সুমিতার একদিন // ঋত্বিক ভট্টাচার্য্য

কদিন ধরেই একটা স্বপ্ন দেখে ঘুম ভেঙে যাচ্ছে সুমিতার। কি যে হয়েছে তার। একটু শান্তি চাই তার। একদিন ছুটি নিল অফিস থেকে। নিজের মতো কাটাবে একটা দিন। থাকবে নিজের মত, স্বাধীন হয়ে। ছোটগল্প– সুমিতার একদিন।
https://www.sahityalok.com/

 সুমিতার একদিন
                                                                                       
“অন্য কেউ সামনে থাকলে একদম আমার গায়ে হাত তুলবেনা বলছি”, দেওয়ালে কোণঠাসা অবস্থায় বিড়বিড় করে উঠল সুমিতা। সঙ্গে সঙ্গে গাল দুটো টিপে ধরে সুমিতার মাথাটা পিছনের দেওয়ালে ঠুকে দিল তমাল। তমালের মা দরজায় দাঁড়িয়ে টিপ্পনী কাটল,”অন্য কেউ বলতে আমাকে বলছে রে”।; ব্যস, আবার এলোপাথাড়ি চড় থাপ্পড়– চোখে অন্ধকার দেখতে দেখতে পড়ে যাচ্ছিল সুমিতা।
ঘুমটা ভেঙে গেল ঠিক এই জায়গায়। এই স্বপ্নটা মাঝে মাঝেই ও দেখে। ঢকঢক করে জল খেল অনেকটা। রাত তিনটে। সকাল হতে ঢের দেরী। কিন্তু ঘুম আসতে চায়না এমন হলে। সুমিতা মুখ চোখে জল দিয়ে আবার শোওয়ার চেষ্টা করে। মনটা ভারী হয়ে আছে।কাঁদতে ইচ্ছেও করেনা আজকাল। স্বপ্নগুলো কেন যে আসে, কি পায় তাকে পুরনো দিন মনে করিয়ে?
সুমিতা তখন কলেজে পড়ছে। তমালের সঙ্গে আলাপ। ইউনিয়ন করে কলেজে, এলাকাতেও বেশ উঠতি নেতা। তরুণ তুর্কী। আদর্শের ঝকঝকে বুলি, চোখা শব্দপ্রয়োগ আর পাঞ্জাবি পাজামায় ভুলেছিল সুমিতা। ফাইনাল ইয়ারে বাড়ির অমতে বিয়ে, এক কাপড়ে উঠে এসেছিল শ্বশুরবাড়িতে। হানিমুনে দীঘা। ব্যস, আনন্দের দিন বলতে দীঘা থেকে ফেরার দিনটাই ছিল শেষ। তারপর শুধু শ্বশুরবাড়িতে অশান্তি আর অশান্তি। বাপেরবাড়ি থেকে কিছু পায়নি সে, সেটাই সবচেয়ে বড় অপরাধ হয়ে দাঁড়াল। আরো জ্বালা হলো, এ বাড়ীর লোকজনের থেকে সকল বিষয়েই যে সুমিতা এগিয়ে, সেটা এদের সহ্য হলোনা। ক’টা দিনের মধ্যেই পাল্টাতে লাগল তমাল। রুচি, মন, মানসিকতা, সংস্কৃতি সব কি বিসর্জন দিল তমাল। সেইসঙ্গে পার্টির তরফ থেকে একগাদা অভিযোগ সহ বহিষ্কার তমালকে একেবারে হিতাহিত জ্ঞানশূন্য করে তুলল। রোজগার নেই, এক পার্টির দাদাকে ধরেই সংসার চালানোর মত একটা কাজ নিল সুমিতা। তমাল পুরোপুরি বেকার তখন। তমালের বাড়ির লোকেরা সুমিতাকে এমনিতেই দেখতে পারতনা, এখন তমালও ওকে অন্য চোখে দেখছিল। কাজ থেকে বাড়ি ফিরেও সব কাজ সুমিতাকেই করতে হত, শরীর পারবে কেন? প্রায়ই জ্বরে পড়তে লাগল সে। কাজ কামাই, ঘরের কাজ বন্ধ। শাশুড়ি আর তমাল তার জীবন দুর্বিসহ করে তুলেছিল। খেতে না দেওয়া, ঘরে বন্ধ করে রাখা, এগুলো ছিল শাশুড়ির দাওয়াই আর রাতে বিছানায় তাকে প্রায় খুন করে ফেলত তমাল। প্রতিবাদ করলে বেল্ট, স্কেল আরো কত কি। বাপের বাড়ি যাবার ইচ্ছে ছিলনা সুমিতার। একদিন খুব মার খেয়ে অজ্ঞান হয়ে গেলে ডাক্তার ডাকতে হয়। তখন ধরা পড়ে সুমিতা গর্ভবতী। খবর যায় তার বাপেরবাড়িতে। কিছুদিনের জন্য অত্যাচার বন্ধ থাকে। তমাল চায়নি বাচ্চা। ঘটনাচক্রে বাচ্চাটা বাঁচেওনি। এরপরেই ডিভোর্সের রাস্তা নেয় সুমিতা। তমালের অসীম দয়া, ডিভোর্স দিয়ে দেয়। বাবা-মা’র কাছে যাবার মুখ ছিলনা, এক বৌদির কাছে কিছুদিন থেকে তারপর ভাড়ায় থেকেছিল এক জায়গায়। আগের থেকে একটু ভাল একটা কাজ পেয়েছে। আপাতত একটা ফ্ল্যাট ভাড়া নিতে পেরেছে সুমিতা। কারোর শাসন নয়, কারো অধীন নয়, শুধু নিজের মতো থাকা। তাতেও কি শান্তি মেলে, এই যে কদিন ধরে ঘুম ভেঙে যাচ্ছে। অতীত পিছু ছাড়ছে না।
শেষ রাতে ঘুম এসে গিয়েছিল। উঠতে একটু বেলা হয়ে গেছে তাই। আজ আর অফিস যেতে মন চাইল না। ফোন করে জানিয়ে দিল অফিসে। আজ সে একটু নিজে নিজে আনন্দ করবে। একটা ফাঁকা ট্রেন ধরে যতদূর ভাল লাগবে যাবে। ফিরে একটা মুভি দেখবে হলে গিয়ে। তারপর রেস্তোঁরায় খাবে– এইভাবে বা অন্যরকমভাবে,  একটু ঘুরবে। স্টেশনে চলে এল সুমিতা।  বর্ধমান যাবার মেইন লাইনের ট্রেনে সুমিতা হাওড়া থেকে জানলার ধার পেয়ে গেল। ব্যান্ডেলের পর থেকে শহর শহর ভাবটা একটু কমতে থাকে। একের পর এক স্টেশন যাচ্ছে, সাথে গাছ, মাঠ, পুকুর, বাড়ি– বেশ লাগছে দেখতে। ভাঁড়ে চা, ঝালমুড়ি– সুমিতা অনেকদিন পর বেশ ছুটি পেয়েছে এরকম। কপালের পাশের চুলগুলো হওয়ায় উড়ছে, ঘুমিয়ে পড়তে ইচ্ছা করছে।
টুইটুই করে ফোন বেজে উঠল। নিশ্চয় প্রমিত। ওরই অফিসে কাজ করে ছেলেটা। বয়সে ওর চেয়ে ছোট, কিন্তু অনুরক্ত ওর প্রতি। অবশ্য, ওর প্রতি অনেকেরই দুর্বলতা আছে, বিবাহিত পুরুষদের একটু বেশিই আছে। তার ডিভোর্স হয়ে যাবার কারণে কৌতুহলও রয়েছে। তা এই প্রমিত ওকে একটু সমঝে চলে, অফিসে না এলে খোঁজ নেয়। ওর পাশে চলতে পারলে, কথা বলতে পারলেই খুশি। অনেকসময় বিরক্ত লাগে সুমিতার, ঢং পোষায়না। কিন্তু গায়ে পড়ে কথা প্রমিত বলবেই। আজ ওর ফোনটা ধরতেই ইচ্ছে করছে না, কিন্তু সমানে ফোন করে যাবে, তাই ফোনটা ধরল সুমিতা। ব্যাংকে কাজ আছে বলে কাটিয়ে দিল প্রমিতকে। ট্রেন থেকে শক্তিগড়ে নামল সুমিতা। সেরকম খিদে নেই। ল্যাংচা খেতে ইচ্ছে করেছে, একটা বড় দোকানের ল্যাংচা খেল। মন ভরল না। ঘন্টাখানেক বসে থাকার ইচ্ছে ছিল, কিন্তু গরম খুব। তাই কি করি, কি করি ভাবতে ভাবতে মনে এল ব্যান্ডেল চার্চ। আহা, কোন ছোটবেলায় এসেছিল বাবা মা’র সঙ্গে। আবার ট্রেনমুখো হলো সে। ব্যান্ডেল যখন নামল, প্রায় বেলা দুটো। অনেককিছু বদলে গেছে, আগেকার খোলামেলা ভাবটা আর নেই। বড় দোকানপাট, ভিড়ভাট্টা। ঘুরে ঘুরে দেখতে লাগল সুমিতা। সেই ছোটবেলার ঠান্ডা ঠান্ডা বারান্দা, প্রার্থনা ঘর আর সেই যে উঠোনের গায়ে ক্রুশবিদ্ধ যীশুর মূর্তির সামনে মোমবাতি জ্বালানোর জায়গা, ছোট্ট জলাশয়ে লোকজন সব পয়সা ফেলত– খুঁজতে লাগল সেই দিনগুলো। ভালো লাগছিল। অনেক পরিবর্তনের মধ্যেও প্রার্থনাকক্ষের অখন্ড শান্তি আজও একইরকম। ও বসেছিল, বসেইছিল। সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠে গেল সুমিতা।
এই জায়গাটায় বাবার সঙ্গে অনেক বসেছে সে। একবার মনে আছে, গরমের ছুটিতে বাবার সঙ্গে এসেছিল। বসেছিল এই ওপরে মরিয়মের মূর্তির কাছে। ছোট্ট ঘরটার দেয়ালজুড়ে কত ছবি আর লেখা ছিল। গরম বলে ভীড় ছিলনা তেমন। শুধু একটা আন্টি ছিল। চোখে চশমা, লাল সালোয়ার পরা। আন্টি ছোট্ট সুমিতাকে জিজ্ঞেস করেছিল, “গড কে চিঠি লিখেছো?” সুমিতা তো কিছুই জানতোনা। আন্টিটা তখন বলেছিল,”একটা কাগজে যা চাও, তাই লিখে এই বাক্সটায় ফেলতে হয়। যা চাইবে, যদি তোমার পাওয়ার হয়, মাতা মেরি দেবেন”। সুমিতাকে তিনিই একটা খাতার পাতা দিয়েছিলেন। সুমিতা বাবাকে জিজ্ঞেস করেছিল বাংলা না ইংরেজিতে লিখবে। বাবা বলেছিলেন, ঠাকুর তো, যে ভাষাতেই লেখ ঠিক বুঝে নেবেন। সুমিতা বাংলায় লিখেছিল, – জ্ঞান, বুদ্ধি, শক্তি, ধৈর্য, বিবেক আর শান্তি দাও। আসলে বাড়িতে ঠাকুর প্রণাম করার সময় ওটাই বলতে শিখেছিল সে। আর কিছু যে চাওয়ার আছে ঠাকুরের থেকে, সেটা সে জানতনা তখন। ভাবতে ভাবতে চোখ জলে ভরে আসে সুমিতার। ব্যাগ থেকে রুমাল বার করে চোখ মোছে। আজও কিছু একটা লিখতে ইচ্ছে করছে। ঠাকুর তাকে এত দিলেন, একী তার পাওয়ার ছিল? একটা কাগজ প্যাড থেকে ছিঁড়ে নিয়ে সে শুধু লিখল, জ্ঞান,বুদ্ধি, শক্তি, ধৈর্য, বিবেক, শান্তি আর ক্ষমা করার ক্ষমতা দাও। কাগজটা বাক্সে ফেলে ঝরঝর করে কেঁদে ফেলল সুমিতা। একটু শান্তি চাই, কোথাও যে মেলেনা ঈশ্বর।
চার্চের বাইরে এসে গঙ্গার ধারে দাঁড়ালো কিছুক্ষণ। বিকেল প্রায় পাঁচটা। এবার ফিরতে হবে। শরীরটা ক্লান্ত লাগছে। মুভি অন্য কোনোদিন দেখা হবে’খন। বিকালের মন খারাপ করা আলো গায়ে মেখে ধীর পায়ে অটোর দিকে এগোল সুমিতা।
চুপচাপ ঘরে বসে ভাবছিল সুমিতা। কিরকম সারাদিন কেটে গেল। শেষ কবে এমন কেটেছে মনে পড়েনা। কাজ নিয়ে বেশি ব্যস্ত হয়ে পড়ছিল বোধহয়। বৌদির ফোন এসে ভাবনার ঘোর কেটে গেল। ওপাশ থেকে ভেসে এল দাদার গলা। আসলে চলে আসার পর থেকে যেটুকু যোগাযোগ তা বৌদির সঙ্গেই। দাদার সঙ্গে কথা হয়না বললেই চলে। দাদার গলা শুনে তাই বড় ভাল লাগল ওর। অনেকদিন পর দাদা ওকে ডেকেছে ও’বাড়িতে। ভাইঝির পাঁচ বছরের জন্মদিন যে সামনের সপ্তাহে। বাবা নাকি আর আগের মতো রাগী নেই। মান অভিমান ভুলে ওরা আবার ডাকছে। ছোট্ট ভাইঝিটা পিতি পিতি করে কত গল্প করল। কি যে ভাল লাগে বাচ্চাটাকে। অনেকদিন আগে দেখেছে তাকে। কি করবে সুমিতা এখন? যাবে? ওরা যদি ফিরে আসতে বলে? না, ফিরবেনা সে আর কোথাও। কিন্তু দেখা করতে যাবে। মা, বাবা, দাদা, বৌদি আর ছোট্টটা– তার আপনজন। সে যাবে। লম্বা লম্বা শ্বাস টেনে শুতে গেল সুমিতা।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *