ভেঙ্গেছ দুয়ার // সুব্রত মজুমদার

Subrata Majumdar

 অরণ্যের গভীরে ছায়াঘেরা একটা গ্রাম, – নিষেধপুর। নামটিও যেমন গ্রামটির তেমন, হাজারো নিষেধের বেড়াজালে আবদ্ধ মানুষ ভুলেছে স্বাধীনভাবে বাঁচার স্বাদ। এ গ্রামের দেবতা মহাকাল শেকলে আবদ্ধ হয়ে পড়ে আছেন যুগ যুগান্ত ধরে। কাল যেখানে বন্দি সেখানে সময়ের চাকা কি করে ঘুরবে ? সভ্যতার অগ্রগতির ধারা তাই স্তব্ধ। 
বহুযুগ আগে ভবিষ্যৎবাণী হয়েছিল – ‘সে আসবে। সে ভেঙ্গে দেবে নিয়মের যত বেড়াজাল, মুক্ত করবে মহাকালকে নিয়মের শেকল হতে। আবার ঘুরবে সভ্যতার চাকা।’ 
কিন্তু প্রকৃতি তো থেমে থাকে না, রাত কাটে, ভোর হয়, পাখি ডাকে, বাতাস জলের উপর খেলা করে। এমনই এক পাখিডাকা সকালে মন্দিরের প্রধানমহান্ত স্থবিরক আর তার শিষ্য ও সেবক মোহক নিভৃতে কথা বলছেন। 
মোহক : এ তো আর সহ্য করা যায় না গুরুদেব, ওরা বলে কি, মহাকালের শেকল ওরা খুলবে ! ঘোর অনাচার।ধর্মে সইবে না। আপনি এর কিছু একটা বিহিত করুন গুরুদেব। 
স্থবিক : আহাহা…. মোহক, তুমি এত উত্তেজিত হচ্ছ কেন ? আমাদের নিয়মের বেড়াজালে মহাকালের চাকা স্তব্ধ, ওই ছোটোলোকগুলো চালাবে মহাকালের রথ ?  সচল করবে মহাকালের চাকা !… 
[ এমন সময় মহাকালের প্রধান পুরোহিত প্রবেশ করলেন। পরনে সাদা পট্টবস্ত্র, কপালে ত্রিপুণ্ড্রক।] 
পুরোহিত : আপনি কিন্তু ওই ছোটোলোকগুলোর দয়াতেই অন্ন বস্ত্র আর মাথার উপর ছাউনিটা জোগাতে পেরেছেন মহান্তজী। ওরা আছে বলেই আপনি নিশ্চিন্তে পরমেশ্বরের নাম নিতে পারেন।
স্থবিরক : খুব হাসালেন ব্রাহ্মণ, ওরা যদি মহাকালের রথের চাকা সচল করে তবে আমাদের ব্যাবসার চাকা চালাবে কে ?  আর এই অপচেষ্টা করলে ওই পতিতদের সাথে তোমাকও পিষে মারবে আমাদের পেষনযন্ত্র। 
পুরোহিত : কতকাল আর পিষবেন মহান্তজী ? সে আসছে, আমি তার ইঙ্গিত পেয়েছি।সেদিন পুজার সময় দেখলাম মহাকালের মূর্তি দুলে উঠল, ঝনঝন করে বেজে উঠল শেকল, কে যেন বলে উঠল…. 
[ যবনিকার আড়াল হতে শোনা গেল গান। গান গাইতে গাইতে এলেন কবি। পরনে তার শতছিন্ন পোষাক, হাতে তার একতারা। সে গান বাঁধে, – জীবনের গান, মানুষের গান।] 
ভয় দিয়ে জয় করবি কি রে হায় ! 
আমাদের ভয়ের শেকল হল বিকল, 
           আর তো কিছু ভয়ের নাই। 
           ভয় দিয়ে জয় করবি কি রে হায় !
পুরোহিত : কবি ভাই…. 
স্থবিরক ও মোহক :  [ রাগত স্বরে ] কবি ! 
কবি :  ভেবে মোদের দাবার বোরে
                           নিলি তোরা সকল হরে, 
          তোদের সর্বগ্রাসী লোভের কাছে মহাকালও অসহায়। 
    (ওরে ) ভয় দিয়ে জয় করবি কি রে হায় !
   জাগবে যেদিন নয়ন মেলে যারা ছিল অবহেলে 
    সেদিন তোদের পাতা ইঁদুরকলে তোরা পড়বি , হয়ে অসহায় । 
      ভয় দিয়ে জয় করবি কি রে হায় !
     ভুলিয়ে মিষ্টবাক্যে বোকা বানাস সকল লোককে, 
    তোদেরও হবে শিক্ষে; শুধরে যা, সময় নাই।
      ভয় দিয়ে জয় করবি কি রে হায় !
পুরোহিত : দারুন কথা বলেছ ভায়া। মহাকালের চাকা যেদিন নড়বে সেদিন সেই চাকার তলায় পিষে মরবে যতভণ্ড আর ধান্দাবাজের দল। 
মোহক : সময়ের চাকার গতি জানো পুরোহিত ? একমাত্র মহান্তজীই পারেন এই চাকার গতিকে নিয়ন্ত্রণ করতে। তিনিই পরমার্থ, পরমদয়াল, পরমপিতা। সমস্ত রোগের ঔষধ তিনি… সমস্ত সমস্যার সমাধান। 
কবি : যিনি মহাকালের চাকাকে আটকে রাখতে পারেন তিনি ক্ষমতাবান অবশ্যই। তবে কি জানো ভাই, কাচের উপর আলো পড়লে কাচকেই স্বপ্রভ লাগে, কিন্তু আলো বন্ধ হয়ে গেলে আবার যে কাচ সেই কাচ। আসল নকলের পার্থক্য যে জানে সে ভ্রমে পড়ে না। 
স্থবিরক : কথাবলার ময়না দেখেছো কবি ? খুব ‘হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ’ করে কিন্তু বিড়ালে ধরলে সেই ‘ক্যাঁ ক্যাঁ’ আওয়াজই বের হয়।
… চলবে 

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *