সাহিত্যের অক্লান্ত পথিক নূরুল ইসলাম // তৈমুর খান

https://www.sahityakaal.com
কাকে সাহিত্য বলে, কেমন লিখলে সাম্প্রতিক কালের সাহিত্য হয়, আমার লেখা আদৌ লোকে পড়ে কিনা এসব ভাববার আমার সময় নেই। একটা পত্রিকা আছে তিন মাস অন্তর তা প্রকাশ করতে হবে। পত্রিকার জন্য লেখা সংগ্রহ করতে হবে। যে লিখতে চায় তার কাছ থেকেই লেখা নিতে আপত্তি নেই। শুধু পত্রিকাকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য কিছু অর্থ সাহায্য দিলেই হবে। প্রতিবছর মার্চ মাসের অনুষ্ঠানে আমরা একজনকে সম্বর্ধনা দিই। এটাই আমাদের রীতি।

.

.

এইসব কথাবার্তা শুনতে বেশ ভালোই লাগলো।  যে একটানা এইসব বলে গেলেন তাঁর বয়স প্রায় ৮৬ বছর। এখনও টাট্টু ঘোড়ার মতো এখানে সেখানে ছুটে বেড়ান। নিখিল বঙ্গ সাহিত্য সম্মেলনে ডাক পেলে ভিন রাজ্যে যেতেও পিছু পা হন না। সারাজীবন প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেছেন। অবসর জীবনে সমস্ত সময় ব্যয় করেন এই সাহিত্যের পেছনেই। আজ শিক্ষক দিবসে অনেকক্ষণ তাঁর সঙ্গেই কাটালাম।

.

.

 হ্যাঁ, তাঁর নাম নূরুল ইসলাম। জন্ম গ্রহণ করেছেন ১৬ পৌষ ১৩৪০ বঙ্গাব্দে, মুর্শিদাবাদ জেলার পাঁচগ্রাম অঞ্চলের খড়িকাডাঙা গ্রামে। পিতার নাম কাজি কুতুবউদ্দিন আহম্মদ এবং মাতা হলেন মেহেরুন্নেসা বেগম। জঙ্গিপুর মহাবিদ্যালয় থেকে বি এ পাশ করে শিক্ষক হিসেবেই কাজে যোগদান করেন। ছোটবেলা থেকেই সাহিত্যের প্রতি গভীর অনুরাগ জন্মায়। এই শেষ বয়সে এসেও একবিন্দু ভাটা পড়েনি। জীবনে অনেক সম্মান ও সম্বর্ধনা পেয়েছেন।

.

.

বাংলাদেশ থেকেও ডাক এসেছে। তবে মূলত গ্রাম এবং গ্রাম্যজীবনেই তিনি বেশি স্বচ্ছন্দ বোধ করেন । মেট্রো শহর ও আধুনিক সভ্যতার মানুষের জটিলতায় তিনি মিশতে চান না। ধুলো ওড়া বেগুন বিক্রি করা মানুষ, ঘাম ঝরা চাষি, হাঁটুর উপর কাপড় তুলে মাটি কাটা মেঝেন অথবা গো-রাখানের গান গেয়ে বাড়ি ফেরা এসব দেখেই তিনি অভ্যস্ত। নিজে যেমন ছলনা বোঝেন না, তেমনি অন্যের সারল্যকেও স্পর্শ করতে পারেন।

.

.

মাটির দাওয়ায় বসে এখনও ভেজা ভাত খেতে ভালবাসেন। তরকারি না থাকলে কাঁচা পেঁয়াজ আর লংকাই যথেষ্ট। বেশি কিছু চাওয়ার ও পাওয়ার তাঁর নেই। ভালবেসে মনের আনন্দে লেখেন, তা সাহিত্য হোক আর না হোক কারও ধার ধারেন না। এতেই তিনি নীরোগ থাকেন। নিজেকে নিজের কাছে মুক্তি দেন।

.

.

    মফস্সলের প্রেস থেকে তিনি বেশ কয়েকটি বইও প্রকাশ করেছেন। বেশিরভাগই সেগুলি কাব্যগ্রন্থ :  “স্বপ্নদ্যুতি”, “সুরের মূর্ছনা”, “সুফি সম্রাট নিজামী”, “জীবন সুরের মালা”, “অভিশপ্ত জীবন”, “বিলবসিয়া মা ঠাকরুণ”, “স্মৃতির জানালা খুলে”, “রক্তের মিছিল”,“দুরন্ত পিপাসা”এবং “নদীর তীরে সূর্যাস্ত”  সম্প্রতি প্রকাশিত একটি গল্প সংকলন।

.

.

তাঁর কাব্যগ্রন্থগুলি বেশিরভাগই প্রাচীন ধারার বাইরে যেতে পারেনি। রবীন্দ্রনাথের পরে আর কোনও কবি আছেন এটা তাঁর কবিতা পড়ে বোঝা যায় না। তিনি নিজবৃত্তেই অবস্থান করতে ভালবাসেন। তাই কবিতাগুলিতে ছন্দ, আঙ্গিক, শব্দ ব্যবহারে বৈচিত্র্য চোখে পড়ে না।

.

.

তৎসম ও তদ্ভব শব্দের ব্যবহারই বেশি। ছন্দ বলতে পয়ার অক্ষরবৃত্ত। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বিবৃতি ও বক্তব্যের প্রাধান্য। তবে গল্পগুলিতে লেখকের মানবিক দায়টিই বড়ো হয়ে উঠেছে। প্রাচীন রীতিতেই তিনি ঠাকু-মা অথবা ঠাকু-দার মতো গল্প বলেছেন। গ্রাম্যজীবনের সারল্য ও বিশ্বাস ভঙ্গের কথা তাঁর গল্পের মর্মকথা।

.

.

সম্পত্তির ভাগবাঁটোয়ারা নিয়ে কলহবিবাদ, পুরোনো গৌরবকাহিনির স্মৃতিচারণ, মানবিক উপকারের কাহিনি, ঈশ্বর বিশ্বাসের ফল, হাতদেখানো বা জ্যোতিষ চর্চা,নারীপুরুষের প্রেমের কাহিনি, গরিব মানুষের সততা প্রভৃতি বিভিন্ন বিষয় নিয়েই তিনি ভেবেছেন। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই উত্তমপুরুষের কথাবার্তায় গল্পগুলির নায়ক নায়িকা বর্তমান।

.

.

  এভাবে বিচার করলে একটা মানুষের দীর্ঘজীবনের মূল্যায়নকে হয়তো তেমন কিছু মূল্যবান বলে মনে হবে না। কিন্তু তিনি যে আবহ বা সংযোগ ও সংগঠন তৈরি করেছেন, তা ক’জন পারেন? দৃষ্টান্ত স্থাপন না করতে পারলেও তিনি অনুভূতিকে সঞ্চারিত করার, সাহিত্যকে ভালবাসার, সুস্থ সংস্কৃতিকে তুলে আনার এবং সাহিত্যিককে শ্রদ্ধা করার কাজটি করে চলেছেন।

.

.

আজকের দিনে যুবক-যুবতীরা মোবাইল, ইন্টারনেট, ফেসবুক, টুইটারে সময় কাটায়। না পড়ে প্রাচীন সাহিত্য, না জানে সাম্প্রতিক সাহিত্যের পরীক্ষা নিরীক্ষার বাঁকগুলি । পর্নগ্রাফিতেই তারা বেশি আসক্ত। বাংলা ভাষাও তাঁদের কাছে অবহেলার বিষয়। এই জটিল সময়ে বসবাস করেও নূরুল ইসলাম নিরলসভাবে সাহিত্য সেবায় নিজেকে সংযুক্ত রেখেছেন — এটা কি কম কথা ? তিনি যাই লিখুন, “দ্বাদশাঞ্জলি”  নামে ত্রৈমাসিক যে পত্রিকাটি বের করেন, তাতে কমপক্ষে প্রতিসংখ্যায় শ’খানেক লেখক-লেখিকার লেখা প্রকাশ করেন। হয়তো মানের দিক দিয়ে সেগুলি উন্নত নয় ঠিকই, কিন্তু কিছুটা সাহিত্য মনস্ক করে তোলার দীক্ষা তারা লাভ করে।

.

.

রাজনীতি আর অপসংস্কৃতির চাপে গ্রামবাংলার যখন নাভিশ্বাস অবস্থা, তখন নূরুল ইসলাম বিশুদ্ধ বাতাসের ফেরিওয়ালা স্বরূপ। তাঁর যে সততা, সরলতা, অহংকারহীনতা সম্বল তা যে কোনও মানুষকেই আকৃষ্ট করবে। তাঁর ব্যবহারের মাধুর্য ও আন্তরিকতার স্পর্শ পেতে তাই অনেকেই তাঁর ডাক উপেক্ষা করতে পারেন না। পাঁচগ্রামের বাৎসরিক সাহিত্য অনুষ্ঠানে অনেকেই উপস্থিত থাকেন। আমরাও কি পারি না নব্বই এর কাছাকাছি পৌছানো মানুষটিকে একটু সহানুভূতি দেখাতে ?

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *