কবি ও কথাকার মধুমঙ্গল বিশ্বাসের অণুগল্প নিয়ে একটি প্রবন্ধ লিখেছেন কবি তৈমুর খান।

sahityalok.com
অণুগল্পকার মধুমঙ্গল বিশ্বাস
[post-views]                                     [printfriendly]

নব্বই দশকের কবি হিসেবেই মধুমঙ্গল বিশ্বাসের পরিচিতি বাংলা সাহিত্যের পাঠকের কাছে, কিন্তু তিনি যে একজন দক্ষ অণুগল্পকারও তা অনেকেই জানি না। অবশ্য কবিতার সঙ্গে অণুগল্পের পার্থক্য যে খুব বেশি তা নয়, দুটি সৃষ্টিই জীবনরসায়নের মোক্ষম পরীক্ষাগার হতে উৎপন্ন।

কবিতায় থাকে বহুমুখী ব্যঞ্জনার সন্নিবেশ আর গল্পে থাকে একমুখী পর্যটন। অবশ্যই বহু রৈখিক ইংগিতময়তায় তাও জটিল হয়ে ওঠে। কিন্তু মানুষের মৌলিক চরিত্রের তেমন কোনও পরিবর্তন ঘটে না। সাহিত্যিক আলবার্ট কামুজ মানব জীবন সম্পর্কে বলেছেন : “Man is the only creature who refuses to be what he is.” মানুষের এই ঝোঁক আদি যুগ ধরে চলে আসছে। এখানেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। মধুমঙ্গল বিশ্বাসের “কবিতা যখন অভিমানক রে” গ্রন্থটি পাঠ করতে করতে একথাই মনে হল।

      তেত্রিশটি অণুগল্প, ২০১৪—২০১৬ এর সময়সীমার মধ্যে রচনা করেছেন মধুমঙ্গল বিশ্বাস। কবিতার সঙ্গে সঙ্গে গল্পগুলিও একই হাতে লেখা বলে কবিতার মতোই মনে হবে। জীবনের গতিময় ক্রিয়ায় নানা রূপ অভিজ্ঞতা এবং একান্ত উপলব্ধিগুলিই গল্পের বিষয়।

কবি যেন নিজের মুখোমুখি হতে চেয়েছেন আবার নিজের সঙ্গেই আত্মকথনের প্রক্রিয়া অনুসরণ করেছেন। স্বাভাবিকভাবেই মৃদু স্বরের অভিনিবেশে স্পর্শাতুর একটা শিল্প হয়ে উঠেছে। প্রতিটি গল্পেই আত্মগত উষ্ণতা ছুঁয়ে যায়। একান্ত অনুজ্ঞার নিভৃতিগুলি আত্মিক পর্যটনের মর্মরিত আলোয় উদ্ভাসিত হতে চেয়েছে। কবিতার মতোই এসেছে ভাবনার ঘনত্ব, অনুভূতির ভাষাহীন স্তব্ধতা যা ঘটনাকে অতিক্রম করে আত্মধ্বনির নিবিড় সংশ্লেষে গভীর অন্বয়ে নিবেদিত হয়েছে।

    অণুগল্প টুকরো টুকরো অণুকথার অণুকম্পন সাংকেতিক প্রশ্রয়ে মানবজীবনের মহামহিম প্রজ্ঞার অনুবর্তনকেই এক একটি ভাবনার স্পেসের মধ্যে প্রতিস্থাপন করেছেন। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বাক্য, শব্দের পরিমিত ব্যবহার, বাস্তব ও কল্পনার সান্নিধ্য, মানব চরিত্রের মৌলিক ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ায় দোলাচলের যে সংক্রমণ তা এক একটা অন্তরক্ষীয় দাগের স্পষ্টতা পেয়েছে। নিজ সত্তাকে ক্রিয়ায় যেমন মিশিয়েছেন, তেমনি প্রতিস্বের বিবর্তনে অন্যচরিত্রের মধ্যেও সচল করেছেন।

বিমূর্ত ইচ্ছার বাঁশিগুলি যে সুর তুলেছে তা দৃশ্যমান হয়নি, ঘটনাক্রমকে অনুসরণ করেনি ঠিকই, কিন্তু আদিম প্রবৃত্তির চৈতন্যে সেগুলি ঘনীভূত নিদর্শে পাক খেয়েছে। “সুধাকান্ত” নামে চরিত্রটিই কবিব্যক্তি হিসেবে সামিল হয়ে তার ব্যাপ্তিময় জীবনচর্যা প্রক্ষিপ্ততায় ভাবনার বিচিত্র গতি পেয়েছে।

নিঃসঙ্গতা, পিতৃত্ব, শিল্পবোধ, নস্টালজিক চেতনাপ্রবাহ, দৈন্য, অসুস্থতা, সংগ্রাম, সংসার, সন্তানহীনতা সমস্তদিকই এই প্রক্ষিপ্ততা গ্রাস করেছে। আবার প্রণয় ভাবনা থেকে পরকীয়াও, সদর্থক নঞর্থক নানা সমাবেশে আত্মোপলব্ধির পর্যায়গুলিও বাদ যায়নি। সুধাকান্ত মিষ্টি সকাল চেনে, তার মধুমেহ অসুখের বাড়াবাড়িও জানে, রাস্তার পাশে উপোসি মানুষের বস্তিও দ্যাখে।

মাঝবয়সী নারী থেকে কিশোরীর যৌবনও তার চোখে প্রতিভাত হয়। খুব সুষ্ঠুভাবেই নিজের বোধের টংকারে তার শিল্প ও শব্দসীমা নিয়ন্ত্রণ করে। তাই গল্পগুলি অকপট, জীবনের প্রচ্ছদে নিজেকে মেলে ধরার শিল্প।

কবিতায় যে আড়াল ও অস্পষ্টতা থাকে, গল্পগুলিতে সে অবকাশ না থাকলেও যে গুঞ্জনের রেশ, উপমার ইংগিতময়তা, রূপকের কৌশলী ব্যবহার আছে তাতে এগুলি কবিতারই দোসর হয়ে উঠেছে। আঙ্গিক গঠনেও এসেছে নতুনত্ব। একটি বা দুটি শব্দেই তৈরি হয়েছে একটি বাক্য।

         বিষয় নিয়ে লেখার মধ্যেও চিরন্তন মানবীয় আবেগের কথা বলতে ভোলেননি। মনস্তাত্ত্বিক উপলব্ধির অভিঘাত সংলাপগুলিকে আরও দার্শনিক অভীক্ষা দান করেছে। “অজরের প্রেম”এ প্রেম চিরন্তন রোমান্টিক জগতের নয়, দেহবাদই তার শেষ ঠিকানা। তাই পার্থিব বস্তু দান করেও শেষে দেহ দানেই সঙ্গমের আভাস মুকুলিত । “জুন” এ সন্তানহীন জীবনের নিঃস্বতা, সূর্যোদয়ের দৃশ্য দেখার আকর্ষণও শিথিল করে দিয়েছে।

দত্তক নেওয়ার ভাবনাও ঘুরে গেছে দত্তক সংক্রান্ত কাগজের একটি সংবাদে। “আবিষ্কারের ধুলো”তে গিটার ও রমণী প্রায় সমার্থক। একটি যন্ত্র যেভাবে সুর তুলত তাতে জীবনও হত চনমনে। কিন্তু বউ আসার পর গিটারে অবহেলার ধুলো জমে। কিছুদিন পর বউ অবহেলার বস্তু হয়ে যায়।

প্রতীকী ব্যবহারে কোথাও কোথাও গল্পগুলিতে মারাত্মক আয়রনিও সৃষ্টি হয়েছে।

    মাছ কাটতে গিয়ে মাছের ডিম বের হলে সুধাকান্ত আবেগঘন হয়ে পড়ে। এতে অনেক মাছের চারা তৈরি হত বলে। কিন্তু তারই নিষেকে তৈরি হওয়া ডিম তার বউ সুধার পেটে। বাথরুমে পড়ে গেলে আঘাত লেগে তা নষ্ট হয়ে যায়। গল্পের এই প্রতীকী একটা দর্শনের জন্ম দেয়। (অনাগত)

বসন্ত দিনেই যেদিন ফুলশয্যা হয়েছিল সেই বসন্ত দিনেই প্রেমের বিদায় সুজয়-সুলতার। জীবনের এক প্রান্ত থেকে অন্যপ্রান্তে শরীরের বার্ধক্য মনকেও ক্লান্ত করে। আয়োজন সব থাকলেও শরীর আর রা দেয় না। (মেলামেশা)

দুই বিপরীত মেরুর রাজনৈতিক দলের জোট হলে দুই দলের নায়ক নায়িকারও এই জোট বিবাহে রূপ পায়। কিন্তু জোট ইলেকশনে পরাজিত হলে এই বিবাহও কি বিচ্ছেদের দিকে যাবে? রাজনীতি এবং ব্যক্তিজীবনে ছায়াপাত ঘটায় এই প্রতীক। (জোট)

শরীর ও ক্ষেত একই। পূর্ণকর্ষণ আর জোরালো বর্ষণে প্রস্তুত করা হয় বীজ ফেলার জন্য। (শঙ্খ)
দৌড় জীবনের, কখনও সম্মান রক্ষার্থে, কখনও প্রেমের জন্য। (দৌড়)
মনের ছায়া কুকুরের মধ্যে প্রতিফলিত হয়। খাবারের টুকরো কুকুরও তাচ্ছিল্য করে । নিজেকে তখন আরও ভালো করে চেনা যায়। (খিদে)

বিজ্ঞাপনের কৃত্রিম মডেলের দুধ পান এবং চুক চুক শব্দ শৈশবে ফিরিয়ে দেওয়ার মনস্তাত্ত্বিক প্রতীক। (বিজ্ঞাপন)

নোটবন্দির সময় বাতিল হওয়া টাকার নোট নিয়ে চালাতে গিয়ে কোথাও তা চালানো সম্ভব হয় না। তখন অচল টাকা সাপ হয়ে পকেটে কিলবিল করে। বিষয় আসক্তি শেষে বিষ আসক্তির কষ্টে পরিণত হয়। (সাপ)

      গল্পগুলিতে বিভিন্ন কবির কবিতার পংক্তি ব্যবহৃত হওয়ায় ভাবনায় দার্শনিক বোধ আরও প্রগাঢ় হয়েছে। কমলেশ পাল, শক্তি চট্টোপাধ্যায়, জীবনানন্দ দাশ ছাড়াও কথাসাহিত্যিক অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়ের নীলকণ্ঠ পাখির কথাও দিব্যি সামঞ্জস্যপূর্ণ ও পরিপূরক হয়ে উঠেছে।

অনুপ্রাসের ব্যবহার, বর্ণনায় কাব্যিক চেতনা প্রভৃতি বেশ নতুন এক গদ্যের চাল আকৃষ্ট করে। উল্লেখযোগ্য কয়েকটি পংক্তি উদ্ধৃত করা যায় :

১. সুলতা আর সুজয় আলো জ্বালাতে জ্বালাতে অলৌকিক হয়ে ওঠে। —আলো
২.যে দিকে তাকাই, হেমবর্ণ ইশারার মেঘ। —অভিযাত্রী
৩. পূর্ণকর্ষণ আর জোরালো বর্ষণে প্রস্তুত করে সঠিক বীজটি গ্রহণ করতে হয়। —শঙ্খ
৪. সুধাকান্ত সুরাক্রান্ত হয়ে পড়ে। —আবাহন
৫. রাস্তায় সৃজন। রাস্তায় বিনাশ। রাস্তায় ঘনঘটা। রাস্তা হেঁটে যায় ।—উপলক্ষ
৬. সুধাকান্ত-সুধার নিষেকে স্বপ্নের ডিম। —অনাগত
৭. কোথাও বিবেক নেই। কোথাও বিধান নেই।…. মেমেঘের মধ্যে দিয়ে উড়ে যায় স্বপ্নের প্লেন। —স্বপ্ন
৮. সুধাকান্ত বই পড়ে। ফাঁকে ফাঁকে সাতসতেরো। —পান
৯. আকাশ মেঘলা হলে শরীরেরও মনখারাপ হয়। —ক্রিয়া
১০. দূরের গাছে একটি নীলকণ্ঠ অতীনের পাখি বসে আছে। —বাঘবন্দি
১১. রূপের আধার ভেঙে অরূপ এসে ডাকে। —ডুব

১২. কোনও ফাঁকই এজগতে শূন্য থাকার নয়। —আবিষ্কারের ধুলো

প্রতিটি কথার মধ্যেই দার্শনিক অণুভাবনার গভীর ব্যঞ্জনা বিরাজ করে। একটা প্রচ্ছায়াকে অবলম্বন করেই তিনি জীবনের গভীরে ডুব দেন। জটিল রহস্যময়তায় গল্পগুলি ভাবনার বিরাট ক্ষেত্রে পাঠককে নিয়ে যায়। প্রতিটি মুহূর্তের যাপিত অভিক্ষেপগুলিই এক একটি টংকার হয়ে ফিরে আসে।

কবিতা ও গল্প দুই শিল্পকর্মই সমান্তরাল সৃষ্টিতেই গ্রন্থটি পরীক্ষা নিরীক্ষার তাৎপর্য বহন করে। পাঠক ভুলে যেতে পারে এগুলি কবিতা না গল্প, কল্পনা না জীবন, শব্দ না চাবুক।

    গদ্য ভাষার নতুন শৈলী যা কাব্যিক সুষমায় সৃষ্টি করেছেন মধুমঙ্গল বিশ্বাস তা গল্পগুলিতে লক্ষণাক্রান্ত। ক্রিয়াপদ, বিশেষণ এবং বর্ণনাত্মক ভাষার মধ্যেও আশ্চর্য ছান্দিক গতি পাঠককে আবিষ্ট করে। দুটি উদাহরণ নিলে বিষয়টি পরিষ্কার হবে :
“শ্রাবণমাসের খেলা, মেঘ এসে ঢেকে দেয় সব।
দূরের গাছে একটি নীলকণ্ঠ, অতীনের পাখি, বসে আছে।
তার পাশে, একটু পেছনে, দিগন্ত এসেছে।
দেখা যাচ্ছে আবছা চাঁদ, শিল্পিত শরীরে।
ভূমি থেকে একটু উড়ে গিয়ে প্রতিদিনের চাঁদ তুমি হয়েছ।
সুধাকান্ত চা খাবে কিনা বুঝতে পারে না।”(বাঘবন্দি)
মেটাফর অলংকারে মেঘ, পাখি, চাঁদ প্রভৃতি অবিমিশ্র যে চেতনাসম্ভূত ক্রিয়াপ্রতিক্রিয়ায় জেগে ওঠে তা বিস্মিত করে বইকি! নায়ক সুধাকান্তকেও দোলাচালে পীড়িত করে। তাই সে চা খাবে কিনা বুঝতে পারে না।
   কখনও কখনও প্রচলিত শব্দরীতি ভাষারীতিকে নিজের মতো ব্যবহার করেন মধুমঙ্গল বিশ্বাস। ইংরেজি শব্দ এবং সাধু বাক্যরীতির মধ্যেও যে চিত্রল ও গীতল ভাবটি ফুটিয়ে তোলা যায় তা অভাবনীয়ভাবে দেখিয়েছেন :
“তার প্রাবল্যে দেশে বন্যা আসিল।
ঘরবাড়ি ডুবিল, জমিজিরেতপোষ্য ডুবিল। সব ডুবিল।
প্রবৃত্তি ডোবে না।
সে কাজ করে চলে।
ডু ভার্ব সক্রিয় হয়ে ওঠে।
স্বপ্নেই শুধু নয়, বাস্তবেই আমরা করব।
আমরা কি ভাবি না?”(ক্রিয়া)

মানুষের প্রত্ন অভীপ্সার চিরন্তন সেই প্রবৃত্তির অমোঘ লীলাই উঠে এসেছে। ইংরেজি শব্দও এভাবে ব্যবহার করা যায় তা তিনি প্রয়োগ করে দেখিয়েছেন। ভাষারীতির এই পরীক্ষা নিরীক্ষার গতি বজায় রেখেই গ্রন্থটির সম্পূর্ণতা ।একইসঙ্গে সাধু – চলিত – ইংরেজির সহাবস্থান একজন নিপুণ ভাষাশিল্পী ছাড়া সম্ভব নয়।

.
.

আপনার মতামত এর জন্য

[everest_form id=”5447″]

TAIMUR KHAN

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *