ভরদুপুরে সূর্যোদয় — শর্মিষ্ঠা গুহ রায়(মজুমদার)

tina.guharoy

এম এ পাশ করে সদ্যই বিয়ে হয়েছে গীতাঞ্জলির।বিয়ের পর নিজ শহর হতে বহুদূরে অন্যশহরে বিয়ে হয়েছে তার।স্বামী স্ত্রীর ছোট্ট সংসার।হ্যাঁ,আর একজনের কথা না বললে চলবেই না,সে হল তাদের বাড়ির পরিচারিকা-মধ্যবয়সী এক মহিলা-নাম কমলা।
কমলা অনেকগুলি বাড়িতে কাজ করে।গীতাঞ্জলির বাড়িতে ঢোকে বেলা এগারোটায়।খুব হাঁপাতে হাঁপাতে ঢোকে আর এসেই কাজ শুরু করে দেয়।গীতাঞ্জলি  তাকে রোজই বলে ‘একটু বসে নাও,ফ্যানের তলে বসো কিছুক্ষণ।’ কমলা হেসে বলে-‘নাগো সময় নেই হাতে,আরো দুই বাড়ি বাকি আছে।’
সেদিন এসে কমলা মেঝের উপর বসে পড়ল।গীতাঞ্জলি তখন চাকুরীর পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য বিভিন্ন ম্যাগাজিন গুলো পড়তে ব্যস্ত।কমলা কে দেখে একগাল হেসে বলল-‘আজ বুঝি অন্য বাড়িতে ছুটি?’
কমলা বলল -‘হ্যাঁ গো,তাই একটু জিরিয়ে নিই। তা তুমি এত কী পড়গো সারাদিন?তোমার তো বিয়ে হয়ে গেছে,এখন আবার এত কী পড়াশোনা কর?’
–‘কেন?বিয়ের পরে পড়াশোনা করা যায়না বুঝি?’
–‘না না তা বলিনি,পড়ে কী করবে তুমি?’
–‘চাকরী করব।না পড়লে কে চাকরী দেবে?’
–‘চাকরীর কী দরকার?দাদা তো ভাল চাকরী করে?’
–‘আরেবাবা,আমি নিজের পায়ে দাঁড়াতে চাই।’
–‘দাদাও কী তাই চায়?’
–‘হ্যাঁ গো বাবা হ্যাঁ।’
  কমলা চুপ করে  কিছু চিন্তা করতে থাকে।তারপর হঠাৎ উঠে গিয়ে কাজ শুরু করে দেয়। ঝাড়ুটা এনে ঘরের মাঝখানে দাঁড়ায়। বলতে থাকে- ‘আমার মেয়েদের আমি এত পড়ায়নি।বড়টাকে সাড়ে বারো তে বিয়ে দিলাম।মেজটা চোদ্দোতে পালাল।সেজটাকেও চোদ্দোতে বিয়ে দিয়েছি।ছোটোটাকে নিয়ে খুব চিন্তায় আছি।সতেরোয় পা দিয়েছে।’
   গীতাঞ্জলির মুখ দিয়ে শুধু বেরিয়ে আসে ‘আ্যঁ—–কী বল?এত ছোট বয়সে বিয়ে???’ কমলা নির্বিকার ভাবে বলে -‘আমরা গরীব মানুষ।অত পড়াব কী করে?চারচারটে মেয়ে।’  বলে আবার নিজের কাজ করতে থাকে।
গীতাঞ্জলি দেয়ালের দিকে তাকিয়ে ভাবতে থাকে মা তো তার সারাজীবন পড় পড় করে বকে গেল।ছোটো থেকে বিয়ে বিয়ে করে কোনোদিন কোনো কথাই বলেনি।বরং এম এ পাশ করেই নিজের পছন্দের কথা বাড়িতে জানিয়ে বিয়ে করেছে।তবে এটা মাকে জানিয়ে দিয়েছে যে পড়াশোনা চালিয়ে যাবে যতক্ষণ না ভালো চাকরী পাচ্ছে।আর এরা কোন গ্রহের প্রাণী?বলে কী?মেয়েগুলোর লাইফ বরবাদ করছে মা হয়ে।
গীতাঞ্জলি কমলার পাশে গিয়ে দাঁড়ায়।বলে ওঠে-‘তুমি জানো তুমি কী অপরাধ করেছ?নাবালিকা মেয়েদের বিয়ে দিয়েছ?আবার একই অপরাধ করতে যাচ্ছ।’ কমলা বলে-‘আমাদেরও ঐ বয়সে বিয়ে হয়েছে। শুধু —শুধু—–‘
   —-শুধু মানে কী বলতে চাইছ?
—-‘আমার বোনটার অন্য রাজ্যে বিয়ে হয়েছিল।তার আর খোঁজ পাইনি এযাবৎকাল।খোঁজ নিতে গেলে জানিয়েছিল ও নাকি মারা গেছে।কিন্তু অনেকে বলে ওকে নাকি ওরা বেচে দিয়েছিল অন্য কোথাও।’
—–মাথা ধরে বসে পড়ে গীতাঞ্জলি।উফ্,ও আর শুনতে পারেনা।
কমলা আবার কাজ করতে থাকে।যেন এইসব ঘটনা খুবই সাধারণ।খুব বেশী প্রভাব ফেলেনি ওর বাকি জীবনে।নাকি দুঃখ পাওয়াটাই গা সওয়া হয়ে গেছে।গীতাঞ্জলি বুঝে উঠতে পারেনা।
  গীতাঞ্জলি বসে পড়ে বিছানায়।ওর চোখ দিয়ে তখনো টপটপ্ করে জল পড়ছে।এখন না জানি কী পরম কষ্টে জীবন কাটাচ্ছে কমলার বোন!কমলা কাজ সেরে দরজা খুলে চলে গেল। যাওয়ার আগে বলে গেল -‘দিদি আসছি।’
   আজ ও নতুন করে বুঝল শিক্ষার মর্ম।শিক্ষাই পারে মেয়েদের দুঃখ নিবারণ করতে।এই শিক্ষা শুরু করতে হবে শিশু বয়স থেকে।তবেই দূর হবে কুসংস্কার- বাল্যবিবাহের মত কুপ্রথা।শিক্ষাকে নিজের মধ্যে কুক্ষিগত না করে রেখে ছড়িয়ে দিতে হবে সূর্যের আলোর মত।কাল থেকে নয়,আজ থেকে শুরু করবে ও এক নতুন যাত্রা -ঘরে ঘরে শিক্ষার আলোকে পৌঁছে দেওয়ার যাত্রা।যাতে কমলার বাড়ির মেয়েদের মত অন্যকোনো মেয়ের এই রকম অবস্থা  না হয়।
জানালার ফাঁক দিয়ে ভরদুপুরবেলা গীতাঞ্জলি আজ যেন ভোরের সূর্যোদয় দেখল…….।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *