সিংহবাহিনী রহস্য // পর্ব – ২ // সুব্রত মজুমদার

 

ঠাকুরদালানটির সামনে একটা বিশাল বারান্দা, বারান্দার পর গর্ভ মন্দির তিনটি ভাগে বিভক্ত। মাঝের ঘরটি মা সিংহবাহিনীর। এর একপাশে শালগ্রামশীলা শ্রীধর ও অন্যপাশে ভোগঘর। শ্রীধরের স্নান পুজা শেষে মা সিংহবাহিনীকে  স্নান করাচ্ছেন ঠাকুরমশাই।
আমরা প্রণাম করে বেরিয়েই যাচ্ছি, এমনসময় একটা আর্তচিৎকার ভেঁসে এল।
ঠাকুরমশাইয়ের চিৎকার ।পেছন ফিরে দেখলাম ঠাকুরমশাই উবু হয়ে পড়ে আছেন আর তার নাকমুখ দিয়ে গলগল করে রক্ত বের হচ্ছে। সবাই মিলে ধরাধরি করে ঠাকুরমশাইকে বারান্দায় আনা হলো। হাইস্পিড ফ্যান চালিয়ে দেওয়া হল মাথার গোড়ায়। দেবলীনা পরীক্ষা নিরীক্ষা করে বলল, “আতঙ্কের কিচ্ছু নেই, সাময়িক ব্লাডপ্রেসারটা বেড়ে যাওয়াতে নাকের একটা ভেইন ছিঁড়ে গিয়েছে।”
ঠাকুরমশাইকে ওষুধপত্র দেওয়া হল। আমরা গিয়ে উঠলাম দোতলার একটা রুমে। পাশাপাশি দুটো রুমের ছোটটাতে দেবলীনা ও বড় রুমটাতে আমাদের দুজনের ব্যবস্থা হলো।
কাপড়জামা ছাড়তে ছাড়তে বিক্রম বলল,” Something wrong সায়ক, কিছু একটা গণ্ডগোল আছে । ঠাকুরদালানে যতক্ষণ ছিলাম ততক্ষণ একটা অদ্ভুত ফিলিংস হচ্ছিল, চিন্তাভাবনা বুদ্ধি সবকিছুই যেন তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছিল।”
“অনুভূতিটা আমারও হয়েছে বিক্রম। যেন চারপাশ হত কেউ আমার মাথাটাকে চেপে ধরেছে। সঙ্গে ছিল একটা বমি বমি ভাব ।  ” আমি বললাম।
বিক্রম একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে গুম হয়ে গেল। কিছুক্ষণ কি যেন ভাবলো, তারপর বলল,” ওসব এখন থাক, যেখানেই যাই একটা না একটা সমস্যা লেগেই থাকে। এখন শুধু মৌজ আর মস্তি। ” কথাগুলো বলেই দরজার দিকে তাকাল বিক্রম। তারপর গম্ভীর গলায় বলল,” কে ওখানে ? দরজার আড়ালে কে ?”
দরজার আড়াল হতে বেরিয়ে এলো বেঁটেখাটো একটা লোক, পরনে খাটো ধুতি আর ফুলহাতা সাদা গেঞ্জি। বেরিয়ে এসেই মিনমিনে গলায় বলল,” আজ্ঞে, আমি ফটিক, এ বাড়িতে কাজ করি। মেজোদাদাবাবু বললেন আপনাদের নিচে নিয়ে যেতে। ওখানে খাওয়ার ব্যবস্থা হয়েছে।”   বুঝলাম জলখাবারের ডাক এসেছে। কিন্তু বিক্রমের মনে সন্তুষ্টি দেখা গেল না।
নিচে গ্রাম্যস্টাইলে শামিয়ানার তলায় চট পেতে খাওয়ার ব্যবস্থা হয়েছে । লুচি, আলুর দম, বোঁদে আর রাজভোগ। খেতে খেতে বিক্রম তার অনুভূতির কথা বললো। শুনে অঘোরবাবু কিছুক্ষণ চুপকরে রইলেন।তারপর বললেন, “ব্যাপারটা যে আমিও লক্ষ্য করিনি তা নয় মশাই। ছোটোবেলায় মায়ের মুখে শুনেছি মহালয়ার পর হতেই ঠাকুরদালানে গেলে গা ছমছম করে, নিজে কোনোদিনও উপলব্ধি করিনি। তবে এবার এসে অব্দি ওরকমই অনুভূতি হচ্ছে।”
দেবলীনা বলল, “ঠাকুরদালানের আশেপাশে মোবাইল নেটওয়ার্কও কাজ করছে না। আমি তো বাইরে গিয়ে তবে বাপীর সঙ্গে কথা বললাম। “
” হুমম্.. মানে জ্যামার জাতীয় কিছু একটা অ্যাক্টিভ আছে। বিপুলা এ ধরনীর কতটুকু জানি ! অনেককিছুই তোমার জ্ঞানের বাইরে হোরাশিও। ” বিক্রম লুচির একটা টুকরো মুখে চালান করতে করতে বলল।
অঘোরবাবু বললেন,” জানার কি শেষ আছে মশাই, তবে আমার দিন প্রায় শেষ হয়ে এলো। এবছর আমার পালা পড়েছে, পুজোটা উতরে দিতে হবে। “
” আপনাদের তাহলে অষ্টধাতুর ওই সিংহবাহিনী মূর্তিতেই পুজো হয়.., মৃণ্ময়ী প্রতিমা হয় না.. । “
দেবলীনা অঘোরবাবুর দিকে তাকিয়ে কৌতুহল প্রকাশ করল। অঘোরবাবু দেবলীনার কথাটা শেষ হবার আগেই বলে উঠলেন,” আগে আলাদা ভাবে প্রতিমা হতো না, তবে আমার দাদামশাইয়ের আমল হতে প্রতিমা হয়। ওই ঠাকুরদালানের পেছনে তৈরি হচ্ছে.. খাওয়ার পর দেখিয়ে আনব । আসলে আমার বাবা ছোটবেলা হতেই খুব রুগ্ন ছিলেন। একবার এমন অসুখ হলো যে প্রায় মরোমরো অবস্থা।
এক তান্ত্রিকের পরামর্শে আমার দাদামশাই মাটির দেবী মূর্তি গড়ে তান্ত্রিক উপায়ে পুজো করেন। সেদিন হতেই এই পুজো চলে আসছে। তবে মা সিংহবাহিনীর যথারীতি পুজো হয় আলাদাভাবে। “
খাওয়া দাওয়ার পর অঘোরবাবুর সঙ্গে গেলাম ঠাকুরদালানের পেছনে। পালমশাই মূর্তির গায়ে অলঙ্কার পরিয়ে দিচ্ছেন। আজকের মধ্যেই সবকিছু কমপ্লিট করতে হবে। অঘোরবাবুকে দেখতে পেয়ে পালমশাই বললেন,”ওই ইঞ্জিনটাকে সামলে রাখুন কত্তা, নইলে দেবীর কোপে ও বাঁচবে না। “
বিক্রম বলল, “ইঞ্জিনটা কে অঘোরবাবু ?”
অঘোরবাবুর কিছু জবাব দেওয়ার আগেই পালমশাই বললেন, “কত্তাবাবুর দাদার ছেলে। ভীষণ ধড়িবাজ, বাপ মারা যাওয়ার পর থেকে চাকরি বাকরি ছেড়ে পেরেত চর্চা করছেন।” পাল মশাইয়ের কথায় একটা বিরক্তি মেশানো রাগ প্রকাশ পেল।
অঘোরবাবু বললেন, “অর্ঘ্য, আমার দাদার ছেলে। ইঞ্জিনিয়ার মশাই । দাদা মারা যাওয়ার পর আমেরিকার ভালো চাকরি ছেড়ে দিয়ে এখানে বসে আছে। বললে বলে গবেষণা করছে। দাদা যতদিন বেঁচে ছিলেন ততদিন বাপ ছেলেতে বনিবনা হত না মশাই। তবে কারণটা জানি না।”
“ঠাকুরমশাই এখন কেমন আছেন দেবলীনা ?”   বিক্রম দেবলীনার দিকে তাকাল। দেবলীনা বলল,” একটু আগেই আমি দেখে এসেছি। এখন সুস্থ্য আছেন।”
অঘোরবাবু মূর্তির সামনে দুহাতে মাথা চেপে ধরে  বসে পড়লেন। তারপর হতাশ কণ্ঠে বললেন,”ঠাকুরমশাইয়ের ঘটনার পর আমার আর কিছু ভালো লাগছে না। আমার মাথায় এখন একটাই চিন্তা, কি করে নির্বিঘ্নে মায়ের পুজো সম্পন্ন হবে !”
বিক্রম আর দেবলীনা অঘোরবাবুর পাশে এসে বসলো । অঘোরবাবু কেঁদে ফেললেন। বিক্রম বলল, “আপনি কিছু চিন্তা করবেন না অঘোরবাবু, আমি যতক্ষণ আছি ততক্ষণ আপনি নিশ্চিন্তে থাকতে পারেন।”
সন্ধ্যাবেলায় উঠোনে শতরঞ্জি পেতে চলল শারদ আড্ডা। পুরোহিত মশাই সপ্তশতি হতে আবৃত্তি করলেন। দেবলীনা গাইল গান। সবশেষে ধরা হল বিক্রমকে। বিক্রম বলল, “মা সরস্বতী আমার জিহ্বা ত্যাগ করেছেন। আমাকে এসব ঝামেলায় ফেলো না। তারচেয়ে ওই আকাশের দিকে দেখ, কি সুন্দর পরিস্কার আকাশ, তারারা ঝিকিমিকি করছে।”
আমি আকাশের দিকে তাকালাম। একে শরৎ কালের আকাশ তাতে আবার আজ শুক্লা পঞ্চমী, আকাশ যেন হাজার তারার মালায় সেজে উঠেছে। বিক্রমও মোহমুগ্ধের মতো আকাশের দিকে তাকিয়ে রইল। কিন্তু হঠাৎ ওর কপালে দুটো ভাঁজ দেখা গেল। আকাশের দিকে তাকিয়েই অঘোরবাবুকে বলল,” অঘোরবাবু, আপনি তো আকাশ বিষয়ে অভিজ্ঞ। ওই পুবের কোনণটায় একটু দেখুন তো।”
অঘোরবাবু পুবের কোণে দৃষ্টিনিক্ষেপ করে বললেন, “ছোটবেলায় আমার বাবা আমাকে আকাশের তারাগুলো চেনাতেন; – কোনটা সপ্তর্ষিমণ্ডল, কোনটা ক্যাসিওপিয়া…. সেথেকেই আকাশ দেখাটা আমার অভ্যাস। আর তা হতেই অভিজ্ঞতা মশাই। হুঁ.. হুঁ… উঁ… ঠিক ঠিক। ওই তারাটা তো ওখানে ছিল না মশাই। ওটা হয় কোনও নতুন তারা নাহয় অন্যকিছু।”
বিক্রম একছুটে দোতলায় গিয়ে বাইনোকুলারটা নিয়ে এল। এরপর অনেকক্ষণ পর্যবেক্ষণ করে বলল,” ইউ আর রাইট অঘোরবাবু। ওটা তারা নয়, কোনও স্যাটেলাইট অথবা বেলুন । ওটা হতে একটা আলো বারবার ব্লিঙ্ক করে সংকেত পাঠাচ্ছে। দেবলীনা, তোমার মোবাইলে রেকর্ড করে নাও। খুব স্পষ্ট না হলেও ডিকোড করতে পারবো আশাকরি।”
.
(চলবে )

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *