ড্যামেজ কন্ট্রোল – শম্পা সাহা

আটই মার্চ বিশ্ব নারী দিবস। ফেসবুকে কবিতা, গান, কোটস্, পোস্টে ভরে যাবে।
মহিলারা, পুরুষেরা গদগদ হয়ে “হ্যাপ্পি উইমেন্স ডে” উইশ করবেন।
নানা অনুষ্ঠানের মাধ্যমে পালন হবে সারা বিশ্বে এই মহান দিনটি, যে দিনটি নারী দিবস হিসেবে স্বীকৃত!
কিছু বেয়াক্কেলা, অকাল পক্ক লোকজন আবার বিরোধিতায় নামবেন কোমর বেঁধে। কেন একটা দিনই নারী দিবস?  এই সব দিবস টিবসের অন্তঃসারশূন্যতা নিয়েও অনেকে বক্তিমে  ঝারবেন, এই যেমন আমি! তারপর????
নীলিমাকে ভিড় বাসে বেকায়দায় পেয়ে কেউ একটু ফোকটিয়া সুখ করে নেবেন। নীলিমা চেঁচাবে না, চুপ করে থাকবে! চেঁচালে  লোকে উঁকি মেরে দেখতে চাইবে হাতটা ঠিক কোন জায়গায় কতটা খিঁমচি মেরে ছিল, বা কোন কোন জায়গায় হাত বুলিয়ে ছিল। তারপরে যদি কোনো উঠতি হিরো দিলো ও না হয় দু ঘা, সেই বেশরম  কে! কিন্তু নীলিমার মা ভয়ে মেয়েকে কদিন কলেজ যেতে দেবেন না।
লক্ষ্মী ঘর মুছবে, ক্লান্ত শরীর, অসংলগ্ন আঁচল, অসতর্কতায় দৃশ্যমান বিভাজিকা চোখ দিয়ে চাটবে  অমুক বাবু। অমুক বাবুর গিন্নি ফেসবুকে করা নারী অধিকার, নারী সম্মানের বিরাট একটা পোস্ট এ প্রায় দুহাজার লাইক দেখে খুশি হয়ে এ ঘরে আসতে গিয়ে কত্তার কান্ড দেখে লক্ষ্মী কে মুখ ঝামটা  দেবেন, “পোশাক আশাক ঠিক করে পরতে পারিস না? ” মনে মনে ভাববেন, “ফাঁকতালে বাবুকে পটানোর ধান্দা, ওসব ঢলানি মেয়েছেলে চেনা আছে! ” এরপর থেকে লক্ষ্মী কাজে আসলে সতর্ক থাকবেন। “যাই বলো ওরা ছোটো লোক, ওদের ভরসা কি? “
কর্পোরেট হাউসে ব্যস্ততার সুযোগে ফাইল দেখানোর অছিলায় কখনো মিঃ. এক্স এর হাত ছুঁয়ে দেবে সদ্য জয়েন করা বাচ্চা মেয়েটির বক্ষদেশ বা নিতম্ব। কখনো মেয়েটি চুপ থাকবে এই ভেবে, “চাকরিটা আমার দরকার”,  অথবা, ” মিঃ. এক্স কে হাতে রাখা দরকার , বাড়ি গিয়ে স্নান করে নিলেই হবে”।
কন্যাশ্রীর টাকায় বাবা মেয়ের বিয়ের গয়না বানাবে, আর রূপশ্রীটা পণ হিসেবে দেখিয়ে বছর আট ত্রিশের কালুর সঙ্গে বিয়ে হবে বছর উণিশের  রত্না মন্ডলের।
পেটে চার নম্বর বাচ্চা নিয়ে পিংকি হালদার মানত করবে মা শেতলার কাছে, ” মা, মাগো, তোমাকে  ছাপাশাড়ি দিয়ে পূজো দেব। এবারেরটা যেন ছেলে হয়”!  অপুষ্ট পিংকি তিন তিনটে মেয়ের জন্ম দিয়েছে, এবারেরটা ছেলে না হলে মানিক আবার বিয়ে করবে। পঞ্চায়েতে গিয়েছিল, কিন্তু সুরাহা হয়নি। শশুর ঘর ছেড়ে গেলে যাবে কোথায় তিন তিনটে মেয়ে নিয়ে। বাপ নেই, বিধবা মা নিজেই দাদাদের হাত তোলার উপর।
ফরিদা, ইমতিয়াজ কে না বলার পর থেকে ভয়ে ভয়ে। পাশের গাঁয়ে উর্মিলা নিতাই কে প্রেম করতে চায়নি বলে নিতাই অ্যাসিড মেরেছে উর্মিলা র মুখে। উঃ, কি বিভৎস! ফরিদা উর্মিলা হতে চায় না।
আজ ও সহেলি রান্না বান্না সেরেই অফিস বেরোবে।শাশুড়ির বাতের ব্যথা, নড়তে চড়তে পারে না, বর রান্নার লোকের রান্না মুখে তুলতে পারে না। তাই পাঁচটায় উঠেছে সহেলি,আটটায় ট্রেন, না হলে যে অফিস পৌঁছতে পারবে না। বাড়ি করতে দুজন মিলে লোন নিয়েছে যে, তাই চাকরিটাও দরকারী।
আজ নেহার শরীর ভালো না। গা ম্যাজম্যাজ করছে। ওর আসল নাম নেহা নয়। কিন্তু ওর প্রেমিক ওকে এখানে বিক্রি করে দেবার পর থেকে ওর নাম নেহা। মাসীকে  বলেছিল ওর আজ শরীর ভালো নেই। ওদের আর ভালো মন্দ! এক কলেজে পড়া ছেলে আসে, মানুষ না রাক্ষস! যেন খুবলে খুবলে  খায় শরীরের সব মাংস পেশী, পারলে দাঁত বসিয়ে সোজা হৃদপিণ্ড থেকে রক্ত চুষে খায় রাক্ষসটা। ওর এসে আবার নেহাকেই চাই। যা রেট তার থেকে হাজার টাকা বেশি দেয় সব সময়। তাই সোম বার করে নেহা ছটা থেকে আটটা বাঁধা ঐ রাক্ষসের জন্য। আজ যে সোমবার! নেহা শিউরে ওঠে।
“এই যে বৌমা এই ক্রিম টা মাখো  বেশ ফর্সা দেখাবে”, আর ওই লাল নয় ঘিয়ে রঙের শাড়ি টা পোরো।লালটা বড্ড ক্যাট কেটে! ফিলোজফি অনার্স এর শিক্ষিকা রীতিকে তার রিটায়ার্ড প্রাইমারী স্কুলের হেড দিদিমনি শাশুড়ি অর্ডার শোনান। রীতি বিজনের দিকে অভিমান ভরে তাকায়। বিজন ব্যস্ত চুল আঁচড়াতে।ছ মাসের সদ্য বিবাহিতা রীতি বুঝে পায় না, এরা তো দেখেশুনেই কালো বৌ এনেছে, তাহলে ফর্সা করতে উঠেপড়ে লেগেছে কেন?
কেন? কেন? কেন?  এই হাজার লক্ষ কোটি কেনর কোনো উত্তর নেই। এই একটা দিন নারী দিবস পালন করে কিছুটা ড্যামেজ কন্ট্রোল তো হলো! কি বলেন?

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *