ভিস্তিওয়ালা – সিদ্ধার্থ সিংহ

Siddhartha singha

ইতিহাসে ভিস্তিওয়ালারা সুপরিচিত হয়ে আছেন মুঘল সম্রাটের প্রাণ বাঁচিনোর সময় থেকেই।

চৌসার যুদ্ধে শের শাহের আক্রমণে ডুবতে বসা সম্রাট হুমায়ূনকে বাঁচিয়েছিলেন নাজিম নামের এক ভিস্তিওয়ালা। তখন অবশ্য তিনি সম্রাটকে ঘুণাক্ষরেও চিনতে পারেনি।

সম্রাট হুমায়ুন তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা স্বীকার করে ভিস্তিওয়ালকে কথা দিয়েছিলেন, তিনি ফিরে গিয়ে তাঁকে একদিনের সম্রাট বানাবেন।

পরে সম্রাট ফিরে গিয়ে সেই ভিস্তিওয়ালা নাজিমকে ডেকে তিনি তাঁর জবান অনুসারে সত্যিই একদিনের জন্য ভারতবর্ষের সম্রাট করে দিয়েছিলেন।

ঊনবিংশ শতাব্দীতে সারা দেশ জুড়েই ছিল মিষ্টি জলের খুব অভাব। সেই জলের অভাব মেটাত এই ভিস্তিওয়ালারা। তাই বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি পর্যন্ত ভারতবর্ষের বিভিন্ন শহরের রাস্তাগুলোতে ভিস্তিওয়ালাদের আনাগোনা করতে দেখা যেত।

আসলে তখন ভারতবর্ষের প্রায় সর্বত্রই খাবার জলের জন্য নির্ভর করতে হতো খাল, নদী বা কুয়ার ওপরে।

ছাগলের চামড়া দিয়ে বানানো বিশাল বিশাল থলেই ছিল সেই জল সরবরাহের একমাত্র মাধ্যম। সেই চামড়ার থলেকে বলা হতো— মশক।

ঢাকার ভিস্তিওয়ালাদের বলা হতো ‘সাক্কা’। সে সময় ভিস্তিওয়ালাদের একটি সংগঠনও ছিল। সংগঠনের প্রধানকে বলা হতো— নওয়াব ভিস্তি।

দ্য লাস্ট ওয়াটারম্যান-খ্যাত এই পেশার লোকজনদের মধ্যে নিজস্ব পঞ্চায়েত ব্যবস্থাও ছিল। ভিস্তিওয়ালারা টমটম ভরে বড় বড় চামড়ার থলেতে জল দিয়ে আসত।

ভিস্তিওয়ালাদের নিয়ে রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন—
‘তখন বেগে ছুটিল ঝাঁকে ঝাঁকে,
মশক কাধে একুশ লাখ ভিস্তি।
পুকুর বিলে রহিল শুধু পাঁক,
নদীর জলে নাহিকো চলে ভিস্তি।’

শামসুর রাহমান লিখেছেন—
‘আর ভুলিনি সেই ভিস্তিকে, যে রোজ মশক ভরে দুবেলা পানি দিয়ে যেত আমাদের বাড়িতে।’

তিনি আরও বলেছেন—
‘কালো মোষের পেটের মতো ফোলা ফোলা মশক পিঠে বয়ে আনত ভিস্তি। তার পর মশকের মুখ খুলে পানি ঢেলে দিত মাটি কিংবা পিতলের কলসির ভেতর৷ মনে আছে ওর থ্যাবড়া নাক, মাথায় কিস্তি টুপি, মিশমিশে কালো চাপদাড়ি আর কোমরে জড়ানো পানিভেজা গামছার কথা।’

সুকুমার রায় তাঁর ‘ন্যাড়া বেলতলায় ক’বার যায়?’ ছড়াতেও ভিস্তিওয়ালাদের প্রসঙ্গ টেনে এনেছেন—
‘লাখোবার যায় যদি সে যাওয়া তার ঠেকায় কিসে?
ভেবে তাই না পাই দিশে নাই কি কিচ্ছু উপায় তার?
এ কথাটা যেমনি বলা রোগা এক ভিস্তিওলা
ঢিপ্‌ ক’রে বাড়িয়ে গলা প্রণাম করল দুপায় তার।’

জিন্দাবাহার চৌধুরী বাড়ির জমিদারকন্যা আমেতুল খালেক বেগম ভিস্তিওয়ালাদের স্মৃতিচারণা করতে গিয়ে লিখেছেন, ‘সকাল বেলা ভিস্তি আসত বিরাট মশকে ভরে পানি কাঁধের ওপর ঝুলিয়ে। …ভিস্তির সেই বিকট গলা … ‘ভিস্তি আবে ভিস্তি’। মশকের মুখটা খুলে চেপে ধরে কলসিতে পানি ঢেলে রাখত। বিরাট সে সব কলসি, মাটির মটকায়ও পানি রাখা হতো। মনে হয় এ সব স্মৃতি ১৯৪১-৪২ সালের।’

১৮৭৮ সালের আগে পর্যন্ত অবিভক্ত ভারতবর্ষে সে ভাবে নিরাপদ কোনও জলের স্থায়ী ব্যবস্থা ছিল না। ১৭৮৪ সালে ঢাকার কালেক্টর পানীয় জলের খরচ বাবদ পেতেন ১৫০ টাকা। যেখানে ১ টাকায় দু’মণ চাল পাওয়া যেত। সেখানে পানীয় জলের জন্য এত টাকা বরাদ্দের একটাই কারণ ছিল। আর সেটা হল— ঢাকার জল স্বাস্থ্যসম্মত ছিল না। স্বাস্থ্যসম্মত ছিল না কলকাতার জলও।

তার ওপর সারা বছর ধরে চলত কলেরার মহামারি। যাঁদের আর্থিক অবস্থা ছিল যথেষ্ট মজবুত, সেই সব অভিজাত লোকজনেরা সুদূর মেঘনা থেকে জল আনাত।

নবাব আবদুল গনি ও নবাব আহসানউল্লাহর সম্মিলিত প্রচেষ্টায় ১৮৭৪ সালে চাঁদনীঘাটে স্থাপিত হয় ‘ওয়াটার-ওয়ার্কস’ জল পরিশোধনাগার। প্রথম দিকে জল সরবরাহের জন্য মাত্র চার মাইল এলাকা জুড়ে বসানো ছিল পাইপ। দৈনিক জল সরবরাহের পরিমাণ ছিল ৩৫ হাজার গ্যালন।

১৮৭৯ সালে ঢাকার নওয়াব আব্দুল গণি ঢাকার জল সংস্থান প্রকল্পে এক লাখ টাকা দান করেন।
সে জন্য তাঁকে যোয়া হয়— ‘কেসিএসআই’ উপাধি।

কলকাতা শহরে দু’-চারজনকে দেখা গেলেও ঢাকাই ছিল শেষ শহর, যেখানে ষাটের দশক পর্যন্ত ভিস্তিওয়ালারা তাঁদের কাজ অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে চালিয়ে গিয়েছিলেন।

১৯৬৮ সাল নাগাদ ঢাকা শহর থেকেও ভিস্তিওয়ালারা বিলুপ্ত হয়ে যান। তার বহু আগেই পানীয় জলের ব্যবস্থা সুচারু হতেই, বিশেষ করে কলকাতার টালা ট্যাঙ্ক থেকে জল সরবরাহ শুরু হতেই কলকাতার পাশাপাশি ভারতের অন্যান্য শহর থেকেও তাঁরা চিরতরে বিলীন হয়ে যান।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *