শয়তানের থাবা – ১০ // সুব্রত মজুমদার

 

https://www.sahityalok.com/
রাইমশাই খুবই বিনয়ী মানুষ। হরিভক্তও খুব। খোল করতাল নিয়ে বসলেন তিনি। দেখতে দেখতে গ্রামের কিছু লোকজন এসে জুটল। রাইমশাই এবার আমার দিকে চেয়ে বললেন, “অপরাধ মার্জনা করবেন, আপনি যদি একটা গান ধরেন তো আসরটা জমে যেত।”   কি করব, গান ধরলাম।
 
 
         সখি হেরি কালোরুপ গেলনাকো দুখ কেবলই বিরহে দহি
         বাঁশরীর তাণে দহে এ পরাণে, (এ) যাতনা কেমনে সহি ?
         ব্রজের গোয়ালা জানে কি পিরিতি ধেনু সনে যার বাস, 
         আমার কপালে কিবা কু লাগিল কালিয়া রচিল রাস।
         ঘরেতে ননদী যেন ন-নদী বিষম জলধি পারা
         লোহিত নয়ন মত্ত আয়াণ, শাশুড়ি বিষের জারা। 
         এ হেন বচনে সুব্রত ভনে ও রাইকিশোরী ধনী
          না কর বিলাপ না কর মনস্তাপ কালিয়া নয়নমণি।। 
 
 
অনেক রাত পর্যন্ত গান-বাজনা চলল।  সবাই চলে যাওয়ার পর ভেতর ঘর হতে খাওয়ার ডাক পড়ল। বাড়ির বারান্দায় খাওয়ার আয়োজন হয়েছে। কাঁসার থালায় সরু চালের ভাত, পুরুপুরু মুগের ডাল, বেগুন ভাজা, পাঁচমেশালি তরকারি আর মাছের ঝোল। সন্ধ্যাবেলায় জেলে ডেকে মাছ ধরিয়েছেন রাইমশাই। 
 
খেতে খেতে অনেক গল্প হলো। খাওয়ার পর বৈঠকখানায় আমার শোয়ার ব্যবস্থা হল। পথশ্রমে ক্লান্ত থাকায় রাতে ঘুমটাও বেশ ভালো হল। সকালে উঠেই চা-মুড়ি খেয়ে রওনা দিলাম। বিদায় নেওয়ার সময় রাইমশাই একটা ধুতি আর পাঁচটা টাকা দিয়ে প্রণাম করলেন। 
 
 
রাস্তায় আবার একটা গ্রাম পড়ল। গ্রামের শেষে পাশাপাশি দুটো পুকুর, পুকুরের জল স্বচ্ছ কাচের মতো। হাতের বাক্সটা নামিয়ে রেখে স্নান করে নিলাম। আসার সময় রাইমশাই কিছু চিড়েমুড়ি আর মণ্ডা দিয়েছিলেন, সেগুলোর সদ্ব্যবহার করলাম। তারপর আবার হাঁটা শুরু। পথ আরো দুর্গম হয়ে আসছে। আমার একদিকে এখন তিস্তা নদী আর অপরদিকে খাড়া পাহাড়। তিস্তার গর্ভদেশ হতে রাস্তার উচ্চতা ক্রমশ বাড়ছে। পথশ্রমে ক্লান্ত হলে রাস্তার ধারে কখনো কোনো গাছের তলায় আবার কখনও কোনো পাথরের চাঁইয়ের উপর বসে বিশ্রাম নিচ্ছি। দিনের আলোও ফুরিয়ে আসছে। 
 
 
একটা জায়গায় রঙ্গিত গিয়ে তিস্তায় মিশেছে, সেখানটা খুবই নির্জন।এদিকে অন্ধকার নেমে এসেছে । এখন আর নিজের অদৃষ্টকে দোষ দিয়ে লাভ নেই, এ সবকিছুর জন্য আমিই দায়ি। আমার উচিত ছিল দুপুরবেলা যে গ্রামটার পেরিয়ে এসেছি সেখানেই আশ্রয় নেওয়া, কিন্তু আর কি করার আছে !  বৃষ্টির কারনে তাপমাত্রা নেমে এসেছে, তার উপরে আছে তিস্তার হাওয়া ।
 
 
বন্য কোন জন্তুর হাতে যদি নাও মরি প্রচণ্ড ঠাণ্ডায় মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী।  এরকম যখন ভাবছি ঠিক তখনই দেখতে পেলাম দূরে জঙ্গলের ভিতরে গাছের আড়াল ভেদ করে একটা ক্ষীণ আলো দেখা যাচ্ছে। এত রাত্রে এরকম দুর্গম জায়গায় আলোর ব্যাপারটা আমার খুব একটা স্বাভাবিক লাগল না। কিন্তু ডুবন্ত লোকের খরকুটোই ভরসা। 
 
 
          সাহসে ভর করে ওই আলোর দিকে এগোতে লাগলাম। কিছুক্ষণ পরেই জঙ্গলের ভেতর একটা অনুচ্চ পাহাড়ের তলায় হাজির হলাম। পাহাড়ের তলদেশে কয়েকটা গাছের আড়াল ভেদ করে আলোটা বেরিয়ে আসছে। আলোর দিকে এগিয়ে যেতেই একটা গুহার মতো কিছু একটা দেখা গেল, ভেতরে মশাল জ্বলছে। আমি অতি সাবধানে ভেতরে ঢুকে এলাম, দেখি একটা সাধু ধুনি জ্বালিয়ে বসে আছে। কাছে আসতেই চিনতে পারলাম, এ সেই সেদিনকার দুপুরের দেখা সাধুবাবা। আমি কাছে গিয়ে প্রনাম করতেই তিনি আশীর্বাদের ভঙ্গি করে বললেন, “তু আ গেয়া ?”
 
 
আমি বললাম, “সিকিম যাচ্ছি বাবা, পথে রাত হয়ে গেল, আপনি না থাকলে আমার যে কি হত..” 
সাধুবাবা মৃদু হেসে বললেন, “তেরা কিস্মত তুঝে ইঁহা লে আয়া, তু তো সির্ফ মোহরা হ্যায়। দেখ বেটা, উও যশেশ্বর  কি তরা মছলি চাওল তো ম্যা নেহি খিলা সাকতা, ভিখমাঙ্গনেবালা হুঁ। “
 
 
 
আমি বললাম, “আপনি যখন সবই জানেন তখন আমি আর কি বলব ! আপনার চরণে আশ্রয় মিলল এটাই অনেক।”  আমি সাধুবাবার কাছে নতি স্বীকার করলাম। আগেরবার যখন সাধুবাবার সাথে প্রথম সাক্ষাৎ হয় তখন সাধুবাবা কে দেখে ভণ্ড বলে ভেবেছিলাম, আজ আর সেরকম মনোভাব আমার নেই।
 
 
….. চলবে 

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *