শশাটী গ্রাম — সিদ্ধার্থ সামন্ত

sahitya bangla





রূপনারায়ণের তীরে গ্রামটি মোদের সবুজে সবুজে ভরা।
গাছে গাছে ঢেউ খেলে যায় মুক্ত শান্ত হাওয়া।
শব্দতা নিঃশব্দতা হলে রাতে যেমন সভা,
হাসি বলো চাঁদের আলো সত্যি রবি প্রভা।

 রাত জাগা পাখি গুলি জেগে ওঠে যখন,
ঘরের উঠানে আনন্দে সব ন্যাতা টানে তখন।
প্রভাত বেলায় পূব আকাশে,ভোরের আলো খেলে,
মিষ্টি মধুর প্রভাত খানি আঁখি দুটি মেলে।


ভ্রমরের যেমন আছে কথা ফুলের আছে নীরবতা ওলি বলে ফুলযে শোনে ফুল তাই মনলোভা।
হলুদ মাখা রোদের কিরণ গাছের পাতায় পাতায়, প্রজাপতি সব মেতে থাকে নতুন নতুন খেলায়।
মরাল-মরালী সোহাগ ভরে খেলে জলের সঙ্গে,
রবির কিরণ চিক মারে দিঘির চিকন অঙ্গে।


রঙ্গে গুঞ্জে অলি ভ্রমর মঞ্জুরীয়ায় ধায়,
চঞ্চলা বৈশাখী হাওয়া নূপুর পায়ে বায়।
এমন কত ছবি মোদের শশাটি গ্রামের মাঝে,
সব দুঃখ দূর হয়ে যায় বসলে নদী তটে।
ওই দুপুরে পুকুর ঘাটে এঁটো বাসন হাতে,


চলছে বধু ধীরে, পায়ের নুপুর বাজে,
মাথা ভর্তি কেশে, ঘোমটা টানা মাথে,
আরো পাড়ার বধু এঁটো বাসন মাজে।
মৃদুদখিন হাওয়া জলে জল তরঙ্গ খেলে,
আপন আপন মনে হাঁস গুলি গেঁড়ি ঝিনুক খোঁজে।


আপন আপন মনে পাড়ার কটা ছেলে,
এধার ওধার ঘুরে আম গাছের তলে। কচি আমের লোভে,
কথা কারুর না শুনে সারা দুপুর ঘুড়ে ।
খাঁ খাঁ দুপুরে ভিখারি বুড়ি দুয়ারে ভিক্ষা নিতে আসে। বাড়ির ভেতর থেকে ঝাঁঝিয়ে কে ওঠে,
দুঃখ ভরা মনে যায় যে সে ফিরে।


এঁটো বাসন মেজে ঘরে বধু আসে
 দুঃখ ভরা মন দেখে থাকতে না পারে।
মিনতি করে ডাকে ভিক্ষে দেয় নিজে হাতে,
ভিখারি বুড়ির আশীর্বাদে বধুর মন ভরে।
খাঁ খাঁ দুপুরে একা বধু বসে।
ছোট ছেলেদের ডাকে গল্পের আসর জমে।


বধুর গল্প শুনে ছেলেরা ঘরে ফিরে।
এমন কত ছবি মোর গ্রামের চারিপাশে।
টিয়া চলে ছাগল নিয়ে কোলে ছাগলছানা ,
পাড়ার ছেলেরা রাগিয়ে তোলে কেউ শুনে না মানা।
বয়স মোদের বারুক যতই ভোলা যায় কি এসব কথা। 
ধুলো মাটির ছোট্টবেলা ঘুরেছি হেথা সেথা।
তালসারির বাঁকে পাড়ার ছেলেরা কই?
অনেক বছর হয়নি দেখা অপেক্ষাতে রই।


তখন মোরা খেলেছি কত তালসারি ধারে, গোধূলি বেলায় সবাই মিলে ফিরতাম মরা ঘরে।
সারাটা দিন ছাগলনিয়ে টিয়া থাকত বসে,
চালচুলোহীন টিয়া থাকত কতই না আশে।
তালসারি স্মৃতিগুলো স্মৃতি হয়েই আছে,
ভোলা, রেবতী, শিবে,শান্ত পায়নি এদের কাছে।


চন্দন সুবাস সোঁদা মাটির আমন-বোরোর গ্রাম,
ভোরের বেলা শঙ্খধ্বনি ভরে উঠত প্রাণ,
ধর্ম তলায় দুর্গা ঠাকুর, কয়েক দিনের সেই মজা,
এতো বছরেও আছে মনে,খেতাম মিষ্টি জিবেগঁজা।
জন্মাষ্টমীতে জানা পাড়ায় দধী-কাদার ভীড়,
গামছা গলায় দাঁড়িয়ে থাকা, শেষে পেতাম নাড়ু মুড়কি।


নদীর ধারে বিকেল বেলায় মাইতি ঝুরিভাজা,
অর্ধ বেলায় এসেও দেখি মন এখনো তাজা।
রূপনারায়ণের মিষ্টি হাওয়ায় মন উঠতো ভরে,
নদীর মাঝে পাল তোলা নাও ছুটে তিরতিরে।
বটের ছায়া,শশাটী বাংলো আর ঠাকুরের বেদি,
নদীর চড়ে গল্প হতো মনে আছে সেদিন।


ভীম জানার রেশন দোকানে রবিবারের মেলা,
কোথায় আর পাবো বলো,শেষ হয়েছে বেলা।
গঙ্গা মেলায় বেশ কটা দিন গরম জিলিপির মজা,
পুতুল নাচের দৃশ্য গুলো নয়ন ভরে দেখা।
পৌষ পার্বণে পিঠে-পুলি খেজুর গুড়ের সাথে,


আদর করে দিত মা আয় খোকা ডাকে।
বয়স এখন যতই বাড়ুক ভুলিনি সেসব  কিছুই, পালপাড়ার কলসি হাঁড়ি মক্তব স্কুলের শিশু।
মাড়োতলায় শিবের গাজন আর হত ঝাঁপ,
এখন মোদের স্মৃতি শুধু মনের ভেতর ছাপ।
এসব এখন অনেক দূরে না পাই এসব দেখা,


পাকা ধানে সোনার আমেজ মনে অনেক ব্যথা।
জন্মভূমি স্বর্গ সম শশাটী গ্রামটি  মোর প্রিয়।
হে বিধাতা জন্ম মোর এই গ্রামেতে মরনটিও মোর দিও ।



  নিউ দিল্লি।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *