যুগপুরুষ // তৈমুর খান

https://www.sahityakaal.com

.
.

ধর্মনগর পেরিয়ে যাচ্ছি

পিয়াস ছিল বলছি না তা

চুল ওড়াচ্ছে যদিও হাওয়া

বাউল হয়ে বলছি কথা

.
.

আঁচড়কাটা শরীর জুড়ে কী মুদ্রণ ?

কেউ জানে না, আমিও ছিলাম ভিক্ষাজীবী

বাঁচতে বাঁচতে না বাঁচাতেই

অতর্কিতে পৌঁছে যাচ্ছি নষ্ট একটি পৃথিবী

.
.

চোখের সামনে যা দেখে খুব আহ্লাদিত

কলসি দড়ি ভাঙা খাটে গুছিয়ে জীবন

কুয়োর ধারে সূর্য কুড়োই রোজ একাকী

এমন করে দিন গেল সব সময়বিহীন

.
.

সকালগুলি নৃত্য করলো, আমিও প্রত্যাশিত

গভীর ক্ষত ঢাকতে ঢাকতে ও ফাগুন মাস

অপেক্ষাতে কেঁপে কেঁপে অভিন্ন মুখ

কোকিল কণ্ঠে বাজিয়ে গেলাম এ দূরভাষ

.
.

কাকে যেন ডেকেছিলাম, এখনও ডাকি

ডাকতে ডাকতে চোখের ভাষায় ঝরে পড়ে দূর আমলকী

বিবেক কোথায় ? হাওয়ার নূপুর গড়িয়ে দিলেই

সেই স্কুলমঞ্চ, মঞ্চে মঞ্চে সরস্বতী

.
.

রোদের পাখি উড়ছে কত, ভুলে গেছি মন্ত্রোচ্চারণ

একটি শুধু বিচ্ছিন্ন ঘর, ঘরে ঘরে নিরন্নদিন

উনুন জ্বেলে হাত-পা সেঁকে শীত এসেছে

লেপ-কাঁথা কই? ছেঁড়া তোশক তুলো ওড়ায়

.
.

বাবার দেহে কাশির দমক, ফুলে উঠছে রাতের শিরা

জাগরণের ভেতর কেহ বুলিয়ে দিচ্ছে ঘুমের মায়া

ঘুম নেই কো পড়শি দুয়ার খুলছে কপাট

তার শব্দে কোন্ নিশাচর আঁকতে গেল পরকীয়া

.
.

রাতপাহারায় কে আর থাকে ? চাঁদ গলে যায়

গলাচাঁদে শীত গুলে খায় আমার উঠোন

তালপাতা আর শুকনো নাড়ায় রাতশিহরন দাগ কেটে যায়

অর্ধঘুমের ছোট্ট পাহাড় ডিঙিয়ে জেগে উঠি আবার

.
.

কোথাও ফুল ফুটতে থাকে, দেখি নাকো ফুলের শোভা

লালঠোঁটের পাখি নামে কী সুন্দর নকশি ডানা

দেখি নাকো, কোনও অজানা জ্বরের ঘোরে পুড়তে থাকি

আবার বিকেল, আবার গোধূলি ক্লান্ত করে

.
.

কোন্ উৎসবে কী সহবৎ বুঝি নাকো

পাখির নখে আঁচড় কাটে, ঠোঁটে ঠোঁটে ছেঁড়ে পরাগ

দূরে একা ব্যথার দশক, আমাকে রাখে শূন্যে ঘিরে

কান্না শুকায় শিককাবাবে, নিজের মাংস নিজেই পোড়াই

.
.

নির্জনতা গভীর থেকে গভীরতর উভচরের নেশার মতো

স্বয়ংক্রিয় যাওয়া আসা, আলোআঁধার পাক খেয়ে যায়

স্বপ্নজীবন জীবনস্বপ্নে ঘুমনির্ঘুম ছুটতে থাকে

নদীর ঘাটে স্রোতের মতন ঢেউ ওঠে আর ঢেউ নেমে যায়

.
.

সমস্ত বিষণ্ণকালের জোনাকিরা উড়ে আসে

তাদের মৃদু আলোয় জ্বলে ওঠে যুগের হাওয়া

আমি পাই ঝিকিমিকি অন্ধ আবেগের মায়া

বাঁশপাতা উড়ে যায় কাঁদে বাঁশবন

.
.

প্রদীপে তেল নেই, ইতিহাসের বিষণ্ণ কিশোর

সব পরাজয় নিয়ে চলে যায় নির্বাসন

পিতা তবু অন্ধকারে মেপে নেয় খিদে

ঘাসকাটা জীবনের দুপুর নিভৃতে…

.
.

কাঙাল আঁচলে মুখ মুছতে আসে মায়া

বেঁচে থেকে কারা রোজ দুধভাত খায়  ?

বরং মাটির গন্ধ, বরং মাথায় খালি হাত

অন্তত বেঁধে রাখে ধ্বস, দুর্যোগে ফেরায়

.
.

দিনগুলি ভেসে ওঠে, স্বপ্নের মীনগুলি ডুবে যায়

দুর্যোগের জলে ;  ইক্ষুক্ষেতের পাশে বসে থাকি

হাঁটুতোলা শাড়ি পরে আসে এ পাড়ার রামী

বলতে পারি না তার কাছে অবাধ্য ঘোড়ারা ঘাস চায়

.
.

মীনগুলি ঘাই মারে ; ঢেউ তোলে নিস্ফল হাওয়ায়

তার আলতা মাখা পায়ে আমার অবাধ্যতা নাচে

ইতিহাসের পাশে ধ্বংসাবশেষ গুহালিপি

পড়তে পারি না ; রোজ রোজ এইঘর নির্বাসন পাঠায়

.
.

কতদূর নির্বাসনপুর, যাই আর আসি

নিস্ফলেরা চোখ রাঙায়, দুঃখরা বাজায় বাঁশি

দেখতে দেখতে শুনতে শুনতে পেরোই যুগ

রোজ জন্মাই, রোজ মরে যাই যুগপুরুষ

.
.

হাসি তামাশা খেলতে থাকে, কিছুই রোচে না

ঘরের ভেতর ঘর নেই, বোকা ফাগুন কিছুই বোঝে না

কোকিলকণ্ঠ কল্লোলিনী কিন্নরীরা এখন কোথায় ?

যুগের ভেতর যুগান্ধকার ; ৠতুর ভেতর নষ্ট মাস

.
.

দূরে কারা পায়রা ওড়ায়? পায়রা উড়লে কী হয়?

রক্তাপ্লুত ভারী আকাশ মুখ ঘোরায়

পায়রাগুলি পতাকা হয়, পতাকায় কারা নাম লেখে ?

আমরা নাম লিখব না আর, লিখব না যুগের খাতায়

.
.

তৈমুর খান :  মূলত নব্বই দশকের কবি ও গদ্যকার ।কয়েকটি উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থ হল :  তরঙ্গের লীলায় দেখি মাধুর্যের বসতি, এই ভোর দগ্ধ জানালায়, বৃত্তের ভেতরে জল, নির্বাচিত কবিতা ইত্যাদি। ঠিকানা : রামরামপুর, শান্তিপাড়া, রামপুরহাট, বীরভূম জেলা, পিন কোড ৭৩১২২৪, পশ্চিমবঙ্গ ।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *