বীরভূমের অনালোকিত কবি মাস্টার বনঅলি // তৈমুর খান

https://www.sahityakaal.com

বীরভূম জেলার অনালোকিত এক কবিকে পেলাম। ২০১২ সালে তিনি পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছেন। আজীবন ছিলেন গৃহসন্ন্যাসী। আমার সঙ্গে প্রতিটি মুহূর্তে  সংযোগ রক্ষা করতেন। প্রচুর কবিতা লিখেছেন। উপন্যাস ও ছোটগল্পও লিখেছেন। কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার হলো সারাজীবনে একটাও কাব্য প্রকাশিত হয়নি। জানি না তাঁর পাণ্ডুলিপিগুলি সংরক্ষিত আছে কীনা। পাঠক কি তাঁর কবিতা পড়তে চাইবেন?

.

.

এই কবির নাম মাস্টার বনঅলি। কথাসাহিত্যিক বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায় তাঁকে এই নাম দিয়েছেন।  বনফুল ছিলেন কবির তরুণ বয়সের বন্ধু । নানা চিঠিপত্র আদান-প্রদানও হত তাঁর সাথে। সেই সময়ের আরও বিখ্যাত ব্যক্তিদের সঙ্গেও তাঁর সখ্যতা ছিল। বীরভূমের দুইজন সাহিত্যিক আবদুর রাকিব ও কবিরুল ইসলাম ছিলেন তাঁর সমসাময়িক। দু’জনের সঙ্গেই তাঁর গভীর হৃদ্যতা ছিল। জীবনের শেষপ্রান্তে পৌঁছে আমার সঙ্গেও গভীর সম্পর্ক গড়ে ওঠে।

.

.

১৯৯০ সাল থেকে মৃত্যুর আগে পর্যন্ত (অর্থাৎ ১০ /১১ /২০১২ পর্যন্ত) মাস্টার বনঅলি জীবনের শেষদিন অবধি পোস্টকার্ডেই কবিতা লিখে গেছেন অক্লান্তভাবে। নিজস্ব ঢঙেই কবিতার ইমেজ তৈরি করেছেন। সংশয়ের বার্তা দিয়েছেন। প্রণয়ের শূন্যতা ও হাহাকার লিপিবদ্ধ করেছেন। শব্দ সংকেতে ঝরে পড়ছে জীবনের নানা অভিজ্ঞতা। কবিতার সঙ্গে চিঠিগুলিতে অদ্ভুত কৌশলে নানা চিত্র সৃষ্টি করেছেন।

.

.

তাই চিঠিগুলিও শিল্পীর কারুকার্যে ভিন্নরূপ পেয়েছে। এক আশ্চর্য প্রতিভা নিয়ে জন্মেছিলেন তিনি ; যারা তাঁকে জানেন না, চেনেন না, তারা কিছুতেই তাঁর প্রতিভার দিগন্ত অনুভব করতে পারবেন না। কলকাতার বাইরে যিনি আজীবন নিজেকে লুকিয়ে রাখলেন, একটা কাব্যও প্রকাশ করলেন না, যশ-খ্যাতির মুখে ঝাঁটা মেরে নীরবে চলে গেলেন। কোথাও একটা সংবাদও প্রকাশিত হল না, তাঁর প্রতিভা নিয়ে একটা পংক্তিও কেউ লিখলেন না — সেই বনঅলি গ্রামীণ জীবনের শাশ্বত বীণাটি আজও আমাদের অন্তরে বাজিয়ে চলেছেন।

.

.

তরুণ বয়সে কবি

তাঁর লেখা পোস্টকার্ড থেকে উদ্ধার করা দুটি কবিতা —

মাস্টার বনঅলির দুটি কবিতা ।

ঝাড়বাতি
_______

.

.

আজো বিগলিত ধারায় এমনি একটি রাত কুড়াই
রঙিন ফিতের মতো হাতের শিউলি ফুল ভরে থাকে!
আর পোষমানা আলোকরশ্মি অনেকের ঝাড়বাতি হয়।
আমি পাহাড়ি চোঙান ঘেঁষা আগল ভাঙা নদি দেখি ;
সে-তো পাখির ঠোঁটের কাছে ভাষা নিয়ে গ্যাছে,
ঠিক তোমার মতো খেলার শেষে খেলার বুড়ির মতো কাঁদে।
প্রশমিত ভুরভুরে গন্ধ হাওয়ায় মেশাতে এই নিয়ম ;
আমি নামি কালির দোয়াতের তলানির সেই সিদ্ধিতে।
আমার কলম মন্ত্রপূত নিরীহ পুতুল হয়ে বাস করে।
তবু অনন্যা সধবার একটি সাধনার মতো ভাসান
ৠতুচক্রে বর্ষায়, তারপর শরতের স্নিগ্ধ আকাশ।
পিঁপড়ের সঞ্চয়ী স্নায়ুর পাশে কাশবনে
এরই মাঝে মরা গাছের ছায়ার কেন কলঙ্ক লেপন?
মনে হয় জামদানি শাড়ি পেয়ে রাতে ঝাড়বাতি চায় ।

.

.


কেন
______

যে উষ্ণ ঠোঁটে ডিমের খুলিতে ঠোঁকর খেয়েছে
যে তা খেয়ে খেয়ে দুনিয়া দেখেছে,
সে ফের তাড়া খেল
এবং স্রেফ জেনে গেল
ফাগুন হাওয়ায় শুকনো ডালপালায় ফুল ফুটবে ;
তীর্থের কাক প্রথম তারই কোলে সূর্য দেখেছে
তবু অসহিষ্ণু হৃদয়ে দুর্ঘটনা —
মন জানে না দূর করে দেওয়া
ওই মুখে ফুল চন্দন কেন ফোটে ।

.

.

মাস্টার বনঅলি ওর্ফে অলি আহাদ ফুরকান জন্মগ্রহণ করেন ১৯৪২ সালে বীরভূম জেলার মুরারই থানার খানপুর গ্রামে ।পিতা ছিলেন আবদুর রহমান সততার প্রতীক। মাতা কানিজ ফতিমা ধর্মপ্রাণা মহিলা। যে আদর্শ ও মূল্যবোধ নিয়ে বড়ো হয়েছিলেন, সংসারে সেই মূল্যবোধের প্রতিদান পাননি। বরং আত্মীয় স্বজনদের দ্বারা বঞ্চনার শিকার হয়েছিলেন। কিন্তু সে দুঃখ অনেক সময়ই চেপে রাখার চেষ্টা করতেন।

.

.

কিছু জিজ্ঞেস করলেই বলতেন, “লাও, বিড়ি ধরাও, যা করার তোমার ভাবিই করবে ।” বাংলা সাহিত্য নিয়ে মাস্টার ডিগ্রি করলেও কোনও চাকুরি করেননি। পূর্বপুরুষ জমিদার ছিলেন, সেই আভিজাত্যকে রক্তে আঁচ করেন। ধারা পরিবর্তনের ধারাকে মেনে নিতে পারেন না। কবিতা নিয়ে অনেক পরীক্ষা নিরীক্ষা হলেও তিনি সে পথে হাঁটেন না। লেখেন মনের কথা, মায়ার কথা, অনুভবের কথা আর নিজের কথা।

সবই ছোট ছোট কবিতা। তবে বড়ো গল্প-উপন্যাস ও লিখেছেন। তরুণ বয়সে বহু পত্রিকাতে তাঁর লেখা দেখা গেছে। সঞ্জয় ভট্টাচার্য, সত্যজিৎ রায়, আবুল বাশার প্রমুখ বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে পত্রালাপও ছিল তাঁর। “পূর্বাশা”  পত্রিকার সঙ্গেও নিবিড় সংযোগ ছিল। লিটিল ম্যাগাজিনগুলিতে বহু লেখা প্রকাশিত হলেও কোনও বই প্রকাশিত হয়নি। নির্মোহ এক সংসারী মানুষ হিসেবেই থেকে যেতে চান। তাঁর কবিতাকাননে কোকিল ডাকে নিজের মনেই নীরবে নিভৃতে। “হে আকাশ” নামে একটি কবিতায় তিনি লেখেন —

.

.

“যদি ওই আকাশ মর্তে নেমে আসতো
আর যদি বাতাস দৃষ্টিগোচর হত,
তবে কি মেঘে মেঘে বেলা উঠতো মাথায় ?
বজ্র-ঝটিকা-বৃষ্টি হাতের মুঠোয়
অগোচরে চলতো না কোনও উৎসব,
রাতভাঙা দিন, ক্ষয়িষ্ণুদিন সব —
নারী-পুরুষের বেড়া ভেঙে দিন
ফুসফুসের গভীরে নাকি টানাপোড়েন হত ?
এখনো চোখের টানে মন নিত্য খেলায়
সেই মনোযোগে আকাশে আকাশ সাজাই ।”

.

.

নিসর্গচারী জীবনের আশ্রয়ে আত্মমুক্তির টান তাঁর কবিতায়। অলি আহাদ ফুরকান প্রকৃত নাম তিনি কখনো লেখেননি। মাস্টার বনঅলি নামেই তাঁর পরিচিতি।  তাঁর বহু কবিতা পড়ার সৌভাগ্য হয়েছিল বিভিন্ন পত্রপত্রিকাতেও। ষাট সত্তর দশকের কবিদের মতো তাঁর কবিতা নয়। এক ধরনের অন্তরের আকুতিতে জীবনের সহজিয়া উপলব্ধিকে নিসর্গের কল্পলোকে মুক্তি দিতে চেয়েছেন।

.

.

কবিতা নিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষার অবকাশ কোথায় ? জীবনে সুস্থিরতা নেই, রহস্যময় এক ভাঙনের তীব্র স্রোতে নিজেকে সঁপে দিয়েছেন। অহম্ ভেঙে চূর্ণ হয়ে গেছে। কবিতা তাই নিভৃতির আলো আর বন্দনার একান্ত নির্বেদ মন্ত্র। কখনও তা স্বয়ংক্রিয়তার আলো-ছায়ার অন্তর্মুখী বিন্যাস। আত্মপ্রচার বা যশ-খ্যাতির ঊর্ধ্বে উঠতে পারলে তবেই নিজের মতো কবিতা লেখা সম্ভব। সম্পাদকের বরাত দেওয়া কবিতা নয়, বনঅলি নিজের মতো নিজের জন্যই কবিতা লিখে গেছেন। কোনওদিন প্রত্যাশী হয়ে কলকাতামুখী হতে চাননি।

.

.

বাংলা কবিতার বহুপ্রজ সন্তান-সন্ততি আজ যে সংসার পেতেছে, বহু সংঘ পরিবার, কমিটি তৈরি করেছে তাঁরা হয়তো কোনওদিনই মাস্টার বনঅলির কবিতার কথা ভাববে না। গ্রাম্যজীবনের ধূসর আড়ালে বিস্মৃতির চির অন্ধকারে হয়তো তলিয়ে যাবে, তবু একটি সময়ের নিরীক্ষায় যে ঢেউ উঠেছিল, যে শব্দচাষি একদিন আত্মপ্রত্যয় জাগাতে চেয়েছিলেন অব্যর্থভাবেই তা মুদ্রিত এবং কথিত হয়ে থাকবে।

.

.

  “ভোরে”  নামে একটি কবিতায় বনঅলি লিখেছেন —

“আকাশের নীল রঙ দেখে

যারা সমুদ্র দেখতে এল,

তাদের বলল, সেই মাছেদের কথা

যাদের মূর্তিতে মেয়েমানুষের মুখ”

“ঐ তো” নামে আর একটি কবিতায় লিখেছেন —

“ঐ তো তোমার চোখ কলমের ঠোঁটে,

ঐ তো সে গভীরতা কালিময় দেহে —

বেঁচে ছিল একদিন মৃত কেউ এখানে ;

পাথরের চাঁই নেড়ে কত কথা বলি —

কারো যে বনের আঙুল স্মৃতিবিজড়িত,

কারো ঠোঁটে চামচের উৎকর্ষ ছিল!”’

.

.

বর্ণময় এক রহস্যের ভেতর প্রবৃত্তির এক রূপান্তরের প্রাণধর্ম জেগে ওঠে তাঁর প্রতিটি কবিতায়। বস্তুত নতুন রূপ পায় যা আজকের কবিতায় লক্ষ করা যায়।

.

.

“সে —ঘোমটায়” নামে একটি দীর্ঘ কবিতায় কবি লিখেছেন —

“সে — নাকি এখন পর্দায় দাঁড়িয়ে,

ফুলের গন্ধে মাতাল পাখিদের ডাক

শোনে?

যেন প্রহর গুনে গুনে

ওই হাত-ঘড়ির মতো পরিক্রমা করে !”

.

.

ক্রিয়া তখন বিক্রিয়ায় প্রবেশ করে। “বুনো হাঁসের কাঁখে কলসি”, “দেহের ঘামফুলের গন্ধ”,  “প্রজাপতিপাখনায় জলাশয়” প্রভৃতি চিত্রকল্পগুলি অলৌকিক মৃদু জাদুবাস্তবতায় আমাদের বোধাতীত করে। মনের কথা, মায়ার কথা, অনুভবের কথা, নিজের কথা এভাবেই তাঁর কবিতায় লেখা হয়েছে।

.

.

কবির লেখা চিঠি ও একটি কবিতা

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *