বার্মুদা রহস্য — পর্ব – ১৬ — সিদ্ধার্থ সিংহ



Bangla Sahitya



বার্মুদা রহস্য — পর্ব – ১৬ — সিদ্ধার্থ সিংহ

কিন্তু এই বার্তা পাঠাবার পরে নিশ্চয়ই কোনও গন্ডগোল হয়েছিল, না-হলে এর পরে স্টার টাইগার আর কোনও বিপদ-সংকেত বা অন্য কোনও বার্তা পাঠাল না কেন। সম্ভবত পাঠাবার কোনও সুযোগই পায়নি। ওঁরা কোনও খবর পাঠাচ্ছেন না দেখে বার্মুদা টাওয়ার থেকেই বারবার বেতার-মারফত যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু সব চেষ্টাই বিফলে যায়। কী হয়েছে ওঁদের! তবে কি ওঁরা কোনও বিপদে পড়েছেন!
ওঁদের সাহায্য করার জন্য সঙ্গে সঙ্গে উদ্ধারকারী বিমান আকাশে ডানা মেলল। জলে নেমে পড়ল জাহাজ। কিন্তু টানা পাঁচ দিন ধরে পাগলের মতো তন্নতন্ন করে অনুসন্ধান চালিয়েও ওই বিমানের কোনও খোঁজ পাওয়া গেল না। খোঁজ পাওয়া গেল না হঠাৎ করে এই ভাবে উধাও হয়ে যাওয়ার কারণও। যেমন কারণ খুঁজে পাওয়া যায়নি এক এরিয়াল অয়েল ট্যাঙ্কারের রহস্যজনক অন্তর্ধানও।
আকাশে উড়তে উড়তে যদি কোনও বিমানের তেল ফুরিয়ে যায়, তা হলে এই অয়েল ট্যাঙ্কারগুলো আকাশে উঠে পাইপের সাহায্যে সেই বিমানে তেল ভরে আবার নীচে নেমে আসে। এই কাজটি করা হয় অত্যন্ত সাবধানে এবং নিখুঁত ভাবে। পুরোটাই যান্ত্রিক ব্যাপার। মানুষকে খুব একটা কিছু করতে হয় না। ফলে সামান্য ভুলচুক হওয়ারও সম্ভাবনা থাকে না।
সে দিনের তারিখটা ছিল উনিশশো তেষট্টি সালের আট জানুয়ারি। ছ’ইঞ্জিন যুক্ত একটি কে বি-ফিফটি অয়েল ট্যাঙ্কার ভার্জিনিয়া স্টেটের ল্যাংলি এয়ারফোর্স বেস থেকে আকাশে পাড়ি জমাল। অন্য একটি বিমানে তেল ভরার জন্য। ঘড়িতে তখন বেলা এগারোটা সতেরো মিনিট মিনিট। তেল ভরে সে সোজা চলে যাবে অ্যাজোরস দ্বীপের ল্যাজেস ফিল্ডে। মোটামুটি সন্ধ্যা সাতটা বাজার এক মিনিট আগেই তার পৌঁছে যাওয়ার কথা।
অয়েল ট্যাঙ্কারটির কমান্ডার মেজর রবার্ট টনি এর মধ্যেই একজন বিশিষ্ট বৈমানিক হিসেবে যথেষ্ট নাম করেছেন। চার হাজার ঘণ্টা বিমান চালানোর বিরল অভিজ্ঞতা আছে তাঁর। বিশেষ করে এই ধরনের বিমান পরিচালনার কাজে অসামান্য দক্ষতা দেখিয়েছেন। এক কথায়, তাঁর মতো সুদক্ষ এবং অভিজ্ঞ পাইলট পাওয়া সত্যিই দুষ্কর।
দুপুর নাগাদ হঠাৎ বিপদ সংকেত পাঠাতে শুরু করলেন তিনি। তাতে জানা গেল, কেপ চার্লসের আড়াইশো মাইল পুব দিকে রয়েছেন তিনি। কিন্তু তিনি যে কী ধরনের বিপদের মুখোমুখি হয়েছেন, তা তাঁর বার্তায় স্পষ্ট করে কিছু বোঝা গেল না। বার্তাটা অস্পষ্ট এবং ক্ষীণ। মনে হচ্ছিল, তাঁর গলা যেন রুদ্ধ হয়ে গেছে। কথা বলতে পারছেন না।
যে সময়ে বিমানটির ল্যাজেস ফিল্ডে পৌঁছনোর কথা, পৌঁছল না। কোথায় গেল! কোথায় গেল! কোথায় গেল! শুরু হল খোঁজাখুঁজি। একটানা ছ’দিন ধরে আকাশ, সমুদ্র আর বিস্তৃর্ণ জমি তোলপাড় করা হল। পুঙ্খানুপুঙ্খ ভাবে তল্লাশি চালানো হল। অথচ কে বি-ফিফটি প্লেনখানির কোনও সন্ধান পাওয়া গেল না। চিরদিনের মতো আকাশে বিলীন হয়ে গেল সে।
আচমকা বিলীন হয়ে গেল মিয়ামি থেকে দুশো আশি মাইল দূরে সাউথ বাহামা সমুদ্রের বুক থেকে এয়ারফোর্সের সি-১১৯ ফ্লাইং বক্সকারও। তাতে ছিলেন দশ জন বৈমানিক। সে খবর তার পর দিন ছাপা হয়েছিল মিয়ামি হেরাল্ড পত্রিকায়। অর্থাৎ উনিশশো পঁয়ষট্টি সালের সাত জুন, সোমবার।
দুই ইঞ্জিনওয়ালা বিশাল এই উড়োজাহাজটা শনিবার সন্ধ্যা সাতটা সাতচল্লিশ মিনিটে হোমস্টেড এয়ারফোর্স বেস থেকে রওনা হয়েছিল। যাচ্ছিল দক্ষিণ বাহামার ক্রুকেড আইল্যান্ডের কাছে গ্র্যান্ড টুর্ক বিমানঘাঁটিতে। নামার কথা রাত এগারোটা তেইশ মিনিটে। ওতে বোঝাই করা ছিল বিমানের অতি মূল্যবান বিভিন্ন পার্স। গন্তব্যে পৌঁছতে যখন আর মাত্র একশো মাইল বাকি, ঘড়িতে বেলা এগারোটা বাজে, যে কোনও সময় নেমে আসতে পারে মাটিতে, সে সময় রেডিও-মারফত ওই বিমানের চালক একবার কথা বলেছিলেন টাওয়ারের লোকজনদের সঙ্গে।
সেটাই শেষ কথা হয়ে রইল। ওই কথার পর তাঁর সঙ্গে আর কোনও রকম যোগাযোগ করা গেল না। প্লেনটি যে বিপদের সম্মুখিন হয়েছে, তেমন কোনও ইঙ্গিতও পাওয়া গেল না। বোধহয় দিকভ্রষ্ট হয়ে যেখানে নামার কথা, সেটা ছাড়িয়ে দূরে অন্য কোথাও চলে গেছে। এ কথা বলেছিলেন, মিয়ামির একজন মুখপাত্র। অন্য আর একজন বলেছিলেন, এটা বড়ই আশ্চর্যের বিষয় যে, যে-সব বিমান সাউথ বাহামায় যায়, তাদের বেশির ভাগই আর ফিরে আসে না। কোথায় যে যায়! তা কেউ বলতেও পারে না! ফলে সি-১১৯ বিমানটি সম্পর্কেও কেউ কোনও সদুত্তর দিতে পারবে বলে আমার মনে হয় না।
যে জায়গাটা বার্মুদা ট্র্যাঙ্গেল নামে চিহ্নিত, পর দিন সকাল থেকেই সেই এক লক্ষ মাইল বিস্তৃত এলাকায় জোর কদমে অভিযান চালানো হল। নিখুঁত ভাবে বিচার-বিশ্লেষণ করল এক দল অভিজ্ঞ পাইলট। তিন-চার দিন ধরে সাতখানা বিমান শকুনের মতো শ্যেন দৃষ্টিতে তল্লাশি চালিয়েও যাত্রীদের কোনও সন্ধান পেল না। কেউ কেউ বললেন, বিমানে তো দুটো ইঞ্জিন ছিল! একটা খারাপ হলেও অন্যটা দিয়ে অনায়াসেই কাজ চালাতে পারত। তা হলে কি মারাত্মক কোনও বিপদে পড়ল! বিপদে পড়লে সাহায্যের জন্য প্লেন থেকে যে আলোর সংকেত পাঠানো হয়, তাও তো দেখা যায়নি কোথাও! তা হলে কী হল! কিছু ঘটে থাকলে অন্তত প্লেনগুলোর ধ্বংসাবশেষ তো খুঁজে পাওয়া যেত। তাও পাওয়া যায়নি একফোঁটা। তা হলে!
উনিশশো তিয়াত্তর সালের শেষের দিকে ইন্টারন্যাশনাল ইউ-এফ ওব্যুরো এই ধরনের হারিয়ে যাওয়া বিমানের ঘটনা নিয়ে কয়েকটি প্রবন্ধ লিখেছিলেন। তার একটায় তিনি সন্দেহ প্রকাশ করেছিলেন, সি-১১৯ বক্সকার বিমান সম্ভবত উড়ন্ত কোনও চাকির কবলে পড়েছিল। কারণ হিসেবে তিনি বলেছিলেন, যে সময় ওটা অদৃশ্য হয়, সেই সময় জেমিনী ফোর মহাশূন্যে পরিক্রমা করছিল।
 তার অ্যাস্ট্রোনট জেমস ম্যাকডেভিট নাকি লিখেছিলেন, অনেক দূর পর্যন্ত বাড়িয়ে দিতে পারে, আবার গুটিয়েও নিতে পারে সহজে, এমন অদ্ভুত ডানাওয়ালা রহস্যজনক একটি উড়ন্ত বস্তুকে তিনি তখন আকাশে উড়তে দেখেছিলেন। তাঁর দাবিকে যে একেবারে ফুঁ দিয়ে উড়িয়ে দেওয়া যায় না, সে কথা স্বীকার করে নিয়েছেন সাধারণ মানুষ থেকে অনেক বিশিষ্ট আকাশচারী। এমনকী, মহাকাশ নিয়ে গবেষণারত বেশ কয়েক জন বিজ্ঞানীও ।
তাঁরা হিসেব করে দেখেছেন, যখনই আকাশের বুকে ওই অদ্ভুতদশর্ন আকাশযানকে উড়তে দেখা যায়, তখনই কোনও না-কোনও বিমান বেমালুম উধাও হয়ে যায়। কোনও কোনও বিজ্ঞানী তাই রাখঢাক না করেই সরাসরি মুখ খুলেছেন। তাঁরা বলেছেন, আমাদের অনুমান, অন্য কোনও গ্রহের অতি উন্নত, বুদ্ধিমান কোনও প্রাণী পৃথিবীর বুক থেকে এই সব বিমান এবং বিমানের হতভাগ্য আরোহীদের অপহরণ করে তাদের গ্রহে নিয়ে যায়।
বিজ্ঞানের নানা রকম বিশ্লেষণের জন্য আমরা যেমন পরীক্ষাগারে গিনিপিগদের ওপরে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করি, অপহৃত হওয়া ওই সব বিমানযাত্রীরাও নিশ্চয়ই মঙ্গল, শুক্র, নেপচুন বা সৌরজগতের কিংবা মহাশূন্যের কোনও না-কোনও গ্রহের গবেষণাগারে গিনিপিগদের মতোই ব্যবহৃত হচ্ছেন। এবং শেষ পর্যন্ত মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছেন।
আজ থেকে অনেক বছর আগে, যে বছর আমাদের এই দেশ, ভারত স্বাধীন হয়েছিল, ঠিক সেই বছর, মানে উনিশশো সাতচল্লিশ সালে কেনেথ আরনল্ড নামের এক আমেরিকাবাসী প্রথম একটি আনআইডেনটিফায়েড ফ্লাইং অবজেক্টকে চাক্ষুস করেছিলেন। যাকে সংক্ষেপে লা হয়, ইউ  এফ ও। বাংলায়— উড়ন্ত চাকি বা উড়ন্ত পিরিচ কিংবা আকাশ চাকি। সেই ভদ্রলোকের মস্ত বড় ব্যবসা। মোটর গাড়ির বিশাল বাজার তিনি প্রায় একাই দখল করে আছেন। নিজস্ব অ্যারোপ্লেনও আছে তাঁর। একদিন সেই প্লেনে করেই কোম্পানির একটি মিটিংয়ে যোগ দেওয়ার জন্য তিনি অন্য একটি শহরে যাচ্ছিলেন।
আকাশ তখন পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন। দূরে মাউন্ট বেনিয়ারের চূড়ায় তুষারের স্তূপ স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। হঠাৎ ককপিট থেকে আকাশের দিকে তাকাতেই তিনি স্তম্ভিত হয়ে গেলেন। তিনি কখনও কোনও অলৌকিকতা বা ভূত-প্রেতে বিশ্বাস করেন না। ভীষণ বাস্তববাদী মানুষ। ভাবুকতার কোনও স্থান নেই তাঁর জগতে। নস্টালজিয়া-ফিয়াকে তিনি পাত্তাই দেন না।

প্রতিটা মুহূর্ত তাঁর কাছে অত্যন্ত দামি। কিন্তু আকাশের বুকে ওটা কী! এত দিন তিনি আকাশে উড়ছেন, কই, এ রকম কোনও জিনিস তো এর আগে তিনি কখনও দেখেননি! মনে হচ্ছে, চায়ের কাপের প্লেটের মতো বিশাল বিশাল কয়েকখানা ডিশকে উপুর করে আকাশে ভাসিয়ে রেখেছে কেউ। সেগুলো চড়কির মতো বনবন করে ঘুরছে। ঘুরতে ঘুরতে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় ছুটে যাচ্ছে। মাত্র অল্প কিছুক্ষণ। তার পরেই সেগুলো হুস করে আরও উঁচুতে উঠে কোথায় যেন মিলিয়ে গেল।
অন্য কেউ হলে নির্ঘাৎ ‌ভিরমি খেতেন। কিন্তু তিনি শুধু একটু অবাকই হলেন। না, এই চাকতি দেখে নয়, তিনি অবাক হলেন এই কারণে যে, তিনি নিজে একজন প্লেন-প্রেমী। প্লেন নিয়ে গবেষণা করতে তিনি ভীষণ ভালবাসেন। পৃথিবীর কোথায় কোন দেশে কী ধরনের প্লেন তৈরি হচ্ছে বা তৈরির পরিকল্পনা চলছে, তিনি তার যাবতীয় খোঁজখবর রাখেন। কিন্তু এই ধরনের প্লেনের কথা তো তিনি কস্মিনকালেও শোনেননি! তা হলে! নতুন আকৃতির এই প্লেনের কথা তাঁর নজর এড়িয়ে গেল কী ভাবে!
তখন তিনি ভাবলেন, কোনও দেশ বুঝি চুপিচুপি নতুন এই বিমান বানিয়ে আকাশে ট্রায়াল দিচ্ছে।
 পরে বাজারে ছাড়বে। ছাড়া মাত্রই তিনি যে এই অভিনব বিমানটা কিনবেন, তা সঙ্গে সঙ্গেই স্থির করে ফেললেন। কিন্তু আগে থেকে বুক করে রাখলে হয় না! কারা বানিয়েছেন এটা! কোম্পানির ডিরেক্টরদের নিয়ে মিটিং করার আগেই এক প্রস্ত জিজ্ঞাসাবাদ করে নিলেন তিনি। কিন্তু না, এই ধরনের কোনও বিমানের কথা তাঁরা কেউই জানেন না।
চলবে  …………………………

সিদ্ধার্থ সিংহের পরিচিতি – ক্লিক করুন 

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *