইং সসার দেখতে পেয়েছে, তা নিয়ে। যে দেশ যত ফ্লাইং সসার দেখতে পাচ্ছে, সে দেশই তত আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠছে। আর যিনি দেখছেন, তাঁর তো কথাই নেই। মাটিতে পা পড়ছে না। সবাই তাঁর কাছে এসে ভিড় করছেন। জানতে চাইছেন, তিনি ঠিক কী দেখেছেন, সেটা দেখতে কেমন, ওই যান থেকে নেমে এসে কেউ তাঁর সঙ্গে কথা বলেছে কি না। বললেও ঠিক কী কী বলেছে।
উনিশশো সাতষট্টি সালের ঘটনা। ইংলন্ডে এমনিই ভীষণ শীত। তার উপরে অক্টোবর মাস। ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গেই তাঁকে আবার বেরোতে হবে, তাই গাড়ির কাচ তুলে ভিতরেই কম্বল মুড়ি দিয়ে ঘুমোচ্ছিলেন উড ফার্মের কর্মী ক্রিস্টোফার গারনা। এমন সময় দুজন কনস্টেবল এসে তাঁর কাঁচা ঘুম ভাঙিয়ে ডেকে তুললেন। বললেন, দেখুন তো আমরা ভুল দেখছি কি না। উনি ওঁদের কথা মতো গাড়ি থেকে বেরিয়ে আকাশের দিকে তাকাতেই দেখলেন, লাল মতো একটা আলোর পিণ্ড নাচতে নাচতে এগিয়ে চলেছে। যেতে যেতেই সেটার রং হলুদ হয়ে গেল। হলুদ হওয়া মাত্র তা থেকে ফুলঝুরির মতো ছোট ছোট আলোর ফুলকি ছিটকে ছিটকে বেরোতে লাগল। মনে হল, আকাশের বুকে বুঝি আতসবাজির ভেলকি চলেছে। দেখতে দেখতে হঠাৎ সেটা আবার সবুজ হয়ে গেল।
না, একসঙ্গে তিন জনের দৃষ্টি বিভ্রম হতে পারে না। কী ওটা, তাঁদের জানতেই হবে। তাই জীবন বাজি রেখে গাড়ির গতি ঘণ্টায় নব্বই মাইল স্পিডে চালিয়ে ওটার পিছু পিছু ধাওয়া করলেন ওঁরা। কিন্তু ওঁরা যত স্পিড বাড়ালেন, ওই আলোর পিণ্ডটাও ততই দূরে, আরও দূরে সরে যেতে যেতে অদৃশ্য হয়ে গেল। ওঁদের জিপে ওয়্যারলেস ট্রান্সমিটার ছিল। কনস্টেবল দুজন আর এক মুহূর্ত সময় নষ্ট না করে পুরো ব্যাপারটা তাঁদের হেড কোয়ার্টারে জানিয়ে দিলেন। হেড কোয়ার্টার নড়েচড়ে বসল। খবর পেয়ে ছুটে এলেন খবরের কাগজের লোকেরা। গোটা গ্রেট ব্রিটেন জুড়ে শুরু হয়ে গেল তুমুল শোড়গোল এবং একই সঙ্গে আতঙ্ক। সবার মুখেই তখন একটাই কথা। এ বার তা হলে কী হবে! ওরা তো অনেক বুদ্ধিমান! তা হলে কি আমাদের এখানে থাবা বসাবে! আমাদের উপরে কর্তৃত্ব করবে! আমরা পরাধীন হয়ে যাব!
শুধু ওঁরাই নয়, এই ঘটনার পর ইংল্যান্ডের সবাই-ই নাকি উড়ন্ত পিরিচ দেখতে লাগলেন। কিন্তু কে যে সত্যি বলছেন আর কে যে মিথ্যে, বোঝার উপায় নেই। তবে যাঁদের যাঁদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হল, তাঁরা যে কেউই সত্যি বলেননি, তা সহজেই বুঝতে পারা গেল।
ওই দুই কনস্টেবলের মতো ডার্বিশায়ারের একটি পল্লিতে টহল দিচ্ছিলেন দুজন পুলিশ অফিসার। টহল দিতে দিতে হঠাৎ দেখেন আকাশে একটা উজ্জ্বল ক্রশ অতি দ্রুত ছুটে যাচ্ছে। সেটা দেখে তাঁরা ওটার দিকে হা করে তাকিয়ে রইলেন। ব্রাইটনের এক বাস ড্রাইভারও ওটাকে দেখতে দেখতে সাসেক্সের সমুদ্র পারের রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন। এমন বেখেয়ালে হাঁটছিলেন যে, আর একটু হলেই গাড়ির তলায় পড়ছিলেন আর কী।
 আর অ্যাক্সিডেন্ট হলেই সব দোষ গিয়ে পড়ত তাঁ ঘাড়ে। পথচারীর দোষ কেউ দেখত না। গোটা পৃথিবীতেই এই একই নিয়ম। তাই প্রচণ্ড খেপে গেলেন সেই গাড়ির চালক। গাড়ি থেকে নেমে মুখে যা এল বলতে বলতে তাঁর এই অন্ধের মতো হাঁটার কারণ কী, জিজ্ঞেস করতেই তিনি যা বললেন, ড্রাইভার ভদ্রলোক তো একেবারে থ’। তিনিও দেখলেন, আকাশে একটা বিশাল বড় সিগার ঝুলছে। আর তা থেকে মাঝে মধ্যেই অগ্নিস্ফুলিঙ্গ ছিটকে ছিটকে বেরোচ্ছে।

চলবে  —–

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *