শয়তানের থাবা – ১১ // সুব্রত মজুমদার

https://www.sahityalok.com/

সাধুবাবা বললেন, “উয়ো কিতাব মে তু জো কুছ পড়া সব সচ হ্যা, ঝুঠ কি কোই গুঞ্জাইস নেহি। উও ন’ লোক আবভি হ্যা।”
আমি চমকে উঠলাম। বললাম, “এখনো জীবিত আছেন মানে..! এতবছর বেঁচে থাকা সম্ভব ? আমি যতদূর জানি ত্রৈলঙ্গ স্বামী সাড়ে তিনশ বছর বেঁচে ছিলেন, তাবলে দু’হাজার বছরেরও বেশি সময় বেঁচে থাকা…… অসম্ভব।

” সাধুবাবা আমার কথা শুনে হাসলেন। কিছুক্ষণ নীরব থাকার পর যা বললেন তার অর্থ এই যে মৃত্যুকে এড়িয়ে বেঁচে থাকার দুরাশা তাদের বিন্দুমাত্র ছিল না। উত্তরাধিকার, উত্তরাধিকার পরম্পরাতেই আজও জীবিত আছেন তারা। আর সেই জ্ঞানের পিছনে পড়েছে মারের সৈন্যরা। কিন্তু জ্ঞানের সন্ধান পেতে হলে পৌঁছতে হবে জ্ঞানের চাবিকাঠিটির কাছে। আমাকে যে ম্যাপটি দেওয়া হয়েছে সেটি সেই জ্ঞানের চাবিকাঠিটির সন্ধান দেবে।
কিছুক্ষণ কথাবার্তা চলার পর সাধুবাবা তার ঝোলা হতে ছাতু বের করলেন। সামান্য লবন দিয়ে মাখা ছাতু, কি অপূর্ব তার স্বাদ ! সঙ্গে গাঁজার বীজের চাটনি। দুজনে খাওয়া দাওয়া সেরে ধুনির পাশে শুয়ে পড়লাম। পথশ্রম আর উদরপূর্তির কারণে খুব তাড়াতাড়ি ঘুম চলে এল।
যখন ঘুম ভাঙল তখন হাতঘড়িতে ভোর পাঁচটা। ঘুম ভেঙ্গে চারদিকটা দেখেই আমার চক্ষুস্থির, সাধুবাবা কই ? সাধুবাবা বা তার ধুনির চিহ্নমাত্রও নেই। ধুনি তো ধুনি, আমি যেখানে শুয়ে আছি সেখানটা একটা শ্মশানভূমি, চারদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে মড়ার হাড়গোড় ভাঙ্গা কলসি আর ছাইয়ের স্তুপ। এ কোথায় এলাম আমি ? চোখ কচলাবার জন্য হাতটা মুখের কাছে আনতেই নাকে এল ছাতু আর গাঁজা বীজের চাটনির ঘ্রাণ।
উঠে দাঁড়ালাম। চারদিকে ভালো করে দেখতেই বুঝতে পারলাম শ্মশানের পাশে যে পাহাড় আছে সেটা পেরোলেই কোনো জনবসতি পাওয়া যাবে। শ্মশান হতে একটা সরু রাস্তা পাহাড়ের গা বেয়ে উঠে গেছে। যেহেতু আমি পথ হারিয়েছি তাই ওই জনবসতিতে পৌঁছানোই বুদ্ধিমানের কাজ হবে। হাঁটতে লাগলাম।
রাস্তা বরাবর হাঁটতে লাগলাম। পাকদণ্ডী বেয়ে উঠে যেতেই পাহাড়ের অপরদিকে কতগুলো কাঠের বাড়ি চোখে পড়ল। পাহাড়ের গায়ে ঘরগুলোকে ছবির মতো লাগছিল। কাছাকাছি যেতেই একজন বৃদ্ধ আমার দিকে এগিয়ে এলেন । বেঁটেখাটো, মুখমণ্ডলে মঙ্গোলয়েড ছাপ স্পষ্ট। তিনি বললেন, “আসুন সাবজী, আপনার জন্যেই অপেক্ষা করছিলাম। ভেতরে আসুন। ধীর সে… “
অবাক হলাম, বলে কি লোকটা, আমার জন্য অপেক্ষা করছিল ! কি সব হচ্ছে !
আমার মাথাটা আর কাজ করছে না। সব তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছে। যাইহোক বৃদ্ধের পেছন পেছন একটা কাঠের ব্রিজ পেরিয়ে দোতলা একটা কাঠের বাড়ির সামনে হাজির হলাম। বাড়িটার রং কিঞ্চিৎ চটে গেছে, ছাদের উপরে তিব্বতি ভাষায় মন্ত্রলেখা পতাকাগুলো উড়ছে। কাঠের সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় উঠলাম। দোতলার উপরে কাঠের একটা তক্তপোষে আধময়লা বিছানা পাতা, দেওয়ালে বোধিসত্ত্ব ও ভৈরবের ছবি আঁকা।
কিছু জিজ্ঞাসা করার আগেই বৃদ্ধ বলল, ” নিঁদমে খোয়াব আয়াথা। খোয়াবেই নংগালামা আপনার কথা বলল। বলল কি আপনি তকলিফে আছেন, আপনার দেখভাল কোরতে হোবে।”
আমি বললাম, “আপনার ‘নাংগা লামা’ কে তা আমি জানি না, তবে কাল রাতে এক সাধুবাবা আমাকে আশ্রয় দিয়েছিলেন।” এরপর আমি তাকে কাল রাতের সমস্ত ঘটনা বললাম। সব শুনে বৃদ্ধ তার দু’কানে হাত দিয়ে জিভ কেটে বললেন,” ওহি তো নাংগা লামা আছে। ভগবান আছে সাব। আপনি খুব ভাগ্যবান আছেন যে উনকি দর্শন পাঠিয়েছেন। “
এরপর বৃদ্ধ যা শোনালো তা অত্যন্ত লোমহর্ষক। এই নাংগা লামাকে একমাত্র স্বপ্নে ছাড়া বাস্তবে কেউই দেখেনি। এই এলাকার প্রত্যেক বাড়িতে তাঁর পূজা হয়। ইনি কৈলাশ পাহাড়ে বাস করেন, তবে শিব ঠাকুরের বারণ থাকায় কৈলাশের প্রবেশদ্বারের বাইরেই থাকতে হয়।
এই প্রসঙ্গে বলে রাখি যে কৈলাশ পর্বত মানুষের অগম্য। কোনও জীবিত প্রাণী কৈলাশে পা রাখতে পারেনি। হিন্দু, বৌদ্ধ, জৈন ও তাও ধর্মে এই পর্বত খুবই পবিত্র। কথিত আছে একমাত্র একজনই কৈলাশে পা রাখতে পেরেছিলেন, তিনি হলেন তিব্বতি কবি ও সাধক ‘জেৎসুন মিলারেপা’ ( རྗེ་བཙུན་མི་ལ་རས་པ ) । ইনি একজন সিদ্ধ তান্ত্রিক ছিলেন। গোটা তিব্বত ও সিকিমে তিনি ভগবানের মতো পূজা পান। এই মিলারেপার গুরু ছিলেন মারপা, যিনি বাঙালি তান্ত্রিক সাধক শ্রীজ্ঞান অতীশের শিষ্য দ্রমশনের প্রবর্তিত বঙ্গীয় তন্ত্র সাধনার ধারা মেনে চলতেন।
বৃদ্ধ দেওয়ালের একটা কোণে একটা দেওয়াল চিত্র দেখিয়ে বললেন, “এ হে নাংগা লামা।”
আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলাম, এ তো একদম অবিকল আমার দেখা সেই সাধুবাবা। অজান্তেই আমার দু’হাত জোড় হয়ে এল শ্রদ্ধায়।
বৃদ্ধের বাড়িতে সেদিনটা থাকলাম। চিঁড়ের সাথে টম্যাটো স্যুপ আর লাল রঙের ঝোলশুদ্ধ ভেড়ার মাংস দিয়ে মধ্যাহ্নভোজ সারলাম। সারাদিন ঘুমোলাম, শরীরের সব ক্লান্তি যেন ঘুচে গেল। রাত্রিবেলায় চিনা মাটির পাত্রে করে এল ভেড়ার মাংস আর গরম গরম চাপাটি সঙ্গে তিব্বতি চা।
এই তিব্বতি চায়ের বিশেষত্ব হল এটি আদপেই কোনো পানীয় নয়। ইটের মতো আকার দেওয়া শুকনো চা কে গুঁড়ো করে গরম জলে মেশানো হয়, তারপর সেই মিশ্রণে মাখন, ভেড়ার মাংস নুডলস আর লবণ মিশিয়ে রান্না করা হয়। এটা খেতে খুব সুস্বাদু না হলেও বেশ পুষ্টিকর আর শক্তিবর্ধক।
পরেরদিন সকালে বৃদ্ধ আমাকে একটা খচ্চরের পিঠে বসিয়ে দিলেন। সঙ্গে চলল গ্রামেরই একটা ছেলে, – তাসি।
ছবি – লেখক
…. চলবে

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *