ছিট ছিট দাগ – পর্ব — ২ — সিদ্ধার্থ সিংহ

bangla sahitya


— তার পর?
— তার পর আর কী? একের পর এক প্রচুর ডাক্তার দেখিয়েছি। পাতার পর পাতা ওষুধ খেয়েছি। এ মলম লাগিয়েছি। সে মলম লাগিয়েছি। কিন্তু যে কে সে-ই। এখন হাল ছেড়ে দিয়েছি।
— ট্রপিক্যালে আর যাওনি?
— নাঃ।
— কেন?
— রোজ রোজ কে নিয়ে যাবে?
— নিয়ে যাওয়ার কী আছে? তুমি কি বাচ্চা নাকি, কোলে করে নিয়ে যেতে হবে? একাই যাবে।
— ও বাবা, মেয়ে না! আমাদের বাড়ি থেকে ছাড়বেই না। ভীষণ স্ট্রিক্ট।
— তার পর? 

— তার পর এই তো কিছু দিন আগে একটা চ্যানেলে এই ডাক্তারকে দেখলাম। তখনই জানতে পারলাম এনার কথা। শেষ চেষ্টা হিসেবে এঁকে একবার দেখাব ঠিকও করলাম। অনেক খুঁজেপেতে ওনার ঠিকানাও জোগাড় করলাম। যোগাযোগও করলাম। কিন্তু যা শুনলাম! তিন মাসের আগে ওনার কোনও ডেটই পাওয়া যাবে না…
— তুমি দেখাতে চাও? 

হাতের মুঠোয় যেন স্বর্গ পেয়েছে, এমন ভাবে ত্রিধা বলল, দেখো না, যদি একটা ডেট পাওয়া যায়…
— ডেট পাওয়ার কী আছে? কবে যেতে চাও বলবে, নিয়ে যাব।
— আগে তো জানতে হবে উনি কোথায় কোথায় বসেন?
— তোমাকে নিয়ে গেলে কি ওঁর চেম্বারে নিয়ে যাব?
— তবে? 

সহজ ভঙ্গিতে রত্নাঙ্ক বলল, ওঁর বাড়িতে নিয়ে যাব।
— বাড়িতে!
— হ্যাঁ। আরে বাবা, আমার সঙ্গে কি আজকের সম্পর্ক নাকি?
সে দিনই ত্রিধা বলেছিল, তা হলে তুমি ডাক্তার সান্যালের সঙ্গে কথা বলো না… উনি যদি কাছাকাছি কোনও একটা ডেট দিয়ে দেন…
— ডেট নেওয়ার কী আছে? তুমি যে দিন যেতে চাও বলবে, নিয়ে যাব।
— না… উনি কবে থাকবেন, না-থাকবেন… 

তাকে কথা শেষ করতে না দিয়ে রত্নাঙ্ক বলল, ঠিক আছে। আমি কালই কথা বলে নেব। চলো। 
কিন্তু না। সেই কাল আর কোনও দিনই আসেনি রত্নাঙ্কর। অবশ্য আসেনি বললে ভুল হবে, ও-ই চায়নি। ডাক্তার দেখালে… না। থাক। 

কিন্তু কত কাল আর এ ভাবে ওকে এটা সেটা বানিয়ে বানিয়ে বলে এড়িয়ে যাওয়া যায়! যত বার ত্রিধা জি়জ্ঞেস করে, কি গো, ডাক্তার সান্যালের সঙ্গে কথা হয়েছে? তত বারই কোনও না-কোনও একটা অজুহাত তুলে ধরে ও। আজ ফোনে পাইনি। কিংবা উনি মিটিংয়ে ছিলেন। বা অপারেশনে ছিলেন। নয়তো, কয়েক দিনের জন্য উনি একটু বাইরে গেছেন। অথবা যত বারই করেছি, শুধু এনগেজড আর এনগেজড… 

কিন্তু না। কাল আর কোনও অজুহাত খুঁজে পায়নি ও। বাইপাশের ধার ঘেঁষে পাশাপাশি হাঁটতে হাঁটতে ত্রিধা এমন করে বলছিল যে, ডাক্তার সান্যালকে ফোন না করে ও আর পারেনি। বাধ্য হয়ে তার সামনেই ফোন করেছিল। রিং হতেই না-হতেই ত্রিধা বলেছিল, স্পিকারটা অন করো না… অন করো… অন করো …
ওর কোনও উপায় ছিল না। স্পিকার অন করে দিয়েছিল। অন করতেই, ও প্রান্ত থেকে ভেসে এসেছিল, হ্যালো…
— আমি রত্নাঙ্ক বলছি। 

— হ্যাঁ, বল…
— বলছিলাম, আমার একটা পরিচিত মেয়ে আপনাকে দেখাতে চায়, তাই একটা ডেট…
— আরে, তোর পরিচিত লোককে নিয়ে আসবি, এতে এত হেজিটেট করার কী আছে! নিয়ে আয়।
— কবে যাব?
— কাল সকালে তো আমি বাড়িতে বসব। চলে আয়।
— সে তো দশ জনের বেশি দেখেন না।
— না-হয় তোর জন্য কাল এগারো জনকে দেখব, কী আছে, চলে আয়।
— ঠিক আছে। 

এত সহজে যে অ্যাপয়েন্টমেন্টটা হয়ে যাবে ত্রিধা ভাবতেই পারেনি। সে একেবারে অভিভূত হয়ে গিয়েছিল। তার পরে যতক্ষণ দু’জনে একসঙ্গে ছিল, আর অন্য কোনও কথা নয়, শুধু ডাক্তারকে নিয়েই কথা হয়েছিল।
রাত্রেও তাই। ফোন ছাড়ার আগে ত্রিধা জিজ্ঞেস করেছিল, তা হলে কাল কখন বেরোব?
রত্নাঙ্ক বলেছিল, সকালে।
— সে তো জানি। কিন্তু সকালে মানে কত সকালে? ক’টা নাগাদ? আমাদের যেতেও তো সময় লাগবে।

— ওই বেরিয়ো না… তোমার সুবিধে মতো… বেরোবার আগে আমাকে শুধু একটা ফোন করে নিয়ো।
মুখে এ কথা বললেও, রত্নাঙ্কর একদম ইচ্ছে নয়, ত্রিধাকে নিয়ে ডাক্তারের কাছে যাওয়ার। কারণ, এই ডাক্তার সান্যালদা চর্মরোগের ক্ষেত্রে একেবারে ধন্বন্তরী। তাঁর বিশ্বাস, একবার গেলেই উনি এমন ওষুধ দেবেন যে, দু’-চার দিনের মধ্যেই ত্রিধার গালের ওই ছিট ছিট দাগগুলো একবারে মিলিয়ে যাবে। আর ওটা মিলিয়ে গেলেই, সে মুখ আরও সুন্দর হয়ে উঠবে। শুধু সুন্দর হলে না-হয় একটা কথা ছিল। কিন্তু তার থেকেও বড় কথা, যে মুখ নিয়ে আর পাঁচ জনের সামনে যেতে তার লজ্জা করে। যে মুখ নিয়ে সে হীনমন্যতায় ভোগে। কারও সামনে যেতে চায় না। সে সব একেবারে চিরদিনের জন্য ঘুচে যাবে। তখন! 

ও ত্রিধাকে বলেছিল, বেরোবার আগে আমাকে শুধু একটা ফোন করে নিয়ো। কিন্তু না। একটা নয়, রত্নাঙ্ক স্নান করে এসে দেখল, তার মোবাইলে তেরোটা মিসড্ কল। তেরোটাই ত্রিধার। এই ফোনটারই ভয় পাচ্ছিল সে। এখন উপায়! কিছু তো একটা বলতে হবে! কিন্তু কী বলবে ও! কি! 

না। ত্রিধাকে নয়। ও ফোন করল ডাক্তার সান্যালকে। যত বার ফোন করল, প্রত্যেক বারই এনগেজড টোন। আর যত এনগেজড টোন পেতে লাগল, ততই ও অস্থির হয়ে উঠতে লাগল। কিন্তু তার  পরেই ও আবার যখন ফোন করল, তখন একটা রিং হতে না-হতেই ফোন ধরলেন উনি। সঙ্গে সঙ্গে ও বলল, হ্যালো, আমি রত্নাঙ্ক। বলছিলাম কি, আজকে যাকে নিয়ে আপনার ওখানে যাওয়ার কথা ছিল, সে এখন ফোন করে জানাল, তার মা নাকি গত কাল রাতে হঠাৎ করেই খুব অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। তাঁকে একটা নার্সিংহোমে ভর্তি করাতে হয়েছে। সারা রাত নাকি ওরা ওখানেই ছিল। ফলে আজ ওর পক্ষে যাওয়া… 

— ঠিক আছে। অন্য দিন নিয়ে আসিস। ও.কে।
ডাক্তার সান্যাল লাইন কাটতেই রত্নাঙ্ক ফোন করল ত্রিধাকে। ও কিছু বলার আগেই ত্রিধা বলল, কী হল, তখন থেকে ফোন করছি। কোথায় ছিলে?
— ডাক্তার সান্যালের বাড়িতে। 
— ডাক্তার সান্যালের বাড়িতে!
— তা হলে আর বলছি কি। এই তো ওঁর বাড়ি থেকে এলাম।
— কী হয়েছে?
— না। ওঁর কিছু হয়নি। হয়েছে ওঁর বাবার। আসলে আজ ভোররাতে উনি নাকি বাথরুমে পড়ে গেছেন। পড়ে গিয়েই একটা স্মাইল স্টোকের মতো… বয়স হয়েছে তো…
— সে কী! এখন কেমন আছেন? 

— এখন বিপদমুক্ত। ভাগ্যিস উনি বাড়িতে ছিলেন। না-হলে যে কী হত, কে জানে! উনি অবশ্য রিক্স নেননি। সঙ্গে সঙ্গে নার্সিংহোমে নিয়ে গিয়েছিলেন। বড় বড় ডাক্তাররা তো সবই ওঁর বন্ধুবান্ধব। তাঁরা নাকি বলেছেন, এ যাত্রা উনি বেঁচে গেলেন… তবে ডাক্তাররা ও কথা বললেও, ডাক্তার সান্যাল কিন্তু খুব টেনশনে আছেন। তারই মধ্যে কে যেন তাঁকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, বাড়িতে আপনার জন্য পেশেন্টরা তো সব বসে আছেন, কী করবেন? উনি তখন আমার সামনেই তাঁকে ফোন করে বাড়িতে জানিয়ে দিতে বললেন, আজ আর উনি বসবেন না… কেউ যেন অপেক্ষা না করেন…
— ও… তাই…
— তোমাকে অন্য কোনও দিন নিয়ে যাব। কেমন? 

— না না। সে ঠিক আছে। অন্য দিন যাবখ’ন। আমি সেটা বলছি না। বলছি, তুমি বরং পারলে বেলার দিকে একবার গিয়ে ওনাকে দেখে এসো। বুঝেছ? তুমি ফোন ধরছ না দেখে আমি তো ভাবলাম তোমার আবার কী হল…
— আরে, তাড়াহুড়োর মাথায় বেরিয়েছি তো… ফোন নিতে ভুলে গিয়েছিলাম।
— ও…এখন কী করছ?
— এই তো সবে ওখান থেকে এলাম। এখনও হাতমুখ ধুইনি। 

— ঠিক আছে, ঠিক আছে। যাও। ফ্রেশ হয়ে নাও। পরে কথা হবে।
অন্য সময় হলে ইনিয়ে-বিনিয়ে রত্নাঙ্ক আরও কিছুক্ষণ কথা বলত। কিন্তু না। আজ আর একটাও কথা বাড়াল না ও। কী বলতে কী বলে ফেলবে, তখন আর এক কেলেঙ্কারি। কোনও মিথ্যেকে ও বেশিক্ষণ টেনে নিয়ে যেতে পারে না। ধরা পড়ে যেত। সে জন্যই তাড়াতাড়ি ফোনটা ছেড়ে দিল। 

ফোন ছাড়ার পরেই তার মনে হল, এটা কি ও ঠিক করল! ও যে ভয়টা করছে… গালের দাগগুলো মিলিয়ে গেলে সে আরও দেখতে সুন্দর হয়ে যাবে। অনায়াসে এখানে ওখানে যাবে। এর তার সঙ্গে আলাপ হবে। আর সে রকম কোনও ছেলে পেয়ে গেলেই আলাপ থেকে বন্ধুত্ব। বন্ধুত্ব থেকে মেলামেশা। মেলামেশা থেকে ঘনিষ্ঠতা। ঘনিষ্ঠতা থেকে নিবিড় সম্পর্ক। আর অন্য কারও সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে উঠলেই আস্তে আস্তে তাকে দূরে সরে যেতে হবে… এটা তো অমূলকও হতে পারে। পারেই। তা হলে ! 

আমি কি তাকে ডাক্তার সান্যালের কাছে নিয়ে যাব! না, যাব না! যাব! না, যাব না! যাব! না, যাব না! রত্নাঙ্ক ভাবতে লাগল। ভাবতেই লাগল। 
—  শেষ  পর্ব  —  

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *