স্মৃতিটুকু থাক – প্রনব মাঝি

sahityalok.com
ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝিতে সেইবার বেশ ঠান্ডা পড়েছিলো,তারমধ্যে আবার নিম্নচাপের জন্য দু-এক পশলা বৃষ্টি হওয়াতে সায়কের মনে হচ্ছিল যেন শিমুলপুরেও বোধহয় বরফ পড়তে শুরু করবে।শিমূলপুর একটা ছোট গ্রাম,সায়ক এই শিমূলপুর গ্রামের অবনী বিদ্যানিকেতনের ক্লাস টুয়েলভের ছাত্র।
 
 
সায়ক বড়ো অনুভূতিপ্রবণ ,মেঘলা আকাশ হলেই ওর  মন খারাপ হয়ে যায়।কয়েকদিন পর সরস্বতী পুজো আর পুজোর একসপ্তাহ পর থেকেই সায়কদের উচ্চ-মাধ্যমিক শুরু হবে,ফলে আর মাত্র কয়েকদিন পর স্কুল ছাড়তে হবে,এটা ভাবলেই যেন বুকের ভিতরটা কেমন করে ওঠে।সায়কের সবচেয়ে বড় ভাবনা হল আয়েশাকে নিয়ে,এমনিতেই টেস্টের পর ক্লাস বন্ধ হয়ে যাওয়াতে আয়েশার সঙ্গে কেবল সপ্তাহে একদিন কেমিস্ট্রি টিউশন দেখা হয় সায়কের। 
 
 
                                                                         আয়েশা সায়কের ব্যাচমেট।ক্লাস ইলেভেন থেকেই ওদের পরিচয়।সায়কের পাশের গ্রামেই আয়েশার বাড়ি,বেশ বিত্তশালী পরিবারের মেয়ে।আয়েশার চোখে একটা অদ্ভুত সারল্য খুঁজে পায় সায়ক,ওর ওই খিলখিল হাসিটা যেন পাহাড়ি নদীর উচ্ছলতার শব্দকেও হার মানায়,বিজোড় দাঁতেগুলো  ওকে আরও আকর্ষণীয় করে তোলে। 
 
 
                                                                   আজ শনিবার তাই রমেন স্যারের কাছে বিকালে কেমিস্ট্রি পড়া আছে ভেবে  সায়কের মনে একটুখানি খুশির রেশ আছে,অন্তত আজ একসপ্তাহ পর আয়েশাকে দেখতে পাবে।আজকেই  ওদের রমেন স্যারের কাছে উচ্চ-মাধ্যমিক পরীক্ষার আগে শেষদিনের পড়া।  সৌমেন সেই দুপুর  থেকেই এসে বসে রয়েছে সায়কের বাড়িতে।ওরা দুজনেই একসাথে রমেন স্যাররের  কাছে  পড়ে।। আজ টিউশন শেষে সৌমেন সোজা ওর পিসির বাড়ি যাবে,তাদের বাড়িতে কি একটা পূজো আছে,সায়ককে তাই একাই ফিরতে হবে,কারণ সৌমেনের পিসির বাড়িটা রমেন স্যারের   পাড়াতেই।     
 
                                                              সৌমেনের মনে আজ ভীষণ আনন্দ। কয়েক ঘন্টা পরই রমেন স্যারের কাছ থেকে ওর চিরমুক্তি ঘটবে,তাই সাইকেলটা বোধহয় আজ একটু জোরেই চালাচ্ছে।আসলে সেই ইলেভেন থেকেই সৌমেন কেমিস্ট্রির ওইসব জটিল বন্ড ভেঙে পালিয়ে যেতে চায়,কিন্তূ বেচারার আর কোন উপায় নেই তাই বাধ্য হয়েই হইড্রোজেনের বন্ধনে আটকে আছে। সৌমেন বললো “যাই বল ভাই,রমেন স্যার লোকটা কেন সবসময় আমায় কাঠি করে বুঝতে পারি না!দেখলি না আগের দিন সামান্য ইথাইল ক্লারাইডের সংকেতটা লিখতে পারলাম না বলে সকলের সামনে কেমন চুলের মুঠিটা ধরে নাড়িয়ে দিল!আর তাছাড়া আমার সবেতেই স্যারের নজর,আমি কেন চুলে রং করিয়েছি,আমার জিন্সটা হাঁটুর কাছে ছেড়া কেন? আমার   সবকিছুুুই যেন স্যারকে জানতেই  হবে!”  
 
 
                                                                       সায়কের হৃৎস্পন্দন আচমকা বেড়ে গেল ,কারণ সামনের বটতলা মোড়ের উত্তরদিকের রাস্তা দিয়ে সাইকেল নিয়ে আসছে আয়েশা। সায়ক একটু আসতে প্যাডেল করতে থাকল।।  সায়ক ভীষণ মুখচোরা ছেলে,মনে হাজার কথা ভাবলেও মুখে কিছুই বলে উঠতে পারে না।। আয়েশা কাছে এসে প্রথম সায়কের সঙ্গে কথা বলতে শুরু করলো এবং পথ চলতে চলতে জিজ্ঞেস করল “প্রিপারেশন কেমন?এরপর কি নিয়ে পড়বি ?…..ইত্যাদি।” 
 
 
                                             স্যার আজকে বেশিক্ষণ পড়াননি, শেষদিন বলে একটা ছোট্ট করে ফেয়ারওয়েল অনুষ্ঠান করলেন,স্যার নিজে দু-এক কথা বললেন সকলের সম্পর্কে ,অনুষ্ঠান শেষে সায়ককে একটা গান গাইতে বললেন স্যার। সায়ক ছোট থেকেই সংগীত চর্চা করে,এবং গানের গলা অসাধারণ।আজ সত্যিই সবাই ভীষণ আবেগপ্রবণ হয়ে গিয়েছিলো, হয়তো সৌমেনও।স্যার যখন ছুটি দিলেন তখন সন্ধে সাতটা,আসলে আজ এই অনুষ্ঠানের জন্য একটু দেরি হয়ে গেল।সবাই স্যারকে প্রনাম করে হল থেকে বেরিয়ে এলো,স্যার নিজে আজ গেট অবধি এগিয়ে দিতে এসেছেন। আয়েশা আজ  সবার আগেই বেরিয়ে এসেছিলো ,তারপর ফিরে গিয়ে স্যারকে বললো যে ওর সাইকেলের টায়ার নাকি পাংচার হয়ে গেছে।স্যার খানিকটা চিন্তায় পড়লেন,কাছাকাছি কোথাও সাইকেল সরানোর দোকান নেই।অবশেষে স্যার সায়ককে বললো-“বাবু,তুই যাওয়ার পথে একটু আয়েশাকে বাড়িতে পৌঁছে দিস, না হলে মেয়েটা বড় সমস্যায় পড়ে যাবে!”     
 
 
                                                                         আয়েশা সায়কের সাইকেলের পিছনের ক্যারিয়ারে বসল।সায়কের হৃৎপিন্ডটা বোধহয় এবার দ্বিগুণ গতিতে চলতে শুরু করেছে।আয়েশার মৃদু স্পর্শে এই শীতেও সায়ক ঘামছে।সায়ক ইচ্ছে করেই সাইকেলটা আস্তে চালাচ্ছে,আয়েশার সঙ্গে এই একঘন্টার যাত্রাপথকে যতটা সম্ভব বাড়ানো যায় তারই একটা চেষ্টা মাত্র।আকাশে কৃষ্ণ দ্বাদশীর চাঁদ আর  মেঠোপথের দুপাশে সার দেওয়া ঝাউবন মিলে এক অদ্ভুত মায়াবী পরিবেশ সৃষ্টি করছে,দুপাশের ঝাউবন ছাপিয়ে মাঝেমাঝে শীতের মৃদু বাতাস বইছে,দু একটা ঝাউ ফল টুপটাপ করে ঝরে পড়ছে,গ্রামের পথ তাই সন্ধেবেলাতেও বেশ নির্জন।নিস্তব্ধতা ভেঙে আয়েশা বললো-“তুই  আজ গানটা  দারুন গেয়েছিলি,যদিও এমনিতেও তুই সবসময় দারুন গান করিস,সেটা আলাদা করে বলার কিছু নেই।” সায়ক বোকার মত জিজ্ঞেস করলো,”সত্যি!তোর ভালো লেগেছিলো?” আয়েশা হেসে উঠলো,সেই পাহাড়ি নদীর উচ্ছলতার  মতো হাসি।     
 
 
                                                                    আজ সরস্বতী পূজো,সকালেই স্নান করে সায়ক স্কুলে বেরিয়ে গেল।আজকে ওদের ব্যাচের সবাই খুব তাড়াতাড়ি আসবে এটা আগে থেকেই প্ল্যান করা আছে,আজকে সারাদিন শুধুই মজা করা হবে,এটাই যে স্কুল জীবনের শেষ পুজো।সায়ক পৌঁছে দেখলো অনেকেই ততক্ষণে চলে এসেছে,ওদের ক্লাসের অনুরিমা,তিয়াসা,লাবণ্য সবাই হলুদ শাড়ি পরে এসেছে।ভিড়ের মাঝে সায়ক চোখ বুলিয়ে দেখলো আয়েশা আসেনি,ওর বুকের ভিতরটা ধড়াস করে উঠলো তবে কি আয়েশা আজ আসবে না!নিজেকে ভীষণ অস্থির লাগছিলো,স্কুলের গেটের সামনের দেবদারু গাছটাতে ঠেস দিয়ে আনমনা হয়ে তাকিয়েছিল। 
 
 
                                                                                 আচমকা সেই খিলখিল হাসি শুনে ফিরে দেখলো সায়ক,হৃৎপিন্ডটা লাফিয়ে উঠলো ওর। বাসন্তী রঙের শাড়িতে,খোলা চুলে আয়েশাকে দেখে নির্লজ্জের মতো অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিলো সায়ক,চেখে চোখ পড়াতে ওর দিকে এগিয়ে এলো আয়েশা।অঞ্জলি হয়ে যাবার পর সবাই মিলে একটা গ্রূপ ফটো তুলেছিলো অভিরূপের ক্যামেরাতে।অভিরূপের মামা নাকি বিদেশে বড়ো চাকরি করে,তাই ওর জন্মদিনে ওই ক্যামেরাটা গিফট  করেছিলো।আজ সন্ধে অবধি ওরা স্কুলে কাটাবে।অভিরূপ,বিক্রম,নীলম, লাবন্য,তিয়াসার প্ল্যান করলো যে সাইকেলে করে পাশের স্কুলগুলোতে ওরা ঠাকুর দেখতে বেরোবে।যদিও ওদের গ্রূপের অনেকেই বললো -“কোথাও যাব না আজ দিনটা স্কুলেই কাটাবো।”   
 
 
                                                                                    কোলাহল এড়িয়ে সায়ক আর আয়েশা সেদিন ঝিলম নদীর পাড়ে গিয়েছিল।এদিকটা অনেকটা নির্জন খুব একটা কেউ আসেনা।সায়কের আজ কেমন যেন নেশার ঘোরের মতো অনুভব হচ্ছে,নিজের অজান্তেই  আজ অনেক কথাই বলে ফেলছে।ওরা নদীর পাড়ে বাঁশের ঘাটের উপর গিয়ে বসল,সামনের ছোট নদীটা দিয়ে জেলে ডিঙ্গিগুলো পেরিয়ে যাচ্ছে ,মাঝে মাঝে দু একটি বড় স্টিমার।সায়কের পিঠে আয়েশা গা এলিয়ে দিয়েছে,ওর চুলের গন্ধে সায়ক যেন সম্মোহিত হয়ে গেছে।সায়কের ইচ্ছে করছে আয়েশার ওই ঘন কালো চুলের মধ্যে নাক ডুবিয়ে সমস্ত ঘ্রাণ টুকু উজাড় করে নিতে। সূর্যাস্তের রক্তিম আভা আয়েশার টোল পড়া গাল দুটোতে প্রতিফলিত হচ্ছে।আয়েশার চোখ চোখ রেখে সায়ক বললো-“আজ,তোকে  এই শাড়িতে দারুন দেখতে লাগছে।” আয়েশা উত্তরে সায়কের হাতে নিজের হাতটা রেখে পাহাড়ি উচ্ছলতার মতো হাসি টুকুই শুনিয়েছিল।  সন্ধে নামার আগেই ওরা সেদিন বাড়ি ফিরেছিল।   
 
 
                                                                   ঝিলম নদীর তীরে আয়েশা আর সায়ককে  সেদিন কেউ দেখেছিলো, আর সেই খবর পৌঁছে দিয়েছিলো আয়েশার বাড়িতে।এই নিয়ে নাকি তুমুল অশান্তি হয়েছিল আয়েশার বাড়িতে।এই ঘটনা নাকি পাড়ার কলতলার মহিলাদের মধ্যেও আলোচিত হয়েছিল।সায়কের বাড়িতেও পুরো ব্যাপারটা জানাজানি হয়েছিল।  কনজারভেটিভ মুসলিম পরিবারের মেয়ে  আয়েশা খাতুন আর হিন্দু পরিবারের সায়ক মজুমদারের সম্পর্কটা এক বিশাল সমুদ্রের বুকে একটা ছোট্ট ডিঙ্গির মতোই তলিয়ে গিয়েছিলো। 
 
                                               পরীক্ষার পর আয়েশাকে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিলো উত্তরবঙ্গে ওর মাসির বাড়িতে।ওর সঙ্গে সায়কের শেষ দেখা হয়েছিলো স্কুলে মার্কশিট দেওয়ার দিন। গেটের সামনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষারত সায়ক আয়েশাকে দেখে ডাক দিয়েছিলো কিন্তূ সে শুধুই ফিরে তাকিয়েছিল কোন কথাই বলেনি।তবে ওর টানা চোখের দৃষ্টিটা দেখেই সায়ক ওর অব্যক্ত কথা গুলো বুঝতে পেরেছিলো।সেদিনের পর আর কোন দিনই আয়েশার সঙ্গে দেখা হয়নি সায়কের।   
 
 
                                                                                   দশ বছর বাদে সায়কের এই কথাগুলো খুব মনে পড়ছে।এই দশ বছরে অনেক কিছুই বদলে গেছে,সায়ক এখন কলকাতার  একটি মাল্টি ন্যাশনাল কোম্পানির ম্যানেজিং ডিরেক্টর,ভীষণ ব্যস্ত এখন,বছরে মাত্র দু একবার বাবা মায়ের সঙ্গে দেখা করতে আসে।আজ অবনী বিদ্যানিকেতনের হীরক জয়ন্তী উৎসব ছিল।সকল প্রাক্তনীরা এখানে আমন্ত্রিত হয়েছিলো।অনেকদিন বাদে সায়ক ওর পুরোনো স্কুলে গিয়েছিল, ওর ব্যাচমেটদের মধ্যে তিয়াসা,সৌমেন,অভিরূপ,বিক্রম অনেকেই এসেছিল আজ।অনেকদিনবাদে দেখা হওয়াতে সবাই খুব আবেগপ্লুত হয়ে গিয়েছিল।তবে এই চেনা মানুষের ভিড়ে সায়ক ওর আকাঙ্খিত মানুষটির মুখ খুঁজে পায়নি।এত ভিড়ের মাঝেও কিছু একটা অপূর্ণতা অনুভূত হচ্ছিল।। 
 
 
                                                          স্কুলের অনুষ্ঠান থেকে রাতে বাড়ি ফিরে সায়ক খোলা ছাদে গিয়ে দাঁড়িয়েছে। মাথার উপর  বিস্তৃত আকাশের নিচে ,অজস্র তারা ঝিকমিক করছে।পুরোনো ক্ষতটাতে কেউ যেন আজ আবার নতুন করে খোঁচা দিয়েছে।আলবাম থেকে সেই গ্রূপ ফটোটা বের করেছে সায়ক,বারবারই চোখটা আটকে যাচ্ছে আয়েশার দিকে। স্মৃতিপটে সেই পুরোনো স্মৃতিগুলো ভিড় করে আসছে,সেই ঝাউবন আর ঝিলম নদীর পাড়ে আয়েশার সাথে কাটানো মুহূর্তগুলো, আয়েশার সেই মৃদু স্পর্শ,চুলের গন্ধ,আর পাহাড়ি নদীর উচ্ছলতার মত হাসি……সব যেন মিলেমিশে কয়েক মুহূর্তের জন্য সায়ককে নিয়ে গেছে দশ বছর আগের সময়টাতে।হাতের সিগারেটটা কখন যেন নিজের অজান্তেই নিভে গেছে,একটা পেঁচার ডাকে সায়কের সম্বিত ফিরলো।রাত অনেক হয়েছে ,আর নয়,কাল যে আবার ফিরতে হবে।   

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *