রিপু // শ্যামল কুমার রায়

রিপু // শ্যামল কুমার রায়

.

আঁশটে গন্ধটা খুব আদরের রিপুর কাছে। আজ থেকে প্রায় বছর বহু বছর আগের কথা। তখন রিপু অষ্টম শ্রেণির ছাত্র ছিল। যৌবনের প্রথম স্পষ্ট চিহ্নে সে দেহ মনে আলোড়িত ছিল। না, রিপু ফ্রয়েড তখনও পড়েনি। কিন্তু, নিজের চেয়ে বেশি বয়সের মহিলার প্রতি তীব্র আকর্ষণ বোধ করত। না ওকে ইনসেস্ট্ বলা যাবে না। তবে ঐ- ফ্যান্টাসি করতে ছাড়ত না রিপু। বটতলা সাহিত্য গোগ্রাসে গিলে ফেলতেো তখন।

আর একটু বড় হতে না হতেই কখনও ‘প্রজাপতি’ , কখনও ‘বিবর’ , কখনও বা ‘ লেডি চ্যাটার্লিস্ লাভার’ পড়েছে আর সদ্য যৌবনের ডাকে সাড়া দিয়েছে। ও ধরনের বই পাওয়া মাত্রই শেষ করে ছেড়েছে। প্রত্যেকটা গল্পের নায়িকা চরিত্র রিপুর স্বপ্নে এসেছে, ওর সঙ্গে শরীর দুলিয়েছে; আবার কখনো লীলা করেছে ওর সাথে।.

রিপু যেন বুঁদ হয়ে থাকত। ওর এই উদ্দাম যৌবনের প্রতি তীব্র আকর্ষণ বেড়ে যায় ওর বাবার লরি চাপা পড়ে মারা যাবার পর মারা থেকেই। কারণ, কখনো সমীরণকাকু বা আশিক আহমেদের ওদের বাড়িতে দিনে দুপুরে আসা যাওয়া দেখে। তীব্র কৌতুহল হত,এই কাকুরা আগে তো এত আসত না,প্রেম, প্রেম ব্যাপারটা ওর কাছে বেশ জুতসই ছিল না। বরঞ্চ চির গোপনীয়তার ওপারে কি আছে,তার সৌন্দর্যের গভীর দর্শনে ও মগ্ন থাকত। নারী শরীরের বিভঙ্গ ওর চোখে ভেসে বেড়াত।

ওর বছর চৌত্রিশের মায়ের আচরণ ওর কাছে সন্দেহ ডেকে আনত। ঘটনার কালমিনেশন ঘটল এক দুপুরে। সেই কিছুদিন হয়েছে, রিপু ক্লাস নাইনে উঠেছে। বরাবরের ব্যাক বেঞ্চার রিপুদের স্কুলে পরিচালন সমিতির সম্পাদকের আকস্মিক মৃত্যুতে স্কুল ছুটি হয়ে যায়। সেইদিন স্কুল থেকে ফেরার পথে বেশ কিছু মেয়ে দেখে, দুচোখে রঙিন স্বপ্ন নিয়ে বাড়ি ফিরে আসে।

উঠোনে আশিক সাহেবের বাইক,অথচ বাড়ি বেশ শুনশান,রিপুর কৌতুহল বেশ বাড়িয়ে দিল। ঘরের ভেতর থেকে বিলিতি মদের গন্ধ এসে নাকে ঠেকল। মদ অন্ অথচ মদন অফ্- এটা জাস্ট ইমপসেবেল। ওর অনুমান বাস্তবের সঙ্গে হুবহু মিলে গেল। উপসী তমার গায়ে একটা সুতোও ছিল না। আর আশিক আহমেদ সেদিন সদ্য বিধবা তমা ঘোরুই কে ছিড়ে ছিড়ে খাচ্ছিল।.

হাসাহাসি,উদ্দাম দেহ বিলাসের হঠাৎই তাল কেটে গেল, স্থির চোখে রিপুকে সবকিছু দেখতে- তমা আর আশিক আহমেদ যখন দেখে ফেলল।রিপুর চোখে সেদিন তমা অনেকটা নীচে নেমে গেল। পরে লাজ লজ্জার মাথা খেয়ে তমা বলেছিল, ‘আমার এই হালকা বয়েস থেকে শুধু তোর বাবার স্মৃতি আঁকড়ে ধরে জীবন কাটানো সম্ভব নয়। পোষালে থাকবি আর না পোষালে পথ দেখবি।
অসহায় রিপু সব মুখ বুজে মেনে নিয়েছিল। তবে অবশ্য শাপে বর হয়েছিল ওর। সামান্য মাংস ভাতের জন্য ওকে কত চাইতে হতো; আর আজ আশিক আহমেদের বদান্যতায় ঘরে বসে বিরিয়ানি খেল ওরা সবাই। আশিক সাহেব অবশ্য রিপুর হাতে পয়সা দিতেন , হাত খরচা হিসেবে।

সেই সময়ে পেশায় চোরাচালানকারী আশিক আহমেদের অস্টিন গাড়ি ছিল। সেই গাড়ি চেপে ওরা তিনজনে দীঘা গেছিল। ওনার চেনা জানা গেস্ট হাউসে উঠেছিল ওরা। রিপুর আলাদা ঘর। আহমেদ সাহেব আর তমা এক ঘরে। তখন রিপু ক্লাস টুয়েলভ্ এ পড়ত। ওদের এক ঘরে একসাথে দেখতে, এমনকি দিনে দুপুরে নাম মাত্র আড়াল দিয়ে সঙ্গম করতে রিপু বহুবার দেখেছে।
.

সী-বীচ বরাবর রিপু খুব ঘুরে নিল। আঙ্কেল আহমেদের হারামের টাকায় রিপু ওর মায়ের বয়সী বছর আটত্রিশের এক দেহপসারিনীর সঙ্গসুখ অনুভব করল। জোয়ান মরদ-যেন চোখে নেশা লেগে গেল। উগ্র যৌনতার গন্ধযুক্ত গল্প বেশ তারিয়ে তারিয়ে পড়লেও পাঠ্যপুস্তক পড়াতে বরাবরের অমনোযোগী ছিল রিপু। তাই উচ্চ মাধ্যমিকে ব্যাক পেতেই বহু কাঙ্খিত পূর্ণছেদ দিল পড়াশোনাতে।

এদিকে তমা সুন্দরীর সাথে আশিক সাহেবের ফষ্টিনষ্টি তালাক ডেকে আনল আশিক সাহেবের বৈবাহিক জীবনে। যথেষ্ট অবস্থাপন্ন বাড়ির বেটি ফরজনা বেগম ফিরে গেল তার আব্বুর আলিশান বাংলোতে। বিবির চলে যাওয়াতে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত আশিক আহমেদ। এদিকে সমীরণকাকু আশিক আহমেদের আসা যাওয়া দেখে নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছিল।

সমীরণকাকু আসত তখন,যখন রিপুর বাবা বেঁচে ছিল। আলুর লরি নিয়ে রিপুর বাবা অন্যত্র গেলেই সমীরণকাকু আসত। আর রিপু ওর মা তমাকে জিজ্ঞেস করলেই বলত , তোর বাবার বন্ধু তো , তাই খোঁজ খবর নিতে এসেছে। রাতে বাচ্চা বয়েসে পাশের ঘরে একা শুতে খুব ভয় করত রিপুর; আর মায়ের উপর খুব রাগ হতো।

একবার ওর মাকে নিয়ে পাড়ার কটা চ্যাংড়া ছেলে টিপ্পনী কেটেছিল বলে রিপু ওদের সাথে মারামারি করেছিল। তমা বলেছিল, ওসব পচা লোকেদের কথায় তুই কান দিবি না। আর আশিক আহমেদ জাঁদরেল লোক; তৎকালীন শাসকদের সঙ্গে নিত্য উঠা বসা; পাড়ার পুজোয় মোটা চাঁদা দিত। তাই আশিক আহমেদকে কেউ ঘাঁটাত না।.

যাইহোক, পড়ার পাঠ শিকেয় তুলে হাসপাতালে অ্যাম্বুলেন্স এ কাজে ঢুকল। তারপর পাকাপাকি ভাবে অ্যাম্বুলেন্স এ ড্রাইভার হয়ে গেল। একদিন বিকেলে রিপু গাড়ি নিয়ে বাড়িতে চান খাওয়া করতে এল। আর সেই সময়েই পান চিবুতে চিবুতে আশিক সাহেব এলেন। তমা বলে বসল। এবার রিপু কে একটা নিজের অ্যাম্বুলেন্স কিনে দাও।

ডাগর প্রেমিকা,তমার নাগর,আশিক আহমেদ কথা রেখেছিল। ধাপে ধাপে রিপুদের বাড়ির ভোল পাল্টে দিয়েছিল চোরাচালানকারী আশিক আহমেদ। খালি গাড়ি নিয়ে ফেরার পথে হাই রোডে মাঝেসাঝে স্বাদ বদলাতে যেত রিপু।.

লাম্পট্য এখন ওর ধমনীতে ধাবমান। ছেলের বদ খেয়াল বেশ টের পেয়েছিল তমা। তাই সময় থাকতে ছেলের বিয়ে দেয়ার চেষ্টা শুরু করল। বাস্তবের মাটিতে ঠোকর খাওয়া তমা ছেলে বৌ কে বাড়িতে একটা সুস্থ পরিবেশ দিতে বদ্ধপরিকর ছিল। তাই এতদিন যে নাগর দিনে দুপুরে রাতে নিত্যসঙ্গী ছিল, তার সাথে ঝগড়াঝাঁটি শুরু করেছিল।.

শেষে রেপ্ কেসের ভয় দেখিয়ে জাঁদরেল আহমেদ সাহেবের আসা ধাপে ধাপে কমিয়ে বন্ধ করে দিল তমা। তমার এই পরিবর্তন বেশ চোখে ঠেকেছিল রিপুর। মায়ের উপর পুঞ্জীভূত ক্ষোভ প্রশমিত হয়ে গেল রিপুর। পঁচিশ পার হতে না হতেই বেশ দূরে রিপুর শ্বশুর বাড়ি করে দিল তমা। রিপুর স্ত্রী রিপুর চেয়ে বছর পাঁচছয়েক এর ছোট। ঘরোয়া মেয়ে।.

বাবার ছোট্ট ফলের স্টল। বয়স সেই সবে কুড়িতে পা দিয়েছিল। নাম স্বাতী। সঙ্গমে মহা পারঙ্গম রিপুর ফুলশয্যা বেশ রসেবশেই কাটল। চরম তৃপ্ত রিপু আর স্বাতী। রাতভোর রক্তক্ষয়ী নিরাভরণ সংগ্রামে ক্লান্ত পরিশ্রান্ত অথচ তৃপ্ত রিপু – স্বাতীর তাল কাটল; যখন কাক ভোরেই তমা- ‘রিপু, ওঠ। সকাল হয়ে গেছে।’- বলে ডেকে উঠল। মেজাজটা খিঁচে গেল রিপুর। বাড়িতে আত্মীয় স্বজন ছিল, সামলে নিল।
.

বিয়ের লৌকিক আচার অনুষ্ঠান বেশ ভালোভাবেই মিটল। সব কিছুই মধ্যেই কাবাবে হাড্ডির মতো শাশুড়ি মার খিটখিটে মেজাজ,স্বাতীর সব কাজে খুঁত ধরা রিপুর জীবন অতিষ্ঠ করে তুলেছিল। না পারছিল বউকে কিছু বলতে, না পারছিল মাকে কিছু বলতে।
.

অশান্তির প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়েছিল ওদের দাম্পত্যের উপর। এর মধ্যেই স্বাতী ভীষণ উত্যক্ত হচ্ছিল ওর শাশুড়ির নিত্য খুঁত ধরার অভ্যাসের কারণে। ধীরে ধীরে তা সহনশীলতার মাত্রা পার করতে লাগল। রোজ রাতে স্বাতীর এই অভিযোগের ঝাঁপি রিপুরও অসহ্য লাগছিল। শেষে সারাদিন খেটে এসে রিপু সকালের আনাজ কেটে দিত। সাত সকালে উঠে রাস্তার টাইম কল থেকে জল এনে দিত।

এমনকি তিনজনের জামা কাপড় কেচে মেলে দিয়ে যেত। সংসারে শান্তি বজায় রাখার জন্য রিপু কত চেষ্টাই করতে লাগল। ফল হল বিপরীত। পাড়ার কাকিমা, মাসিমা, বৌদিদের কাছে ও বৌ এর ভেড়া বনে গেল। সব থেকে তাজ্জব ব্যাপার হল , এই নিন্দেমন্দ তে ওর মা, তমার প্রত্যক্ষ মদত ছিল। রাস্তায় অ্যাম্বুলেন্স চালাতে চালাতে অন্যমনস্ক হয়ে পরতে লাগল রিপু। একবার তো প্রাণে বেঁচে গেল বরাতের জোরে। স্বামীর কথা ভেবে স্বাতী সব মুখ বুজে সহ্য করে নেবে ঠিক করল।.

বাড়ির এই চাপা উত্তেজনা প্রভাবিত করল ওদের দাম্পত্য সম্পর্ককে। শরীরী সুখের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে বালিশে মুখ গুঁজে রাতে সবার অলক্ষ্যে কাঁদত স্বাতী। আর রিপুর কেমন যেন অনীহা চলে এল যৌনতার উপর। এতদিনের বহুগামী রিপু শরীরী তৃপ্তি নিতে ও দিতে ব্যর্থ হতে লাগল। ফলস্বরূপ, অশান্তি , অশান্তি আর অশান্তি।

কিন্তু, ওর এই পৌরুষ নষ্টের কারণ খুঁজে পেতে রোগী নিয়ে যাওয়ার নাম করে একদিন ষোড়শী গমন করল। অশান্তি মুক্ত সঙ্গসুখ তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করল। নিজেকে আবিষ্কার করল রিপু। এদিকে ঘরে ফিরে দেখে স্বাতীর গায়ে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে মারতে উদ্যত ওর মা তমা। আর কালক্ষেপণ না করে ছোট হাতি ভাড়া করে নূন্যতম দরকারী জিনিস নিয়ে এক কাপড়ে স্বাতীর হাত ধরে পা বাড়াল এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে।.

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *