বার্মুদা রহস্য — পর্ব – ২৬ – সিদ্ধার্থ সিংহ

বার্মুদা রহস্য — পর্ব – ২৬ – সিদ্ধার্থ সিংহ

শুধু সমুদ্রের বুকে ভাসা জাহাজ বা আকাশের বুকে ওড়া উড়োজাহাজই নয়, প্রতিনিয়ত উধাও হয়ে যাচ্ছে সমুদ্রের তলা দিয়ে যাতায়াত করা ডুবোজাহাজও। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জাপানি জাহাজগুলোর একমাত্র ভয়ের কারণ ছিল—  স্করপিয়ন এস এস ২৭৮ নামের একটি মার্কিন সাবমেরিন। স্করপিয়ন মানে কাঁকড়াবিছে। আবার ধারালো পাখনা দিয়ে যে কোনও মানুষকে ঘায়েল করতে পারে, এমন এক ধরনের মারাত্মক মাছকেও বোঝায়। আমেরিকানরা এটা তৈরি করেছিল নিউ হ্যাম্পশায়ারের পোর্টসমাথ নেভি ইয়ার্ডে। উনিশশো বিয়াল্লিশ সালের কুড়ি জুলাই পোর্টসমাথ নেভি ইয়ার্ডের মাস্টার মোল্ডারের মেয়ে মিস মোল্ডার এই সাবমেরিনটিকে জলে ভাসান।

 

অনেক শত্রু জাহাজকে ধ্বংস করে, প্রচুর মালবাহী জাহাজকে নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছে দিয়ে এই সাবমেরিনটি প্রশান্ত মহাসাগরের শত্রু শিবিরে ত্রাস সৃষ্টি করলেও, সে নিজেই উনিশশো চুয়াল্লিশ সালের চব্বিশ ফেব্রুয়ারি কোনও বিপদ সংকেত না পাঠিয়েই ডেভিলস সি-র বুক থেকে চিরদিনের জন্য বেপাত্তা হয়ে গেল। তার আর কোনও খোঁজই পাওয়া গেল না। খোঁজ পাওয়া গেল না ওই জাহাজের ছ’জন অফিসার আর চুয়ান্ন জন ক্রু-রও।

তার স্মৃতি বুকে রেখে কনেকটিকাল স্টেটের গ্রোটনের জেনারেল ডাইনামিস কর্পোরেশনের ইলেকট্রিক বোট কোম্পানি ডিভিশন অত্যন্ত যত্ন সহকারে তৈরি করল আরও একটি স্করপিয়ন। ‘আরও একটি’ বলার উদ্দেশ্য, তার আগে আরও পাঁচ-পাঁচটা স্করপিয়ন বানানো হয়ে গিয়েছিল। এই ষষ্ঠটির নাম দেওয়া হল— স্করপিয়ন- এস এস (এন) ৫৮৯। হারিয়ে যাওয়া প্রথম স্করপিয়ন এস এস ২৭৮-এর কমান্ডর ম্যাক্সিমিলিয়ান জি শিমিডের মেয়ে মিসেস এলিজাবেথ বি মরিসন উনিশশো ঊনষাট সালের উনিশে ডিসেম্বর এক বিশাল অনুষ্ঠানের মধ্যে দিয়ে নতুন এই স্করপিয়নটিকে জলে ভাসালেন।

অত্যাধুনিক যাবতীয় ব্যবস্থা থাকলেও তার আয়ু কিন্তু দশ বছরও পেরোল না। উনিশশো আটষট্টি সালের মে মাসে ওই সাবমেরিনের ক্যাপ্টেনকে নির্দেশ পাঠানো হল আমেরিকার নরফোকে মূল ঘাঁটিতে ফিরে আসার জন্য। সে রওনাও হল। কিন্তু কোনও দিনই তার আর নরফোকে পৌঁছনো হল না। এক সময় বোঝা গেল, দক্ষ অফিসার আর তুখোড় নাবিক মিলিয়ে মোট নিরানব্বই জনই ওই জাহাজের সঙ্গে সমুদ্রের তলায় একেবারে তলিয়ে গেছে।

ওদের খুঁজে বার করতে নরফোক নৌঘাঁটি আর নেভি বোর্ড অব ইনকুয়ারি অনুসন্ধান শুরু করল। বহু তল্লাশির পরে মার্কিন নৌ-বাহিনীর মিজার নামের একটি রিসার্চ শিপ অবশেষে তাকে খুঁজে বার করল। অ্যাজোরাস থেকে প্রায় পাঁচশো মাইল দক্ষিণ-পশ্চিমে দশ হাজার ফুট জলের তলায়, লিম্বো অব দ্য লস্ট এলাকার ধার ঘেঁষে সে মুখ থুবড়ে পড়ে আছে। কেউ যেন তাকে ঘাড় ধরে সমুদ্রের তলায় ঠেসে দিয়েছে। কিন্তু এ কাজ কে করল! হাজার পরীক্ষা নিরীক্ষা করেও তার কোনও সদুত্তর, এমনকী, তার কোনও সামান্যতম আভাসও পাওয়া গেল না।

ওখানে তল্লাশি চালানোর সময়ই গবেষকরা জানতে পারেন, ইলা মাছের কথা। এই মাছগুলো নাকি জলের তলায় বৈদুতিক শক্তি উৎপন্ন করতে পারে। ডিম পাড়ার জন্য ইউরোপ থেকে এক ঝাঁক মাছ যায় বার্মুদা দ্বীপে আর এক ঝাঁক যায় আমেরিকা থেকে। ইউরোপ থেকে যারা যায়, তাদের নাকি ওখানে পৌঁছতে পৌঁছতে সাড়ে তিন বছর লেগে যায়। ডিম থেকে বাচ্চা ফোটার পর, বাচ্চাগুলো কিছু দিন ওখানে থেকে, যে যার দেশে চলে যায়।

কিন্তু ডিম পাড়তে আসা মা-মাছেরা, এমনকী, তাদের সঙ্গী অন্য বড় মাছেদের আর ফিরে যেতে দেখা যায় না। না, দ্বীপের আশপাশেও তাদের দেখা যায় না। তারা যে কোথায় যায়! বহু চেষ্টা করেও তা আজও জানতে পারেননি বিজ্ঞানীরা। তবে যে কারণে এই ধাড়ি মাছগুলো সমুদ্রের বুক থেকে বেমালুম উধাও হয়ে যায়, সেই একই কারণে ওই হাল হয়েছিল স্করপিয়ন এস এস (এন) ৫৮৯-এর! হতে পারে! আর তা শুধু এখানে কেন! আজ তো সকলেই জানেন, বার্মুদা ট্র্যাঙ্গেলের মতো ফাঁদ গোটা পৃথিবীতে অন্তত বারোটি জায়গায় পাতা আছে।

 এ তথ্য দিয়েছে খোদ আমেরিকার নিউ জার্সির বেসরকারি প্রতিষ্ঠান— সোসাইটি ফর দ্য ইনভেস্টিগেশন অব দ্য আনএক্সপ্লেনড। ওই সোসাইটির প্রতিষ্ঠাতা বিখ্যাত বিজ্ঞানী আইভান টি স্যান্ডারসন। তাঁর হঠাৎ একদিন খেয়াল হল, আটলান্টিক মহাসাগরের বার্মুদা ট্র্যাঙ্গেল এবং প্রশান্ত মহাসাগরের ডেভিলস সি ছাড়া এই রকম রহস্যজনক জায়গা আর কোথাও আছে কি না, তিনি একবার অনুসন্ধান করে দেখবেন! যে-ই ভাবা সেই কাজ। সঙ্গে নিলেন বহু খ্যাতনামা সামুদ্রিক বিদ্যাবিশারদ, ভূগোলবিদ, গাণিতিক-সহ বিভিন্ন বিষয়ে সুপণ্ডিত গবেষককে।

তাঁরা সবাই মিলে একসঙ্গে কাজ করতে করতে পেয়ে গেলেন, পশ্চিম ভূমধ্যসাগরের হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জের উত্তর-পূর্ব, আটলান্টিকের দক্ষিণ-পূর্ব, দক্ষিণ আফ্রিকা উপকূলের দক্ষিণ-পূর্ব, উত্তর প্রশান্ত মহাসাগর, আর্জেন্তিনার উপকূলের দক্ষিণ -পূর্ব, আটলান্টিকের দক্ষিণ-পূর্ব, অস্ট্রেলিয়ার খানিক দূরে টানটান সমুদ্র, ভারত মহাসাগরের পূর্ব দিক এবং আফগানিস্থন। সব ক’টাই কিন্তু সমুদ্রের বুকে। ব্যতিক্রম কেবল আফগানিস্থানের পশ্চিম দিকের একটি অঞ্চল।

সব ক’টি এলাকাই যে ত্রিকোণ, তেমনটা মনে করার কোনও কারণ নেই। কোনওটি গোলাকার তো কোনওটা নৌকোর মতো। কোনওটা ডিম্বাকৃতি তো কোনওটা টেট্রাহেড্রাল আকৃতির। সব থেকে অবাক করা কাণ্ড, ওই দশটি স্থানের পাঁচটি আছে ইকোয়েটরের উত্তরে আর বাকি পাঁচটি দক্ষিণে। এ ছাড়া উত্তর মেরুতে এবং দক্ষিণ মেরুতেও একটি করে জায়গা আছে। আরও আশ্চর্যের বিষয় হল, প্রত্যেকটি প্রত্যেকটির থেকে বাহাত্তর ডিগ্রি দূরত্বে অবস্থিত। মানে দূরত্বের দিক থেকে সকলের ব্যবধানই একই। মনে হবে, কেউ বুঝি ছুরি দিয়ে কেকের মতো কেটে একেবারে কাঁটা কম্পাস দিয়ে হিসেব করে একেবারে নিখুঁত ভাবে সমান দূরত্বে বসিয়ে দিয়েছে জায়গাগুলো।

হ্যাঁ, এটা সম্ভব। যেমন সম্ভব অত অত বছর আগে ইস্পাতের মতো কঠিন আগ্নেয়শিলাকে মাখনের মতো কেটে কেটে তেত্রিশ থেকে ছত্রিশ ফুট লম্বা, পঞ্চশ টন ওজনের হাজার হাজার নিখুঁত পাথরের মূর্তি বানানো। অষ্টাদশ শতকের গোড়ার দিকে যেগুলোর প্রথম সন্ধান পেয়েছিলেন ইউরোপিয়ানরা। চিলি উপকূল থেকে দু’হাজার দুশো পঞ্চাশ মাইল দূরের ছোট্ট একটা দ্বীপ—  ইস্টার-এ। তখনও সেখানে দশ হাজার টন ওজনের অজস্র পাথর এখানে সেখানে পড়ে ছিল। যেন একটু পরেই কেউ বা কারা এসে ফের নতুন উদ্যমে মেতে উঠবেন এক একটা ভাস্কর্য নির্মাণে। মূর্তিগুলো দেখে সবাই অবাক। ওগুলো এতটাই জীবন্ত, যেন মনে হচ্ছে এক্ষুনি ওরা নড়ে উঠবে।

কথা বলবে। ওদের মাথায় এক অদ্ভুত আকৃতির টুপি। পাথরের সেই টুপির এক-একটার ওজন কম পক্ষে দশ টন তো হবেই। মূর্তির মাথায় আলগোছে বসানো। ওগুলো তুলে মূর্তির মাথায় ওরা বসালো কী করে! তার থেকেও বড় কথা, মূর্তির পাথর আর টুপির পাথরগুলো একদম ভিন্ন জাতের। এই দুই ধরনের পাথর পাওয়া যায় দু’জায়গায়।

তাদের মাঝখানের ব্যবধান অন্তত পক্ষে কয়েকশো মাইল। এতটা পথ ওরা ওই পাথরগুলো বয়ে আনল কী করে! কোনও কোনও মূর্তির গায়ে কাঠের ফলকে কিছু লিপি পাওয়া গেছে। সেগুলোর পাঠোদ্ধার করার চেষ্টা চলছে। বিজ্ঞানীদের দাবি, একবার যদি এই দুর্বোধ্য ভাষা উদ্ধার করা যায়, তা হলে এই ভয়ঙ্কর দ্বীপগুলোর সমস্ত রহস্যই উদ্ঘাটন করা সম্ভব হবে।

কিন্তু কবে হবে! এবং তার থেকেও বড় কথা, কী ভাবে হবে! যেগুলো উধাও হয়ে যাচ্ছে, সেগুলো যাচ্ছে কোথায়! এ ব্যাপারে আমেরিকার কনেকটিকাট স্টেটের খ্যাতনামা অতীন্দ্রিয়বাদী মিস্টার এড স্নেডেকার বলেছেন, বায়ুমণ্ডলে অনেক টানেল বা ফানেল আছে। সাধারণ মানুষের চোখে সেগুলো ধরা পড়ে না। কিন্তু আমরা সেগুলো অনায়াসে দেখতে পাই। ওই সব জাহাজ, ডুবোজাহাজ বা উড়োজাহাজের সঙ্গে যে সব মানুষ লোপাট হয়ে গেছে, তাদের সঙ্গে কথা বলি।

 

চলবে  ———-

 

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *