বার্মুদা রহস্য — পর্ব – ১৪ — সিদ্ধার্থ সিংহ

বার্মুদা রহস্য — পর্ব – ১১ – সিদ্ধার্থ সিংহ – ক্লিক করুন
বার্মুদা রহস্য — পর্ব – ১২ – সিদ্ধার্থ সিংহ – ক্লিক করুন
বার্মুদা রহস্য — পর্ব – ১৩ – সিদ্ধার্থ সিংহ – ক্লিক করুন

Bangla Sahitya
একবার নয়, দু’বার নয়, এই ভাবে পাঁচ-পাঁচ বার সমুদ্রের বুকে ভেসে উঠেছিল ওই জাহাজ। কিছুক্ষণ করে থেকে নিজে থেকেই আবার উধাও হয়ে গিয়েছিল সে। এই রহস্যের সমাধান করতে গিয়ে পদার্থ বিজ্ঞানীরা একটি বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব তুলে ধরার চেষ্টা করলেন। তাঁরা বললেন, পৃথিবী থেকে কোনও কিছুই চিরতরে হারিয়ে যায় না।
তাদের চিহ্ন থেকে যায় পৃথিবীর মধ্যেই। অনুকূল প্রাকৃতিক পরিবেশ পেলে সেগুলো আবার ফিরে আসে। ম্যাপল ব্যাঙ্কের ক্ষেত্রেও হয়তো এই ঘটনা ঘটেছে। তাঁদের যুক্তি না-হয় মেনে নিলাম, হারিয়ে যাওয়া কোনও কিছু ফিরে আসছে। কিন্তু মানুষ! যাঁরা আগুনে জ্বলেপুড়ে মারা গেছেন, তাঁরা জ্যান্ত অবস্থায় ফিরে আসছেন কী করে! এই ধন্দ্বের উত্তর মেলেনি আজও।
উত্তর মেলেনি পঁয়ত্রিশ ফুট দীর্ঘ প্রমোদতরণী কটোপ্যাকসি, ভ্যাগাবন্ড, ব্রিটিশ ট্র্যাঙ্কর হেলি-সোমা’র মতো অজস্র জাহাজের নিখোঁজ হয়ে যাওয়ার নেপথ্য কাহিনির। বোঝা যায়নি, তাদের কেউ কেউ ফিরে এসেছিল কেন! কেনই বা ফের শুরু করেনি স্বাভাবিক সব কিছু। রহস্যটা রহস্যই থেকে গেছে। সে রহস্যের উদ্ঘাটন কোনও দিন হবে কি না কে বলতে পারে!
শুধু কি সমুদ্রের বুকেই এই সব কাণ্ড হয়! আর কোথাও হয় না! না, সে কথা হলফ করে আর বলা যাবে না। কারণ, আকাশের বুকে গা ছমছম করা এমন বহু ঘটনা ঘটেছে, যা সমুদ্রে ঘটা ভয়ঙ্কর ঘটনাকেও ম্লান করে দিতে পারে। লোকে বলে, বার্মুদার আকাশেও নাকি ফাঁদ পাতা আছে।
সত্যিই কি তাই! মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ-পূর্বে ফ্লোরিডা স্টেটের সমুদ্রের ধার ঘেঁষে একটি ছোট্ট শহর আছে। তার নাম জ্যাকসনভিল। সেখানেই নেভাল অ্যারোনটিকসের বিমান ক্ষেত্র— সেসিল ফিল্ড। এখানে বৈমানিকদের ডাইভ বম্বিংয়ের ট্রেনিং দেওয়া হয়। যত দিন যাচ্ছে, ততই নতুন নতুন মারাত্মক বোমারু বিমান তৈরি হচ্ছে। আর তার প্রশিক্ষণ নেওয়ার জন্য তাঁদের উপস্থিত হতে হচ্ছে। কারণ, তখনও দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ চলছে।
মহড়ার জন্য ব্যবহার করা হত ডন্টলেস বিমান। সেই বিমানকে আরও একটু আধুনিকীকরণ করে তৈরি করা হল— হেল ডন্টলেস। এই ধরনের বোমারু বিমান প্রায় আড়াইশোখানার মতো ছিল সেখানে। প্রত্যেক দিন বিকেলে দু’ঘণ্টা করে বারোখানা বিমানের একটি দল একশো মাইল এলাকা ঘিরে মহড়া দিত। বারোটার মধ্যে দশখানায় থাকত শিক্ষার্থীরা।
প্রতি বিমানে দু’জন করে। একজন পাইলট আর অন্য জন বম্বার-রেডিওম্যান। প্রত্যেকেই দক্ষ এবং অভিজ্ঞ। বাকি দুটোয় থাকতেন প্রশিক্ষক। তাঁদের কথা না হয় না-ই বললাম। তাঁরা আকাশে চক্কর দিয়ে আবার নীচে ফিরে আসতেন। এটাই ছিল প্রতিদিনকার নিয়ম।
সে দিন আকাশ একেবারে পরিষ্কার। ঝকঝকে তকতকে। চমৎকার আবহাওয়া। কোথাও কোনও সামান্যতম ঝড়-বাদলেরও পূর্বাভাস নেই। তাই রোজকার মতো বারোটি বিমানের একটি দল মহড়া দিতে উড়ে গেল আকাশে। বিমানগুলো যতক্ষণ আকাশে থাকে, নীচের লোকেরা উৎকণ্ঠায় অপেক্ষা করেন। কখন কী হয় কিছু কি বলা যায়! যদিও নিরাপত্তার জন্য বৈমানিকদের গলায় ঝোলানো থাকে মে ওয়েস্ট নামে একটি আবরণী।
হাতের কাছে নির্দিষ্ট জায়গায় থাকে রবারের বোট। বোট বলা হলেও ওটা আসলে অত্যাধুনিক এক ধরনের প্যারাসুট। যদি কখনও কোনও বিপদ আসে, সঙ্গে সঙ্গে বিমানযাত্রীরা যাতে সেটা নিয়ে লাফিয়ে পড়তে পারেন। তাতে থাকে আপদকালীন খাদ্য এবং পানীয়। সঙ্গে থাকে অত্যন্ত প্রয়োজনীয় ওষুধপত্রের একটা বাক্সও।
এমনকী প্রতিটি বিমান আকাশে ওড়ার আগেই সব ক’টা যন্ত্রপাতি ভাল করে পরীক্ষা করে দেখে নেওয়া হয়। কোথাও কোনও বিন্দুমাত্র সমস্যা হতে পারে মনে হলেই, মুহূর্তের মধ্যে তা সারিয়ে নেওয়া হয়। অথবা সে দিনের মতো ওই বিমান বাতিল করে তার পরিবর্তে অন্য বিমানের ব্যবস্থা করা হয়।
এই বারোটা বিমানকেও ঠিকঠাক মতো পরীক্ষা করে দেখে নেওয়া হয়েছিল। কোথাও কোনও ত্রুটি নেই। বিকেল থেকে সন্ধ্যা গড়াল। অন্যান্য দিন যেমন সময়ে বিমানগুলো নেমে আসে। আজও নেমে এল। তবে না। বোরাটা নয়। মাত্র দশটা। বাকি দুটো কোথায় গেল! তাদের কী হল! কেউ কিচ্ছু বলতে পারলেন না। কারণ, তাঁরা কন্ট্রোল রুমে কোনও বিপদ সংকেত পাঠাননি। জানাননি যান্ত্রিক গোলযোগের কথাও। এমনকী উদ্ধারকারী দল পাঠাবার কথাও বলেননি একবারের জন্য। তা হলে কি মাঝ আকাশে কোনও দুর্যোগ দেখা দিয়েছিল!
বাকি দশটা বিমানে যাঁরা ফিরে এসেছিলেন, তাঁদের জবানবন্দি নেওয়া হল। তাঁরা বললেন, না, আকাশে কোনও বিপদের ছায়া তাঁরা দেখেননি। তেমন কালো মেঘও তাঁদের নজরে পড়েনি। বরং বলা যায়, অন্যান্য দিনের চেয়ে আকাশ একটু বেশিই ভাল ছিল। অনেক দূর পর্যন্ত সব পরিষ্কার দেখা যাচ্ছিল। এমন আবহাওয়ায় কোনও বিমানের বিপদে পড়ার কথাই নয়। তার উপরে এঁরা আবার দক্ষ পাইলট। তা হলে কী হল তাঁদের!
সঙ্গে সঙ্গে তাঁদের খুঁজে বার করতে পাঠানো হল সন্ধানী বিমান। বেপাত্তা হওয়া বিমানগুলোর মহড়া দেবার কথা একশো মাইলের মধ্যে। না, একশো মাইলের ভেতরে তাঁদের দেখা পাওয়া তো দূরের কথা, তাঁদের কোনও লেজও দেখা গেল না। হয়তো অন্য কোনও কারণে নির্ধারিত প্রশিক্ষিত এলাকা ছেড়ে তাঁরা দূরে কোথাও চলে গেছেন! এটা ভেবে, সেই অনুসন্ধানী বিমানগুলো একশো মাইলের গণ্ডি পেরিয়ে বহু বহু দূর অবধি তাঁদের খোঁজে উড়ে গেল। কিন্তু নিট ফল শূন্য। কোনও দুর্ঘটনার খবরও পাওয়া গেল না। মনে হল, তাঁরা যেন আকাশ ভেদ করে মহাশূন্যে বিলিন হয়ে গেছেন।
এই খবর শুনে সবাই বিস্মিত। অবাক। হতভম্ব। নিয়ম মতো গঠন করা হল তদন্ত কমিশন। সেই কমিশন গভীর অনুসন্ধান করে যে রিপোর্ট পেস করল, তাতে বলা হল, এটা একটা আনসলভড মিস্ট্রি। মানে, বহু অনুসন্ধান চালিয়েও এই রহস্যের কোনও কিনারা করা যায়নি। কেন যায়নি, সে নিয়ে ক্ষীণ উচ্চবাচ্য হলেও শেষ পর্যন্ত তা আর মাথা চাড়া দিয়ে ওঠেনি। ধামাচাপা পড়ে গিয়েছিল। লোকেরাও ধীরে ধীরে এক সময় ভুলে গেল এই ঘটনার কথা।
কিন্তু না, সে ঘটনার কথা ফের মনে করিয়ে দিল সেই বছরেরই পাঁচই ডিসেম্বরের আর একটি ঘটনা। ঘটনাস্থল ফ্লোরিডারই ফোর্ট লডারডেল এয়ার স্টেশন। এখানেও বিমানচালকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। শিক্ষার্থী হলেও কেউই কিন্তু একদম আনাড়ি নন।
এক-একজনের কম করে সাড়ে তিনশো থেকে চারশো ঘণ্টা পর্যন্ত আকাশে ওড়ার অভিজ্ঞতা আছে। প্লেনে ওড়ার সময়ে আলাদা করে তাঁদের আর প্রশিক্ষক লাগে না। একা একাই বিমান চালাতে পারেন। বিমানের খুঁটিনাটি সব কলাকৌশল তাঁদের হাতের মুঠোয়। যে কোনও বিপদের মোকাবিলা করার সমস্ত ক্ষমতা তাঁদের করায়ত্ব।
তাঁরা ডঙ্কলেস বা হেল ড্রাইভার বিমান চালান না। চালান তারও চেয়ে অনেক ধাপ এগিয়ে থাকা টিবিএম অ্যাভেঞ্জার টর্পেডো বম্বার। এগুলো অত্যাধুনিক বোমারু বিমান। ডানা বাহান্ন ফুট পর্যন্ত ছড়ানো। ইঞ্জিনের শক্তি অন্তত এক হাজার ছ’শো হর্স পাওয়ার। প্রতি ঘণ্টায় ছুটতে পারে তিনশো মাইলের মতো। অবলীলায় বইতে পারে দু’হাজার পাউন্ড টর্পেডো বোমা।

টর্পেডো বোমার বিশেষত্ব হল, জলে পড়ে টর্পেডোর মতো ছুটে গিয়ে নির্দিষ্ট জাহাজে আছড়ে পড়ে। তাই আকাশে অ্যাভেঞ্জার বিমান দেখলেই জাহাজের নাবিকদের বুক শুকিয়ে যায়। বুঝতে পারে মৃত্যুদূত দুয়ারে এসে দাঁড়িয়েছে। এই সব প্লেনে তিন জন করে বৈমানিক থাকেন। একজন পাইলট, একজন রেডিওম্যান আর একজন গানার। এঁরা প্রত্যেকেই এই জাতীয় বিমান অন্তত পঞ্চান্ন ঘণ্টা করে আকাশে উড়িয়েছেন। ফলে অত চিন্তার কোনও কারণ নেই।
ফ্লাইড লিডারের বিমানে দু’জন। বাকি চারখানা বিমানে তিন জন করে মোট চোদ্দো জন। অনেকেই এই অভিযানে যাবার জন্য আগ্রহ দেখিয়েছিলেন। কিন্তু তাঁদের মধ্যে থেকে নানা রকম পরীক্ষা-নিরীক্ষা নিয়ে এই চোদ্দো জন বৈমানিককেই বিশেষ ভাবে বেছে নেওয়া হয়েছিল। কারণ এঁদের প্রত্যেকেরই তেরো মাস থেকে ছ’বছর অবধি আকাশে ওড়ার অভিজ্ঞতা ছিল। শুধু তাই-ই নয়, একজন বৈমানিকের যে সব গুণসথাকা দরকার, ওঁদের সবারই তা ছিল। অসম্ভব সাহসীও ছিল ওঁরা। তাই ওঁদের নিয়ে গড়ে উঠেছিল স্কোয়াড্রন। এই মহড়ার নাম দেওয়া হয়েছিল— ফ্লাইট-নাইন্টিন।
সে দিনের মহড়ার ছক তাঁরা খুব ভাল ভাবেই বুঝে নিয়েছিলেন। আকাশে উঠে তাঁরা প্রথমে পূর্ব দিকে যাবেন একশো ষাট মাইল। তার পর উত্তরে চল্লিশ মাইল। তার পরে বিমানের মুখ ঘুরিয়ে নেবেন দক্ষিণ-পূর্ব দিকে। মানে, একটি ত্রিভূজের মতো চক্কর মেরে তাঁরা নেমে আসবেন নীচে। বোঝার কোনও সমস্যা নেই। এটা তাঁদের নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার।
সে দিন সকাল থেকে আকাশের মুখ এমন ভার যে, মনে হচ্ছিল এই বুঝি বাতিল হয়ে যাবে মহড়া। কিন্তু বেলা গড়াতে না-গড়াতেই আকাশের মতিগতি পাল্টে গেল। থিতু হয়ে গেল ঝোড়ো হাওয়ার দাপট। কিছুক্ষণের মধ্যেই আকাশ নিপাট পরিষ্কার। স্কোয়ার্ডনের চোদ্দো জনই বুঝতে পারলেন, ওঁরা যে ভেবে রেখেছিলেন, আকাশে উড়তে না-হলে সন্ধ্যাবেলায় এয়ার বেস থিয়েটারে নতুন যে নাটক আজ মঞ্চস্থ হবে, সেটা দেখতে যাবেন কিংবা সব বন্ধুরা মিলে হইহুল্লোড় করে কাটিয়ে দেবেন, তা আর হবার নয়। তাঁদের ট্রিপটা বাতিল হচ্ছে না।

চলবে   ————

বার্মুদা রহস্য — পর্ব – ১ – সিদ্ধার্থ সিংহ — ক্লিক করুন
বার্মুদা রহস্য — পর্ব – ২ – সিদ্ধার্থ সিংহ — ক্লিক করুন 
বার্মুদা রহস্য — পর্ব – ৩ – সিদ্ধার্থ সিংহ  — ক্লিক করুন
বার্মুদা রহস্য – পর্ব – ৪ – সিদ্ধার্থ সিংহ –  ক্লিক করুন
 বার্মুদা রহস্য – পর্ব – ৫ – সিদ্ধার্থ সিংহ  — ক্লিক করুন
 বার্মুদা রহস্য – পর্ব – ৬ – সিদ্ধার্থ সিংহ –  ক্লিক করুন
বার্মুদা রহস্য – পর্ব – ৭ – সিদ্ধার্থ সিংহ  – ক্লিক করুন
বার্মুদা রহস্য – পর্ব – ৮ – সিদ্ধার্থ সিংহ  – ক্লিক করুন
বার্মুদা রহস্য – পর্ব – ৯ – সিদ্ধার্থ সিংহ –  ক্লিক করুন
বার্মুদা রহস্য – পর্ব – ১০ – সিদ্ধার্থ সিংহ – ক্লিক  করুন

বার্মুদা রহস্য — পর্ব – ১১ – সিদ্ধার্থ সিংহ – ক্লিক করুন
বার্মুদা রহস্য — পর্ব – ১২ – সিদ্ধার্থ সিংহ – ক্লিক করুন
বার্মুদা রহস্য — পর্ব – ১৩ – সিদ্ধার্থ সিংহ – ক্লিক করুন

বার্মুদা রহস্য — পর্ব – ২৩ – সিদ্ধার্থ সিংহ – ক্লিক করুন 

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *