চূড়ান্ত নির্লজ্জতা – শম্পা সাহা

কোর্টের রায় নারী পুরুষের সম্পত্তি নয়। আর এই নিয়ে বিতর্কের ঝড়।
এটা তো স্বতঃসিদ্ধ, কোনো মানুষ কি অন্য কোনো মানুষের সম্পত্তি হতে পারে? মানুষ কি বস্তু যে তার ইচ্ছে অনিচ্ছের কোনো মূল্য নেই? কেউ একজন, বলা ভালো পুরুষ চাইবে যেমন নারী কে তেমন চলতে হবে?
এ নিয়ে বলার কিছু নেই, কারণ এ আইনি রায় ভালো আমি বলবো না। কারণ ভালো মন্দ তখনই বিচার হবে যখন কোনো কিছুর দ্বিতীয় মত থাকে! কিন্তু মানুষের সে নারী হোক বা পুরুষ তার স্বাধীনতা নিয়ে যে আমাদের দেশে আইন করতে হয়, এটাই আমার অবাক লাগে!
তারচেয়ে বেশি অবাক লাগলো খবরটির নিচের কমেন্ট পড়ে। বহুজন হাসছেন, বহুজন আবার বলেছেন যে এসব এক পেশে আইন। কেউ বলছেন পুরুষ রা কি বাণের জলে ভেসে এসেছেন? পুরুষদের অধিকার রক্ষায় কেন কোনো আইন নেই ইত্যাদি ইত্যাদি।
অবশ্য এদেশে সব কিছুই সম্ভব। এদেশে কন্যা দান হয়, যেন কন্যা সন্তান মানুষ নয় বস্তু তাকে অন্যের হাতে তুলে দিতে হবে!
এদেশে এক সময় গৌরী দান, সতীদাহ,কৌলিন্য প্রথা চালু ছিল! বিধবা দের ছিল হাজার গন্ডা আইন, নিয়ম, কানুন, পালনীয় কর্তব্য কর্ম। পদে পদে সব ক্ষেত্রে এত যুগ ধরে মহিলাদের ই দমিয়ে রাখার চেষ্টা চলে এসেছে। এবং এখনও যে গল্পটা খুব একটা বদলেছে এমন নয়।
এখনো মেয়ে পরিবারের ইচ্ছের বিরুদ্ধে বিবাহ করতে চাইলে তার মুন্ডু কেটে নিতে চায় বাবা ও ভাইয়েরা, এদেশে এখনো কন্যা ভ্রুণ হত্যা জলভাত। এখনো ধর্ষনের পর মেয়েটির চরিত্র দোষ খোঁজা হয়, এমনকি ধর্ষিতা মেয়েটি কে সহানুভূতি দেখানোর নামে তার সঙ্গে কি কি হয়েছে শুনতে চেয়ে বিকৃত কাম চরিতার্থ করার প্রয়াস চলে রোজ। নাকি এসব ভুল, মিথ্যা?
এখনও মেয়ে ফর্সা খোঁজা হয় বিয়ের জন্য, ছেলেদের গায়ের রং নিয়ে মাথা কি ঘামানো হয়? মেয়েদের বিয়ের আগের সম্পর্ক তাকে কিছুটা চরিত্র দোষী করে তোলে, বেশি রাতে মেয়েরা ফিরলে, তার একটু হৈ হৈ উচ্ছ্বল মানসিকতা মানেই চরিত্র খুব  একটা ভালো নয়।  ছেলেদের ক্ষেত্রে, “সোনার আংটি আবার বাঁকা! “
এদেশে এখনও মেয়েদের বিয়ে হয়, ছেলেরা বিয়ে করে। এখনো মেয়েদের চাকরি করা স্বামী শ্বশুর বাড়ির মতের উপর নির্ভর করে, তাদের অমত থাকলে শেষ পর্যন্ত হয় চাকরি ছাড়তে হয় নয় সংসার।
এখনো অফিস থেকে ফিরে স্বামী টিভির ঘরে আর স্ত্রী রান্না ঘরে। এখনো সংসারটা মেয়েরাই সামলান। অনেকেই বলবেন আমি পুরুষ তবু এই এই করি বা আমার স্বামী অফিস থেকে ফিরে এই এই করেন, তবে তা কতো শতাংশ?
পণের জন্য পুড়িয়ে মারা হয়েছে কতজন পুরুষ কে? কতজন পুরুষ কে প্রেমিকা, পায়নি বলে অ্যাসিড ছুঁড়ে মেরেছে? কতজন পুরুষ কে ধর্ষণের ভয় দেখানো হয়? কতজন পুরুষ আদম টিজিং এর শিকার?
এখনো বাসে উঠে মেয়েদের বুকের সামনে ব্যাগ বা অন্য কিছু ধরতে হয়, পুরুষদের তা হয় কি? এখনও মেয়েদের বিভিন্ন ভাবে শারীরিক নিগ্ৰহের শিকার হতে হয়। কজন পুরুষ কে নারীরা বাসে ট্রামে উল্টোপাল্টা ভাবে স্পর্শ করেন? একজন ও পুরুষ হাত তুলে বলুন তো তাকে বাসে কোনও নারী অশালীন ভাবে স্পর্শ করেছেন?
সব শেষে আসি ওই রায় সম্পর্কে। অনেকেই বলেছেন বৌ আমার সম্পত্তি নয় কিন্তু আমার টাকাপয়সা বৌ এর! এটা আবার কি?
ঠিক বলেছেন, বৌ এর আপনি ও সম্পত্তি নন, যেমন বৌ আপনার নয়। সমান সমান দুজনেই। তাই স্ত্রীর খোরপোষ চাওয়ার অধিকার নেই একদম ঠিক। সত্যি ই তো, স্ত্রী যদি আপনার খোঁচায় বাঁধা গরু না হন, তো খোরপোষ দেবেন কেন? সব সমান সমান। শুধু উত্তর দিন আমার প্রশ্ন গুলোর…
বিয়ের পর শ্বশুর বাড়ি কে গিয়েছিল, নিজের সব প্রিয়জন ছেড়ে?
কে গিয়ে অন্য একটা পরিবেশে মানিয়ে নিয়েছে?
যে নিজে কোনোদিন চা পর্যন্ত করে খায়নি, শ্বশুর বাড়ি গিয়ে সবার জন্য চা করা কে শিখেছে?
যাকে হয়তো বাবা সব সময় আগলে আগলে রেখেছে, তার মন যুগিয়ে চলেছে, সে আপনার পরিবারের মন যুগিয়ে চলতে শিখেছে না শেখেনি?
দশমাস দশদিন সন্তান ধারণ করতে প্রচন্ড শারীরিক কষ্ট কে সহ্য করেছে? তার পরেও সেই সন্তানের নামের পরের পদবী টা কার ছিল বা আছে?
বিনা পয়সায় রান্নার লোক, কাজের লোক, সন্তান ধারনকারী গর্ভ, আপনার শারীরিক চাহিদা মেটানোর সঙ্গী, আপনার বাড়ির বৃদ্ধ বাবা মা এর দেখাশোনা করার আয়া, এ সব কাজ কে করেছে?
এতগুলো কাজ আপনি পয়সা দিয়ে করান, দেখুন অ্যাফোর্ড করতে পারবেন তো?
জানি অনেকেই রে রে করে এসে উদাহরণ দিতে শুরু করবেন, আমার বৌ এত খারাপ, আমার প্রেমিকা তত খারাপ, আমার বৌমা এত অত্যাচারী! নিশ্চয়ই, নিশ্চয়ই আছে, অস্বীকার করার কোনো জায়গা নেই, কিন্তু হিসেবের নিরিখে কত শতাংশ সেটা?  ব্যতিক্রম কিন্তু নিয়ম কেই প্রতিষ্ঠা করে, এটা ভুললে চলবে না।
আর সবচেয়ে বেশি দেখেছিলাম, খোরপোষ দেওয়া নিয়ে আপত্তি। কিন্তু তাহলে যে সন্তান আপনাদের দুজনার তার দায়িত্ব সে মহিলা একা নেবেন কেন? সেটা তো দুজনের, তাহলে কি চাইছেন? স্ত্রী হিসেবে আপনার দখলে থাকবে? না হলে আপনি সুখ ভোগ করে যে সন্তান তাকে উপহার দিয়েছেন, স্ত্রী আপনার তাবে না থাকতে চাইলে সন্তানের পুরো দায়িত্ব ই তার। কারণ সন্তানের জন্য সন্তানের অধিকার চাইলেই আপনি চেঁচাবেন,সংসার করবে না অথচ খোরপোষ নেবে! তাহলে আপনাদের সন্তানের দায়িত্ব ও তাকে একা নিতে হবে?
এটা চুড়ান্ত নির্লজ্জতা নয় কি? ভেবে উত্তর দিন।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *