ছিট ছিট দাগ — পর্ব – ১ – সিদ্ধার্থ সিংহ

Golpo sahitya
রত্নাঙ্ক স্নান সেরে এসে দেখল তেরোটা মিসড্ কল। তেরোটাই ত্রিধার। এই ফোনটারই ভয় পাচ্ছিল সে। অন্যান্য দিনের মতো গত কালও অনেক রাত অবধি কথা হয়েছে ওর। ও বলেছিল, না। তাকে একা যেতে হবে না। আমিই সঙ্গে করে তোকে ডাক্তার সান্যালের কাছে নিয়ে যাব। 

ডাক্তার সান্যাল স্কিনের খুব বড় নামকরা ডাক্তার। তাঁর অ্যাপার্টমেন্ট পাওয়াই ভাগ্যের ব্যাপার। এখন বারোশো টাকা ভিজিট। তাও ডেট পাওয়ার জন্য তিন মাস আগে থেকে নাম বুক করে রাখতে হয়। তবে হ্যাঁ, নিজের বাড়িতে প্রতি সপ্তাহে একদিন সকালে ঘণ্টা তিনেক করে বসেন। মায়ের নামে চেম্বার। মা খুব বর্ধিষ্ণু পরিবারের মেয়ে হলেও বাবা ছিলেন অত্যন্ত ছাপোষা মানুষ।
সামান্য একটা চাকরি করতেন। বাড়ির কেউ রাজি হয়নি দেখে তাঁর বিয়ের জন্য মায়ের রেখে যাওয়া গয়নাগাঁটি নিয়ে এক শাড়িতেই তার বাবার সঙ্গে জামশেদপুর থেকে পালিয়ে এসেছিলেন কলকাতায়। একটা কলোনিতে ঘর ভাড়া নিয়ে থাকতেন। খুব কষ্ট করেই চলতেন তাঁরা। তাঁদের যখন এই ছেলে হল, তখন তাকে তাঁর বাবা-দাদার মতো একজন ডাক্তার করার জন্য উঠেপড়ে লাগলেন তার মা। 

নিজেই পড়াতেন। স্বামীর টাকায় কুলোত না। তাই বাড়ি থেকে আনা গয়না থেকে একটা-একটা করে বিক্রি করে তিনি তাঁর ছেলের লেখাপড়ার খরচ চালাতেন। সেটা দেখে তাঁর যে দু’-চার জন বন্ধু ছিলেন, তাঁদের একজন বলেছিলেন, কী রে, গয়না বিক্রি করে ছেলেকে মানুষ করছিস? তোকে শেষ বয়সে ছেলে দেখবে তো! 

তিনি বলেছিলেন, আমি তো গয়না বিক্রি করছি না। আমি গয়না গড়াচ্ছি। 

সত্যিই তাঁর ছেলে তাঁর অলঙ্কার হয়ে উঠেছিল। দুর্দান্ত ভাল রেজাল্ট করে ডাক্তারিতে চান্স পেয়েছিল। আর চান্স পেয়েই আধুনিক চিকিৎসা নিয়ে ও এত মেতে উঠেছিল যে শুধু সহপাঠীদেরই নয়, অনেক সিনিয়রকেও মাত্র কয়েক বছরের মধ্যেই পিছনে ফেলে অনেকটা এগিয়ে গিয়েছিল। 

সেই মা আর নেই। তিনিও অনেক বড় হয়েছেন। যথেষ্ট টাকাপয়সা রোজগার করেছেন। বিশাল একটা প্রাসাদোপম বাড়ি বানিয়েছেন। সেই বাড়ির নাম রেখেছেন মায়ের নামে। যত কাজই থাক, প্রতি সপ্তাহে একেবারে নিয়ম করে সেখানে বসেন। আগে থেকে নাম লেখানোর কোনও ব্যাপার নেই। আগে আসার ভিত্তিতে প্রথম দশ জনকে তিনি দেখেন। না।
বিনে পয়সায় নয়। তিনি মনে করেন, বিনে পয়সায় কিচ্ছু হয় না। সামান্য হলেও কিছু দাও। তাই টিকিটের দাম রেখেছেন এক টাকা। ফলে সকাল থেকে নয়, তাঁকে দেখাবার জন্য আগের দিন রাত থেকেই লাইন পড়ে যায়। 

এই ডাক্তারের সঙ্গে রত্নাঙ্কর খুব ভাল সম্পর্ক। সম্পর্ক ভাল হওয়ার কারণ, ডাক্তার সান্যালের মা। তিনি ওকে খুব পছন্দ করতেন। ভালও বাসতেন। ডাক্তার সান্যাল তো তাঁর ডাক্তারি নিয়েই সারা দিন ব্যস্ত থাকতেন। তাই তাঁর ইচ্ছে থাকলেও মাকে খুব একটা সময় দিতে পারতেন না। তাঁর মা শনিবার-শনিবার উপোস করে বড় ঠাকুরের পুজো দিতে যেতেন পাশের পাড়ায়। টুকিটাকি জিনিস কিনতে যেতেন এ দিকে ও দিকে। কোনও কোনও দিন বাচ্চাদের একটা  অনাথ আশ্রমে যেতেন ফলমূল দিতে। 

এর পাশাপাশি তাঁর আর একটা শখ ছিল, ফুল গাছের। প্রায়ই সার আর চারা গাছ কেনার জন্য এ নার্সারি ও নার্সারিতে ঢু মারতেন। তখন তাঁর সঙ্গে যেত এই রত্নাঙ্ক। রত্নাঙ্কর কোলেই মাথা রেখে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেছিলেন তিনি। না। ডাক্তার ডাকার কোনও সুযোগ দেননি। চলন্ত গাড়িতে হঠাৎ বুকে ব্যথা, ব্যাস। সব শেষ। সেই সুবাদেই ডাক্তার সান্যালের সঙ্গে রত্নাঙ্কর এত ভাল সম্পর্ক। 

রত্নাঙ্কর সঙ্গে সেই ছোটবেলা থেকেই এক স্কুলে পড়ত ত্রিধা। ক্লাস এইট পর্যন্ত ওই স্কুলেই ছিল। তার পর ত্রিধারা বাড়ি কিনে চলে যায় বাইপাসের ধারে, পঞ্চান্ন গ্রামে। বহু দিন কোনও যোগাযোগ ছিল না। এত দিন বাদে আবার নতুন করে দু’জনের দেখা। ভাল লাগা। 

এই নতুন আলাপ তখন সবেমাত্র তিন দিন গড়িয়ে চার দিনে পড়েছে। প্রেম হব হব করছে। তখন একদিন গড়িয়াহাট মোড়ের আলেয়া’য় সিনেমা দেখতে গিয়েছিল ওরা। হল থেকে বেরিয়ে দু’জনে সবে রাস্তা পার হতে যাবে, হঠাৎ তাদের সামনে ব্রেক কষে দাঁড়াল একটা ঝকঝকে অডি গাড়ি। পেছন সিটের জানালার কালো কাচ নামিয়ে মুখ বার করে রত্নাঙ্ককে গাড়ির সওয়ারি জিজ্ঞেস করলেন, কোন দিকে যাবি ? 

রত্নাঙ্ককে কথা বলতে দেখে ত্রিধা একটু সরে দাঁড়াল। লোকটাকে সে চেনে না। দু’জনকে পাশাপাশি দেখলে কী ভাববে কে জানে! যদি ওদের বাড়ির কেউ হয়! যদি কেউ নাও হয়, ওদের দেখে অতি উৎসাহী হয়ে যদি ওদের বাড়িতে গিয়ে বলে দেয়! সব জানাজানি হয়ে যাবে না! ওদের নিজেদের মধ্যেই এখনও সে রকম কিছু গড়ে ওঠেনি। রত্নাঙ্কর সমস্যা হবে না! তবু লোকটাকে আড়চোখে দেখার চেষ্টা করতে লাগল ত্রিধা। গাড়িঘোড়ার শব্দের মধ্যেও কান খাড়া করল, উনি কী বলছেন, যদি শোনা যায়!      

রত্নাঙ্ক জানে লোকটার বাড়ি ফার্ন রোডে। তাই সে বলল, আমি সোজা  যাব। রুবির দিকে।
— রুবি? চলে আয়। আমি তো রুবি হয়েই যাব।
এই রে, সেরেছে… নিজের মনেই বিড়বিড় করল রত্নাঙ্ক। কেন যে রুবির দিকে বলতে গেলাম!
— কী ভাবছিস? উঠে আয়। বলেই, গেটের লক খুলে সিটের ও দিকে সরে গেলেন তিনি।
সঙ্গে সঙ্গে আলতো করে দরজা ঠেলে জানালার কাছে মুখ নিয়ে রত্নাঙ্ক বলল, তার আগে আমাকে একবার ভারত সেবাশ্রম সঙ্ঘে যেতে হবে। তাই… 

— ও… ঠিক আছে, যা তা হলে। ভাল আছিস তো?
— হ্যাঁ। আপনি?
— এই তো… অনেক দিন তো আসিস না। মা নেই বলে কি আমরাও নেই? একদিন চলে আয় না…
— হ্যাঁ, যাব। এর মধ্যেই যাব। এখন আছেন তো?
— হ্যাঁ, এই মাসটা আছি। তার পর চার মাসের জন্য একটু বাইরে যাব।
পেছনে পর পর কয়েকটা গাড়ি দাঁড়িয়ে গেছে। তারা ঘনঘন হর্ন বাজাচ্ছে। অটোগুলো পাশ কাটিয়ে গাড়ির ও পাশ দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে। যেতে যেতে তাদের দিকে বিরক্তিসূচক চাহনি ছুড়ে দিচ্ছে। তাই রত্নাঙ্ক বলল, ঠিক আছে, ঠিক আছে… এর মধ্যেই যাব। বলেই, জানালা থেকে মুখ সরিয়ে নিল।
গাড়িটা জানালার কাচ তুলতে তুলতে হুস করে চলে গেল। গাড়িটা যেতেই ত্রিধা বলল, ইনি ডাক্তার সান্যাল না ? 

— হ্যাঁ। কেন? তুমি চেনো?
— না না। আমি চিনব কী করে! আমি বলছি, উনি নিজে থেকে গাড়ি থামিয়ে তোমার সঙ্গে কথা বললেন!
— হ্যাঁ, না বলার কি আছে! উনিও মানুষ। আমিও মানুষ।
গদগদ হয়ে ত্রিধা বলেছিল, উনি কত বড় ডাক্তার জানো?
— উনি কত বড় ডাক্তার আমি জানি না। তবে, উনি কত বড় মাপের মানুষ, সেটা আমি জানি।
— তোমাকে খুব ভাল করে চেনেন, না? 

রত্নাঙ্ক বলেছিল, কেউ যদি কোনও ভাইকে জিজ্ঞেস করে, তার দাদা তাকে খুব ভাল করে চেনে কি না, সেই প্রশ্নটা যেমন হবে, তোমার এই প্রশ্নটাও ঠিক সেই রকম…

— উনি তোমার দাদা?
— না। ঠিক দাদা নন। দাদার মতো। তবে দাদার চেয়েও বেশি…
ওটা শুনেই ত্রিধা বলেছিল, তাই? তা হলে ওনার সঙ্গে আমার একটা অ্যাপয়েন্টমেন্ট ফিক্সড করিয়ে দাও না…
— অ্যাপয়েন্টমেন্ট! কেন? কার জন্য? 

— এই দ্যাখো না, গালের এই ছিট ছিট দাগটা… আগে এইটুকুনি ছোট্ট একটা তিলের মতো ছিল। এত গাঢ়ও ছিল না। যত দিন যাচ্ছে, ততই বেড়ে যাচ্ছে। এই ক’বছরে এত বেড়ে গেছে না… কারও সামনে যেতে বড্ড লজ্জা করে।
— কোনও ডাক্তার দেখাওনি? 

— কত ডাক্তার দেখিয়েছি। প্রথমে আমাদের পাড়ার এক হোমিওপ্যাথি ডাক্তারকে দেখাতাম। কমছে না দেখে কে যেন বলেছিলেন, কোনও কবিরাজকে দেখাতে। তিনিই বোধহয় কারও নাম-ঠিকানা দিয়ে দিয়েছিলেন। বেশ কিছু দিন সেই কবিরাজকেও দেখিয়েছিলাম। কিন্তু যে কে সে-ই। কোনও লাভ হয়নি।
— তার পর?   
 — আমার বাবাকে তাঁর এক বন্ধু বলেছিলেন, ওই সব কবিরাজি-টাজি, হোমিওপ্যাথি-ফ্যাতি ছাড়। মেয়েকে ভাল কোনও ডাক্তার দেখা। 

— তার পর?
— আমাদের ওখানকার একজন বেশ নামকরা ডাক্তারকে দেখালাম। তিনিই দেখেটেখে রেফার করে দিলেন মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে। ট্রপিক্যালে। সেই সক্কালবেলায় যেতে হত। ওরা প্রথমে ভেবেছিল, আমার বুঝি কুষ্ঠ হয়েছে। তার পর ওখানকারই একজন বড় ডাক্তার বললেন, না না, কুষ্ঠ না। এটা একটা মামুলি চর্মরোগ। তবে অনেক দিনের পুরনো তো… গেড়ে বসেছে। সারতে একটু সময় লাগবে। কিন্তু অত সময় কার আছে! তাই বাবা বললেন, মেয়ে বলে কথা। 

গালে ও রকম দাগ থাকলে কেউ বিয়ে করবে? যত টাকা লাগুক রঞ্জিত পাঁজাকে দেখাব। উনি তখন স্কিনের এক নম্বর ডাক্তার। যে দিন বাবা আমাকে নিয়ে যাবেন ঠিক করলেন, তার আগের দিন রাত্রেই শুনলাম, তিনি মারা গেছেন। আমি তখন কত ছোট… 
চলবে  ……..

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *