বার্মুদা রহস্য — পর্ব – ২১ – সিদ্ধার্থ সিংহ

বার্মুদা রহস্য — পর্ব – ২১ – সিদ্ধার্থ সিংহ
সিগার নয়, রয়্যাল এয়ারফোর্সের অবসরপ্রাপ্ত উইং কমান্ডার এরিক কক্স হ্যাম্পশায়ারের ক্যামনাম থেকে ফেলিং বিচে গাড়ি ড্রাইভ করে যাওয়ার সময় একটা দুটো নয়, সাত-সাতখানা আলোর পিণ্ড দেখেছিলেন। সঙ্গে তাঁর স্ত্রীও ছিলেন। তখন সবেমাত্র সন্ধে হয়েছে। তবে সে ভাবে অন্ধকার নামেনি। আকাশ পরিষ্কার। জ্বলজ্বল করছে নক্ষত্র। হঠাৎ ওই দম্পতি আকাশের বুকে সপ্তর্ষি মণ্ডলের মতো ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা সাতখানা আলোক পিণ্ড দেখে চমকে উঠলেন।গাড়ি থেকে নেমে তাঁরা হা করে সে দিকেই তাকিয়ে রইলেন। দেখতে দেখতে সেগুলো নিজেদের অবস্থান ইংরেজি ভি অক্ষরের মতো সাজিয়ে উড়তে লাগল। একটু পরেই সেই সাতখানা পিণ্ড নিজেদের আদলটা পাল্টে একটা ক্রশ তৈরি করে উড়তে লাগল। পরে যখন ওই দম্পতির কাছে আলাদা আলাদা করে জানতে চাওয়া হয়েছিল, তাঁরা কি সত্যিই দেখেছেন?

ওঁরা তখন বলেছিলেন, তাঁদের দেখায় কোনও ভুল হয়নি। সাতটি আলোর বল যে ভাবে নিজেদের অবস্থান পাল্টাচ্ছিল, তাতে হলফ করে বলা যায়, ওদের মধ্যে নিশ্চয়ই কেউ একজন পরিচালক আছে। তার নির্দেশেই বাকিরা ওই সব করছিল। অথবা অন্য কোনও গ্রহ থেকে রিমোর্ট কন্ট্রোলের সাহায্যে ওই সব কেরামতি করা হচ্ছিল।

দুজনের কথাই পুঙ্খানুপুঙ্খ ভাবে জানিয়ে দেওয়া হল রয়্যাল অবজারভেটরির গবেষকদের কাছে। তাঁরা প্রথমে ভেবেছিলেন, ওঁরা নিশ্চয়ই শুক্র গ্রহকে দেখে ভুল করেছেন অথবা সেই সময় ওঁদের হ্যালোসিয়েশন হয়েছিল অথবা কয়েক দিন ধরে ওঁরা হয়তো ফ্লাইং সসার নিয়ে নিজেদের মধ্যে আলোচনা করছিল, ভাবছিল, আর আধো আলো আধো আঁধারি পরিবেশ পেতেই সেটা ওঁদের মাথার মধ্যে জেঁকে বসেছিল। তাই হয়তো রাম দেখতে রামছাগল দেখেছেন। তবু তাঁরা ওঁদের কথার ওপর ভিত্তি করে খোঁজখবর নিতে শুরু করলেন। এবং দেখলেন, না। ওঁরা ভুল বলছেন না। আর ওঁরা যা দেখেছেন, সেটা ইহজগতের ব্যাপার নয়। এর অন্তরালে রয়েছে অন্য কোনও গ্রহবাসীর কারিকুরি। এই রহস্য সমাধান করা তাঁদের পক্ষে এই মুহূর্তে সম্ভব নয়।

একটা হিসেব অনুযায়ী শুধু উনিশশো সাতষট্টি  সালেই গ্রেট ব্রিটেনের আকাশে মোট তিনশো বাষট্টিখানা আন আইডেনটিফায়েড অবজেক্ট দেখা গেছে। কোনও একটা দেশে এক বছরের মধ্যে এতগুলো ফ্লাইং সসারের আসা কি চাট্টিখানি কথা নাকি! এ নিয়ে বিলেতের হাউস অব কমন্সে বিরোধী পক্ষের সাংসদেরা পর্যন্ত প্রশ্ন তুলেছিলেন।

জানতে চেয়েছিলেন, এ ব্যাপারে কী কী ব্যবস্থা নিয়েছে কর্তৃপক্ষ। দাবি তুলেছিলেন, এক্ষুনি এর একটা বিহিত করা হোক। কারণ, আকাশে উড়ন্ত পিরিচ দেখা দিলেই সমুদ্র থেকে জাহাজ এবং আকাশ থেকে প্লেন হাপিস হয়ে যাওয়ার একটা সম্ভাবনা দেখা দেয়।
কিন্তু অন্য গ্রহের অতি বুদ্ধিমান জীবের সঙ্গে কি একা একটা দেশ কখনও এঁটে উঠতে পারে! ফলে চুপচাপ সহ্য করা ছাড়া আর কিছুই করতে পারেনি গ্রেট ব্রিটেনের ওই সরকার।

তবে সবাইকে চমকে দিয়ে টমাস ওয়েলিংটন যা বললেন, তা উড়ন্ত পিরিচ সম্পর্কে এত দিনের এত লোক যা বলেছেন, তাতে একেবারে জল ঢেলে দিলেন। তিনি যে ফ্লাইং সসারকে চোখের সামনে নির্জন ধু ধু প্রান্তরে নামতে দেখেছিলেন এবং তার থেকে যে সব প্রাণীরা নেমে এসেছিলেন, তাদের সঙ্গে নাকি ইহজগতের কোনও প্রাণীরই সাদৃশ্য নেই। কেমন যেন গোলাকার একটা পিণ্ড। না আছে হাত, না আছে পা, আর না আছে কোনও চোখ-মুখ-কান। রংটাও অদ্ভুত। আমরা যে সাতটা রঙের সঙ্গে পরিচিত, আর সেই সব রং একটার সঙ্গে আর একটা বা একাধিক রঙের সংমিশ্রণ ঘটিয়ে যে সব পৃথক পৃথক রঙের জন্ম দিই, সেগুলো তো আছেই। তার উপরে আছে অজস্র অদ্ভুত রঙের ছিটে। তার কোনওটা উজ্জ্বল আবার কোনওটা অত্যন্ত ম্লান।

গোলাকার প্রাণীটা গড়াতে গড়াতে এসে একটা জায়গায় থমকে দাঁড়িয়ে গা ঝাড়া দিতেই আঠা আঠা গায়ে লেগে যাওয়া ধুলোবালি-ময়লা ঝরঝর করে ঝড়ে পড়ল। তার পরেই শরীর থেকে কাঁটা কাঁটা মতো কতগুলো অ্যান্টেনা বেরিয়ে কখনও আস্তে আস্তে কখনও বনবন করে ঘুরতে লাগল। গাছের আড়াল থেকে তিনি ওদের রকমসকম দেখছিলেন। সেটার আঁচ পেয়েই সম্ভবত সে ছিটকে ওই যানটার মধ্যে লেপটে গেল। আর সঙ্গে সঙ্গে সেই যানটা উড়ে নয়, যেন কোনও এক মন্ত্র বলে উধাও হয়ে গেল।

এ সব কথা বলে উনি এটাই বোঝাতে চাইলেন যে, এর আগে যাঁরা অন্য গ্রহবাসীদের দেখেছেন বলে জানিয়েছিলেন, তাঁরা ঠিক বলেননি। তাঁদের নিশ্চয়ই কোনও না কোনও দৃষ্টিবিভ্রম হয়েছিল। আর তা যে হয়েছিল, তার প্রমাণ, তাঁরা কেউই মানুষ জাতীয় আদলের যে কনসেপ্ট, তার বাইরে ভাবতেই পারেননি। যেখানে এই পৃথিবীতেই হাজার হাজার রকমের আদল রয়েছে, সেই অনুযায়ী কেউ আকাশে ওড়ে, কেউ জলে বাস করে, আবার কেউ জঙ্গলেই কাটিয়ে দেয় সারাজীবন।

সেখানে অন্য একটা গ্রহের প্রাণীকে উন্নত দেখাতে গিয়ে মানুষের আদল ছাড়া ওঁরা আর কিছুই ভাবতে পারলেন না! আসলে ওঁরা কেউই কিচ্ছু দেখেননি। প্রথম জন যা বলেছেন, পরের লোকগুলোও তাঁকে অণুকরণ করেই যা বলার বলেছেন। সত্যি কথা বলতে কি, আমিই সেই মানুষ, যিনি প্রথম অন্য কোনও গ্রহবাসীকে পৃথিবীর মাটিতে পা রাখতে দেখেছি।

তার কথা শুনে প্রচণ্ড খেপে গেলেন সেই সব লোক, যাঁরা এর আগে উড়ন্ত পিরিচ দেখেছিলেন বলে দাবি করেছিলেন। দাবি করেছিলেন, অন্য গ্রহের প্রাণীদের সামনাসামনি দেখার কিংবা কথা বলার। তাঁরা বললেন, টমাস কী বলছেন জানি না। তবে আমরা কেউই কখনও বানিয়ে বানিয়ে কিছু বলিনি। আমরা কেন মিথ্যে কথা বলতে যাব! তবে হ্যাঁ, এটা হতেই পারে, আমরা যে গ্রহবাসীদের দেখেছিলাম, উনি হয়তো সেই গ্রহবাসীদের নয়, অন্য কোনও গ্রহের প্রাণীকে দেখেছেন। তারা হয়তো ওই রকমই দেখতে।

হতে পারে! আবার নাও হতে পারে! তবে এ নিয়ে প্রচুর জলঘোলা হয়েছিল। সে প্রসঙ্গ আলাদা। তবে অন্য গ্রহ থেকে যে কে বা কারা আসে, তার জলজ্যান্ত প্রমাণ একটি কবরখানা। কবরখানাটা একটা দ্বীপের মধ্যে। আশপাশে আরও অনেকগুলো দ্বীপ আছে। সেই সব দ্বীপেও জন সংখ্যা অত্যন্ত কম। বিশেষ করে যে দ্বীপের কথা বলছি, সেই দ্বীপে তো সাকুল্যে কয়েক হাজারের বেশি লোকই হবে না। ছড়ানো ছেটানো কিছু ঘরবাড়ি।

মনে হবে সদ্য-সদ্য উপনিবেশ গড়ে উঠেছে। কয়েক ঘর স্থানীয় অধিবাসী থাকলেও বেশির ভাগই ইউরোপের বাসিন্দা। ফলে দু’পক্ষের সাংস্কৃতি মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে। তৈরি হয়েছে এক মিশ্র সাংস্কৃতির। ওখানকার সকলেই প্রায় খ্রিষ্টধর্মী। তাই কেউ মারা গেলেই তাঁরা যেহেতু কবর দিতেন, উইরোপের যে সব লোক ওখানে থাকতে শুরু করেছিলেন, তাঁরাও ওঁদের দেখাদেখি নিজেদের মৃত আত্মীয়স্বজনদের কবর দেওয়া শুরু করলেন।

এই দ্বীপে একটাই কবরখানা। আর সেটা দ্বীপের একদম শেষপ্রান্তে। পাহাড়ের ভিতরে গুহার মধ্যে। তবে কবর বলতে আমরা যা বুঝি, তা নয়, খোঁড়াখুঁড়ির কোনও ব্যাপার নেই। গুহার ভিতরে এক পাশে মৃতদেহ শুইয়ে রেখে নানান ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান পালন করে গুহার মুখটা বিশাল পাথরের চাঁই দিয়ে বন্ধ করে দেওয়া হয়। ব্যস, এই হল কবর। কিন্তু সেখানে হঠাৎ করেই উৎপাত শুরু হল।

মৃতদের রাখার জন্য গুহার ভিতরে ঢুকতেই সবাই অবাক। ভিতর থেকে কেমন একটা পচা বোঁটকা গন্ধ বেরোচ্ছে। নাক চেপে কোনও রকমে আরও ভিতরে ঢুকে দেখে, সব কিছু উলটপালট হয়ে আছে। একেবারে তছনছ। মৃতদেহগুলো কফিন থেকে বার করে রাখা। মাঝে মাঝেই দূর থেকে ভেসে আসছে শিয়ালের আর্তনাদ। ধেড়ে ইঁদুরেরা ঘুরঘুর করছে। সুযোগ পেলেই মৃতদেহগুলো খুবলে খুবলে খাচ্ছে। মৃতদেহ বাইরে থাকলে তাঁর পচনের গন্ধে তো ইঁদুরেরা খাবার জন্য আসবেই। কী করা যাবে! তাই ওরা ফের সব ঠিকঠাক মতো গুছিয়ে গুহার মুখ বন্ধ করে চলে এলেন।

বোঝা গেল, যখন লোকজন থাকে না, তখন ওখানে নিশ্চয়ই কেউ বা কারা ভিতরে ঢোকে। কীসের জন্য ঢোকে বোঝা গেল না। তবে গুহার মুখের ওই চাঁই সরানো তো দু’-চার জনের কাজ নয়। অন্তত দশ-বারো জন তো লাগেই। কিন্তু ওই দ্বীপে বা আশপাশের কোনও দ্বীপের ধর্ম উপেক্ষা করা অতগুলো লোককে একসঙ্গে জড় করে, তাদের দিয়ে ওই কাজ করানো তো মুখের কথা নয়! কারা করছে এগুলো! মুখ মুখে খবর ছড়িয়ে পড়ল সর্বত্র। জানাজানি হতেই হুমড়ি খেয়ে পড়ল প্রিন্ট এবং ইলেকট্রনিক্স মিডিয়ার লোকেরা।

চলবে  ——

 

সিদ্ধার্থ সিংহের পরিচিতি – ক্লিক করুন 

বার্মুদা রহস্য — পর্ব – ১ – সিদ্ধার্থ সিংহ — ক্লিক করুন
বার্মুদা রহস্য — পর্ব – ২ – সিদ্ধার্থ সিংহ — ক্লিক করুন 
বার্মুদা রহস্য — পর্ব – ৩ – সিদ্ধার্থ সিংহ  — ক্লিক করুন
বার্মুদা রহস্য – পর্ব – ৪ – সিদ্ধার্থ সিংহ –  ক্লিক করুন
বার্মুদা রহস্য – পর্ব – ৫ – সিদ্ধার্থ সিংহ  — ক্লিক করুন
বার্মুদা রহস্য – পর্ব – ৬ – সিদ্ধার্থ সিংহ –  ক্লিক করুন
বার্মুদা রহস্য – পর্ব – ৭ – সিদ্ধার্থ সিংহ  – ক্লিক করুন
বার্মুদা রহস্য – পর্ব – ৮ – সিদ্ধার্থ সিংহ  – ক্লিক করুন
বার্মুদা রহস্য – পর্ব – ৯ – সিদ্ধার্থ সিংহ –  ক্লিক করুন
বার্মুদা রহস্য – পর্ব – ১০ – সিদ্ধার্থ সিংহ – ক্লিক  করুন

বার্মুদা রহস্য — পর্ব – ১১ – সিদ্ধার্থ সিংহ – ক্লিক করুন
বার্মুদা রহস্য — পর্ব – ১২ – সিদ্ধার্থ সিংহ – ক্লিক করুন
বার্মুদা রহস্য — পর্ব – ১৩ – সিদ্ধার্থ সিংহ – ক্লিক করুন

বার্মুদা রহস্য — পর্ব – ১৪ – সিদ্ধার্থ সিংহ – ক্লিক করুন
বার্মুদা রহস্য — পর্ব – ১৫ – সিদ্ধার্থ সিংহ – ক্লিক করুন
বার্মুদা রহস্য — পর্ব – ১৬ – সিদ্ধার্থ সিংহ – ক্লিক করুন
বার্মুদা রহস্য — পর্ব – ১৭ – সিদ্ধার্থ সিংহ – ক্লিক করুন
বার্মুদা রহস্য — পর্ব – ১৮ – সিদ্ধার্থ সিংহ – ক্লিক করুন
বার্মুদা রহস্য — পর্ব – ১৯ – সিদ্ধার্থ সিংহ – ক্লিক করুন
বার্মুদা রহস্য — পর্ব – ২০ – সিদ্ধার্থ সিংহ – ক্লিক করুন
বার্মুদা রহস্য — পর্ব – ২২ – সিদ্ধার্থ সিংহ – ক্লিক করুন

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *