স্মৃতির স্বরলিপিতে এখনও বেঁচে আছেন আব্দুল্লাহ মোল্লা // তৈমুর খান

https://www.sahityakaal.com

মুর্শিদাবাদের রঘুনাথগঞ্জ আমি সহজে আসতে পারি না। যখনই আসি মনটা ভীষণ এক শূন্যতায় ভরে যায়। হৃদয় মোচড় দিয়ে ওঠে। যে যন্ত্রণা আমাকে অহরহ কাঁদায় তা আত্মীয় বিয়োগের থেকেও মারাত্মক রঘুনাথগঞ্জের ইসলামপুরের আবদুল্লাহ মোল্লার মৃত্যু। তাঁকে আমি সাহিত্য জগতে পা দেওয়ার পর থেকেই জানতাম। প্রথম জীবনে কবিতা নিয়ে “রঙধনু” পত্রিকায় নানা বিতর্কের মধ্যে দিয়েই এই সম্পর্ক গড়ে ওঠে।

.

.

কিন্তু ২০০৪ সালে স্থায়ীভাবে রঘুনাথগঞ্জে আসার পর এই সম্পর্ক প্রগাঢ় হয়ে ওঠে। আমার আসার পর থেকেই ঘরভাড়া খুঁজে দেওয়া, সাংসারিক যাবতীয় আসবাবপত্র সংগ্রহ করে দেওয়া, প্রতিদিনই খোঁজ খবর নেওয়া তাঁর নিত্য কাজ হয়ে উঠেছিল।

.

.

এমনকী বাড়ির তৈরি করা খাবার এনেও পরিবেশন করে বড়ো আপনজনের মতোই মমতার সম্পর্ক গড়ে তুলেছিলেন।দরবেশপাড়ায় তাঁর ছোট্ট মনিহারির দোকানটির নাম ছিল “টিফিন মিউজিয়াম”। সকাল সন্ধে এখানেই আমাদের আড্ডা জমে উঠত। রঘুনাথগঞ্জের সকল শিক্ষিত বুদ্ধিজীবীরা এখানে এসে বসতেন। সাহিত্যের বিভিন্ন দিকগুলো আলোচনায় উঠে আসত।

.

.

কখনও তুমুল বিতর্কও । আলোচনার সঙ্গে সঙ্গে পাশের ফড়িং নামে এক ব্যক্তির চায়ের দোকান থেকে চা আসত। কতবার যে চা খাওয়া হত তার ঠিক ছিল না।

.

.

আব্দুল্লাহ মোল্লা জন্মগ্রহণ করেছিলেন ১৯৬২ /৬৩ সালে, জঙ্গিপুর সংলগ্ন ইসলামপুরে । সেসময় আরবি ভাষায় অনার্সহ পোস্টগ্রাজুয়েট হন। কিন্তু দুর্ভাগ্য চাকরিতে যোগ দিতে পারেননি ঘুস দেওয়ার মতো অর্থ তাঁর ছিল না বলেই। ক্ষুদ্র একটি ব্যবসা করেই সংসার চালাতেন।

.

.

এক মেয়ে ও এক ছেলেকে সেভাবেই উচ্চ শিক্ষার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেও দিয়েছিলেন। পড়াশোনাতে তারা দুজনেই মেধাবী। কিন্তু এভাবে আর সংসার বেশিদিন চলছিল না। তিনি এতই সাহিত্যমনস্ক হয়ে পড়েছিলেন যে, ব্যবসাটায় আর মনোযোগ দিতে পারছিলেন না।

.

.

শেষপর্যন্ত পুঁজিটাই খরচ করে দিচ্ছিলেন। এই অবস্থায় ২০০৯ সালের ৫ ই জুন অন্যের একটা বাইক চেয়ে নিয়ে বেলা ১১ টা নাগাদ মোরগ্রাম আসছিলেন এক দূরসম্পর্কীয় সম্বন্ধীর ছেলের বউভাত অনুষ্ঠানের নিমন্ত্রণ রক্ষা করতে। সেই আসার পথেই ৩৪ নং জাতীয় সড়কের উপর তালাই মোড়ে একটা লরির ধাক্কায় মৃত্যু বরণ করেন। তাঁর মৃত্যর পরও দেখা যায় ঘাড়ের ঝুল ব্যাগে একটা কবিতার খাতা, কতকগুলি সদ্য লেখা অণুগল্পের পাণ্ডুলিপি। সেগুলো আর ছুঁয়ে দেখারও সাহস পাইনি। রক্ত গড়িয়ে পড়েছে সেগুলিতে । অশ্রুতে ঝাপসা হয়ে এসেছে চোখ।

.

.

রঘুনাথগঞ্জে তাঁকে নিয়ে কত স্মৃতি, কত ঘোরাঘুরি করার অভিজ্ঞতা কোনওদিনও ভুলতে পারব না। তাঁর সঙ্গে কানহুপুরের ফকির মেলা গেছি, গুমানি দেওয়ানের ভিটেতে কবিগানের উৎসবে গেছি, ভাষাদিবসে লালগোলা গেছি, দীপশিখা পোদ্দারের ডাকে কলকাতায় বাংলা অ্যাকাডেমি গেছি । এত অভাবের মধ্যে থেকেও কখনও অভাবের কথা বলতে শুনিনি। ধার করেও টাকা খরচ করতেন।ছুটির দিন কোথাও না কোথাও বেরিয়ে পড়তাম আমরা। সঙ্গে অনেককেই পেতাম। একটা সাহিত্য মজলিশ গড়ে উঠেছিল তাঁরই চেষ্টায়।

.

.

আজ কতজনকে হারিয়েছি একে একে। তাঁদের মধ্যে অন্যতম হলেন : হরিলাল দাস , কাজি কল্পনা ইসলাম, অনন্ত রায়, কেতাবুল সেখ প্রমুখ। এখনও যাঁরা আছেন তাঁদের মধ্যে অন্যতম হলেন :তুলসীচরণ মণ্ডল, কাজি আমিনুল ইসলাম, নাসিরুদ্দিন মির্জা, তৌহিদ মির্জা, নুরুল মোর্তুজা, এস এম নিজামুদ্দিন, মহ গোফুর সেখ, অনুরাধা ব্যানার্জি, এনামুল কবির প্রমুখ। আরও কত নাম আমিই মনে করতে পারছি না। আব্দুল্লাহ মোল্লা সেই সময় নিজে যতটা না লিখতেন, অন্যকে লিখতে দ্বিগুণ উৎসাহিত করতেন। তবে বেশ কিছু সংকলনে তাঁর লেখা প্রকাশিত হয়েছিল। নিজের সম্পাদিত পত্রিকা “সাহিত্য চেতনা” বছরে একটা হলেও বের করতেন।

.

.

এই পত্রিকাটি ইস্যু ভিত্তিকও কয়েকটি উল্লেখযোগ্য সংখ্যা বের হয়। যেমন, চারণকবি গুমানি দেওয়ান সংখ্যা, আলকাপ সংখ্যা, মুসলিম সমাজের বিয়ের গান সংখ্যা, চাঁই সংস্কৃতি সংখ্যা ইত্যাদি । তাঁর সম্পাদিত পত্রিকা এবং তাঁর লেখার পাণ্ডুলিপিগুলি আছে কিনা জানি না। কোনও সংযোগ নেই তাঁর  উত্তরসূরীদের সঙ্গেও। রঘুনাথগঞ্জ ছেড়ে এসেছি ঠিকই কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার হলো প্রতিদিনই আমার সকাল হয় রঘুনাথগঞ্জকে মনে রেখেই। আব্দুল্লাহ মোল্লার মুখটি মনে পড়ে। মনে পড়ে কথাগুলিও –
—কোনও অসুবিধা হয় না তো?

.

.

—না না।
—বাড়িতে সবাই ভালো আছে তো?
—হ্যাঁ হ্যাঁ, সবাই ভালো আছে।
—নতুন কী লিখলেন?
—এই একটি গদ্য।
—পড়ুন, শুনি।

.

.

শুনতে শুনতে তন্ময় হয়ে যেতেন। শেষে বলতেন “দারুণ হয়েছে!”
কতখানি বুঝতেন জানি না, আমি মুগ্ধ হতাম আমার লেখার প্রথম শ্রোতাকে পেয়ে। আজও আমি আমার প্রথম শ্রোতাকে আমার পাশে উপলব্ধি করি, কিন্তু সম্পূর্ণরূপে নীরব তিনি। তবু তো টের পাই!
এরকম উদার, সংবেদনশীল হৃদয়ের মানুষ আমার জীবনে আমি কমই দেখেছি।যে স্মৃতিগুলো খুব মনে পড়ে সেগুলোর কিছু অংশ না বলে পারছি না। মৃত্যুর একবছর আগের ঘটনা। রঘুনাথগঞ্জ বাসস্ট্যান্ডে একবার বিনা কারণে জনতার হাতে আমাকে মার খেতে হয়। একজন প্রাথমিক শিক্ষক বিবাহিত হয়েও এক থুবড়ি মেয়ের সঙ্গে প্রেমের অভিনয় করে।

.

.

তাদের সম্পর্কও বহুদূর গড়ায়। কিন্তু একদিন সেই মেয়ে ও তার মা শিক্ষকটির চালাকি বুঝতে পেরে উক্ত বাসস্ট্যান্ডেই শিক্ষকটিকে জুতোপেটা করে। জুতো খেয়ে সে পালিয়ে যায়। প্রহারকারিনীরাও অন্তর্হিত হয়ে পড়ে। সেই দৃশ্য দেখতে গিয়ে অপরাধী শিক্ষক ভেবে আমাকেও জনতার রোষে পড়তে হয়। ব্যাপারটি পরের দিন আব্দুল্লাহ মোল্লাকে বললে তৎক্ষণাৎ তিনি বাসস্ট্যান্ডে এসে প্রতিবাদ জানান এবং আমার কাছে বাসস্ট্যান্ডে অবস্থানরত মানুষদের ক্ষমা চাইতে বাধ্য করেন।

.

.

আর একদিনের ঘটনা মারাত্মকভাবে মনে দাগ কাটে। দুদিন বাসা ছেড়ে ইলেকশন-এর ডিউটি করতে গেছি। ফিরতে ফিরতে সকাল হয়ে গেছে। সারারাত কিছুই খাওয়া দাওয়া হয়নি। দোকান খুলে তখনই বসেছেন আব্দুল্লাহদা।

.

.

আমাকে দেখেই হাতে ধরে টেনে বসালেন। সবকিছু ঠিকঠাক ছিল কিনা জেনে নিলেন। তারপর বললেন : কী দশা হয়েছে না খেয়ে! খুব টেনশনে ছিলেন তো!
অস্বীকার করার কোনও উপায় নেই। তখন নিজের বাড়ি থেকে আনা জলখাবার নিজে না খেয়ে আমাকে তুলে দিলেন। একপ্রকার জোর করেই খাওয়ালেন।

.

.

আমার শরীর খারাপ হলে, ছেলেমেয়েদের ডাক্তার দেখানোর প্রয়োজন হলে তিনিই সব ব্যবস্থা করে দিতেন। মাঝে মাঝে নিজেও ওষুধ দিতেন। হোমিওপ্যাথি চিকিৎসায়ও যথেষ্ট দক্ষতা ছিল। আমার প্রথম সন্তানটির একজোড়া রঙিন জামাকাপড় কিনে একদিন এসে উপস্থিত হলেন। বললেন, এইটুকু না দিলে কী দেবো!

.

.

আমার বিবাহিত জীবনের শুরুতে সংসার পাতার মুহূর্তে সবকিছুর সঙ্গে তিনি শিল-নোড়া পর্যন্ত কিনে নিয়ে এসেছিলেন। শুধু কাব্য-কবিতাই নয়, জীবনের সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে তাঁর অবদান ভোলার নয়। অনেক আরবি শব্দ খুব নিখুঁতভাবে ব্যাখ্যা করতে পারতেন। ধর্মীয় ব্যাপারেও তাঁর গোঁড়ামি ছিল না। মানুষের উপকার করাকে যেমন ধর্ম ভাবতেন, তেমনি কখনও কখনও কন্যাদায়গ্রস্ত পিতাকে সাহায্য করতেও পিছু পা হতেন না।

.

.

কোনও অসহায় মানুষকে হাসপাতালে পৌঁছেও দিতেন। আবার উদ্ভিদ-এর চারা বিক্রি করতে এসে কিছু বাতিল চারা বিক্রয়কারীরা ফেলে দিলে আব্দুল্লাহ মোল্লা সেগুলো কুড়িয়ে নিয়ে গিয়ে বহু যত্নে সেগুলো বড়ো করে তুলতেন। এমনি করেই একটা বাগান তৈরি করেছিলেন। তিনি জানতেন মূল্যবোধ কাকে বলে, কীভাবে তা রক্ষা করতে হয়। তাঁর আদর্শ তাঁর ছেলেমেয়েরা গ্রহণ করেছিল। তাদের কথাও তাঁর মুখে শুনতাম।

.

.

রঘুনাথগঞ্জ এলে মাঝে মাঝেই পিছন ফিরে তাকাই। এই বুঝি আব্দুল্লাহ মোল্লা আমাকে অনুসরণ করছেন। প্রত্যেকের মুখের দিকে একদৃষ্টে চেয়ে দেখি। সত্যিই কি আর পাওয়া যাবে তাঁকে! ভ্রান্তি বার বার আমাকে পেয়ে বসে। নিজের অজান্তেই চোখ ভিজে যায়।….

.

.

.

.

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *